আকাশ পথের স্মৃতি

Emuকিশোয়ার লায়লা: ২০০৫ সাল। কাজ করি এনটিভি’তে। লন্ডনের একটি ডকুমেন্টারি সংস্থা ‘টিভিই’ ৩১ টি দেশ থেকে একজন করে সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তিনদিনব্যাপি সেমিনারে অংশ নিতে। বাংলাদেশ থেকে আমি। কোন নিউজ করার তাগিদ নেই। তাই সাথে নেই কোন টিভি ক্যামেরা – নেই অফিসের বাধ্যবাধকতা।

ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার বিমানে চড়ে প্রথমে কুয়ালালামপুর বিমান বন্দর। প্রায় ৭/৮ ঘন্টা বিরতির পর যাত্রা হিথ্রো  বিমানবন্দরের উদ্দেশে।তিন আসন বিশিষ্ট সারির মধ্যখানে আমার আসন। আসন দেখেই গলা শুকিয়ে এলো। দুইপাশে দুই বয়স্ক বিদেশিনী। আমি যাচ্ছি বিলাত। আমার পাশে বাংলাদেশি কাউকে আমি আশা করছি না।

তবে ভাবছি, এ লম্বা পথে কার সাথে কথা বলবো? দুই বয়স্ক মহিলা নিশ্চই আমার সাথে বকবক করবেন না! করলেও কী বিষয়ে কথা বলবো? আর বৃদ্ধরা একটু খিটমিটে হয় বলেই ধারণা। যাক্, হাই হ্যালো বলে হেসে বসলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙ্গে খাবারের ট্রে নিয়ে আসা বিমানবালার ডাকে।

উঠে দেখি দু’জন বেশ মজা করে আসনের পাশে লাগোয়া মনিটরে সিনেমা দেখছেন আর খাচ্ছেন। তার মানে আমি একাই এতোক্ষণ ঘুমাচ্ছিলাম! হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে আসতে দুজনের চেহারা ভাল করে দেখে নিলাম। আমার ডান পাশের জনকে একটু মুডি আর অহংকারি মনে হলো। আর বাঁ পাশের জনের চেহারায় আপন আপন ভাব। বসতে বসতেই ঠিক করে ফেললাম আমিই কথা শুরু করবো এবং বাঁ দিকের জনের সাথে।

খাওয়া শুরু করে যেই না কথা শুরু করবো, ঠিক তখনই তিনি তাঁর মনিটরে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে উঠলেন, ইউ ক্যান ওয়াচ দিস মুভি। ইটস গুড। দেখবো বলে আশ্বস্ত করতেই আমার আসন লাগোয়া মনিটর তিনি নিজেই ফিক্স করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

যাক, এখন অন্তত এই সিনেমা নিয়ে গল্প করা যাবে। একটা শিশুতোষ ছবি। প্রেতাত্মাও আছে। মজাই পেলাম। ভদ্রমহিলা ছবি শেষ করে সামনের ট্রে খুলে কার্ড খেলছেন।

এবার আমি জানতে চাইলাম, তুমি ব্রিটিশ? খেলতে খেলতেই জবাব দিলেন, হুমম। গিয়েছিলাম অস্ট্রেলিয়া আমার মেয়ের কাছে। এখন দেশে ফিরছি।

পরের প্রশ্ন, একা একাই এতোটা পথ আসা-যাওয়া করো? জানালেন, আমি গ্রীষ্মকালটা পছন্দ করি। তাই অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মকালে আমি ওখানে চলে যাই। আবার লন্ডনে যখন গ্রীষ্মকাল শুরু হয় তখন ফিরে আসি।

আমি হেসে বললাম, তুমি শীতের দেশের হয়েও শীত ভাল লাগে না? জবাবে বললেন, আমি জীবনের অনেকটা সময় গ্রীষ্মকালীন দেশে কাটিয়েছি। বলতে পারো, যৌবনকাল।

এখানে কথা থামিয়ে বললেন, ভাল কথা, তুমি কোন দেশের? বললাম, বাংলাদেশ। শুনেই ভদ্রমহিলা উচ্ছসিত হয়ে সম্পূর্ণ নির্ভুল বাংলায় বলে উঠলেন, তার মানে তুমি বাংলা জানো?

এতোক্ষণ আমি একজন পুরোদস্তুর ইংরেজ মহিলার সাথে ইংরেজিতে কথা বলছিলাম। আর এখন কিনা উনি জানতে চাইছেন, আমি বাংলা জানি কিনা? কয়েক সেকেন্ড কোন কথা বলতে পারলাম না। এতোটাই ভ্যাঁবাচ্যাঁকা খেলাম যে, বাংলা প্রশ্নের উত্তর দিলাম ইংরেজিতে, অফকোর্স!

অবাক ভঙ্গিতে এবার বাংলায় বললাম, তবে তোমার মতো সুন্দর পারি না! দুজনই হেসে দিলাম। এরপর মহাভাব নিয়ে এ্যালি’র সাথে তাঁর ভাঙ্গা বাংলা আর আমার ভাঙ্গা ইংলিশে আড্ডা শুরু করলাম।

তিনি একজন সেবিকা ছিলেন। স্বামী ছিলেন কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসক।সিলেটের সুনামগঞ্জে স্বামীর সঙ্গে ২৩ বছর কাটিয়েছেন। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজ দেশে ফিরে গেছেন।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, কানাইঘাট, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ গরগর করে এসব জায়গার নাম বলে দিলেন।ভাষা আন্দোলনের কথাও জানেন কিছুটা। কী অদ্ভুত! এতোক্ষণে বুঝলাম কেন গ্রীষ্মকালটা তাঁর বেশি পছন্দ।

এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। কিন্তু বাকি পথ জেগে রইলাম আমি। ভদ্রমহিলাকে নিয়েই ভাবলাম। বাংলাদেশে ছিলেন, কী পরম মমতায় নিশ্চই দেশের মানুষের সেবা করেছেন।ভাষা, জায়গাগুলোর নাম এখনো মনে রেখেছেন। তেইশ বছরের স্মৃতি তো আর কম নয়!

প্লেন থেকে যে যার মতো করে নেমে গিয়েছি। দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর মূহূর্তেই মনে হলো, কী করলাম আমি? যোগাযোগের কোন ঠিকানা বা নম্বর তো নিলাম না? একজন সাংবাদিক হিসাবে তো অবশ্যই এসব আমার নিয়ে রাখা উচিত ছিল। অন্তত একটা ছবি তো তুলতে পারতাম! আফসোস আর লজ্জিত ভঙ্গিতে বিমানবন্দর ছাড়লাম।

অপেক্ষমান বন্ধুদের পেয়ে এ্যালি’র কথা সেইমূহূর্তে ভুলে গেলেও আজও ভুলতে পারিনি তাঁর উচ্ছসিত ভঙ্গিতে করা প্রশ্ন, তার মানে তুমি বাংলা জানো?

কিশোয়ার লায়লা

টরন্টো, কানাডা

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.