সাজেকের সৌন্দর্য দেখছেন, কিন্তু কান্নাটা কি শুনেছেন?

16

hillসুমন্দভাষিণী: গতকাল একুশে ফেব্রুয়ারি জাতীয় শোক দিবসে যখন সারাদেশ বিশেষ করে ঢাকা শহর মেতেছিল উৎসব-আনন্দে (শোক উৎসব), তখন এইদেশেরই আরেক প্রান্তের মানুষ প্রাণ হাতে করে ফিরেছে উৎকণ্ঠায়, অবিশ্বাসে। ঠিক একাত্তরের মতোন খাগড়াছড়িগামী বাস থেকে আদিবাসী চেহারার লোক ধরে ধরে নামিয়ে তাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। লাশও পড়েছে শোনা গেছে, যদিও মিডিয়া এ ব্যাপারে নিশ্চুপ।

আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, জায়গাজমি দখলের খবর কমই স্থান পায় মিডিয়াতে। বাজারে এসব খবরের তেমন একটা মূল্য নেই বলে, অথবা হতে পারে এসব জনগোষ্ঠী আজ প্রান্তিক, তাদের কথা শুনলেই কী, না শুনলেই কী। উপর মহল থেকেও একরকম নিষেধাজ্ঞা তো আছেই।

প্রায়ই মিডিয়া বন্ধুদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় যেতে দেখি দলবেঁধে, কেউ সেনাবাহিনীর আমন্ত্রণে, কেউ বা অন্য কোনো বাহিনীর। এমনকি হেলিকপ্টারে করে ঘুরেও দেখিয়ে আনা হয় সাংবাদিকদের। পাহাড়ের সৌন্দর্যে লালায়িত আর পাহাড়ি মেয়েদের সুলভ ভেবে মনের ভিতরে একধরনের সুখটান অনুভব করা এসব মেরুদণ্ডহীন সাংবাদিক অজান্তেই কেনা হয়ে যায় সিস্টেমের কাছে, শোষকদের কাছে। তখন তারা সানগ্লাস পরে ঘুরে বেড়ায়, কিছুই দেখে না, কিছুই শোনে না।

যে সাজেক আজ নানারূপে সজ্জিত, অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, সেই সাজেকের কাহিনীটা একটু শুনি। এরপরও অনেকেই সাজেক যাবে, এবং তারা তাদের বিবেকটা (যদি থেকে থাকে) বন্ধক রেখেই যাবে, আমি নিশ্চিত।

তেপান্তর লারমা অপু লিখেছিলেন, সুনীল কুমার চাকমা নামের এক শিশু ২০ ফেব্রুয়ারির ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলে, গুলি শুরু হতেই মা আমাকে নিয়ে হাতে ধরে জঙ্গলের দিকে পালাতে থাকেন। দূরে বাঙালি সেটেলারদের দা হাতে আমি আমাদের গ্রামটির দিকে দৌড়ে আসতে দেখি। ভয়ে আমি তখন চিৎকার করে কাঁদছিলাম।

… পরদিন মা জঙ্গল থেকে বুনো আলু এনে খাইয়েছেন।

অনিশ্চয়তার ভেতরে অভুক্ত অবস্থায় জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে একই শ্রেণীর ছাত্রী কমলা রাণী চাকমারও। সে বলে, জঙ্গলে ভেতরে খিদের জ্বালায় আমরা অনেকে কান্নাকাটি করছিলাম। বড়রা সবাই লাঠি নিয়ে আমাদের আমাদের পাহারা দিচ্ছিল। তার বার বার আমাদের কান্না করতে নিষেধ করছিল। তারা বলছিল, কান্নার শব্দে হয়তো সেটেলার বাঙালিরা আমাদের অবস্থান জেনে ফেলবে; তখন তারা জঙ্গলের ভেতরেই দা দিয়ে কুপিয়ে খুন করবে আমাদের।

কনক বিকাশ চাকমা বলে, আমাদের ঘরবাড়ি, বইপত্র, জামা- কাপড় সবই আগুনে পুড়ে গেছে। এক জামা-কাপড় পরে থাকতে ভালো লাগে না। আবার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে। আগের মতো খেলাধূলা করতে ইচ্ছে করে… ” (‘বাঘাইছড়ির আশ্চর্য দেবশিশুগণ’, পাহাড়ে বিপন্ন জনপদঃ সাংবাদিকের জবানবন্দিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অকথিত অধ্যায়, বিপ্লব রহমান, সংহতিঃ২০১৫, পৃষ্ঠা ৬২)

২০১০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি পর্যন্ত রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় সাজেক ইউনিয়নের সেটেলার বাঙ্গালী ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ১১ টা আদিবাসী পল্লিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। সরকারি হিসেবে ৪৫০ পরিবার। বেসরকারি হিসেবে ৫৭০ পরিবার।

আর প্রত্যক্ষদর্শী থেকে শোনা (সেই সময় আমরা বাঘাইছড়ির সাজেক বাসীদের জন্য কাপড়,খাবার,অর্থ সংগ্রহে নেমেছিলাম আর অনেক ইচ্ছা থাকা সত্বেও পরিবার আমার নিরাপত্তা নিয়ে সংকোচ থাকায় যাওয়া হয়নি) ৭৮০ পরিবারেরর ঘড় পুড়ে ছাই হয়ে যায়।ছাই হয়ে যায় ৭৫০ পরিবারে জুম পাহাড়ে বাবার কষ্টে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পড়াশুনা করে সামান্য মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে বাস করতে চাওয়া শতাধিক ছাত্র/ছাত্রীদের জীবনের গতি,ও তাদের বাবা,মা তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে সামান্য সুখ নিয়ে বেঁচে থাকার সেই স্বপ্ন ও……

Sajek womenযে পাহাড়ের আদিবাসী নারীরা সারাবছর জুম চাষে ব্যস্ততা থাকায় কখনো বাজারের সাথে সাক্ষাৎ পায় না, সেই আদিবাসী নারী ও আজ রাস্তায় নামছে শোষক দলের অত্যাচারের সহ্য করতে না পেরে।

যে পাহাড়ের তরুণী নিশ্চুপ হয়ে ঘরে চুপটি মেরে বসে থাকতো, সেই তরুণীও আজ বনফুল খোঁপায় বেঁধে মিছিলে যায় আর সংগ্রাম করে শোষক দলের সাথে।

আচ্ছা সমতল তথা বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশী দাদা-দিদি ভাইদের প্রতি প্রশ্ন: পুরুষতান্ত্রিক আদিবাসী সমাজে জুম চাষ করা সরলতার আদিবাসী নারীরা ও কেন এইভাবে তীব্র প্রতিবাদী হয়ে রাস্তাই নামছে???

আমি গর্ববোধ করতাম আমার বাংলাদেশের জন্য।আমার জন্ম সেই দেশে যেই দেশ জন্ম হয়েছে ৩০ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে। আমি গর্ববোধ করতাম আমি বাংলাদেশী বলে।আমি গর্ববোধ করতাম এই সেই দেশ,যেই দেশের জন্য মানুষ জীবনকে বিসর্জন দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না।

কিন্তু আমাকে এখন সেই বাংলাদেশকে নিয়ে গর্ববোধ করাটা প্রশ্নবিদ্ধ করায়,যখন সেই পাকিস্তানিদের কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের সরকার শোষণ করে, হত্যা করে, ভূমি দখল করে, আইনশৃঙ্গলা নামে মিলিটারি প্রবেশ করিয়ে হামলা করতে সহায়তা করে আদিবাসী পল্লিতে। আমার গর্বকে আবারো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায় যখন সংখ্যালঘুদের বাড়ি,মন্দির,পূজা মন্ডপে হামলা করা হয়, হামলা করা হয় সমতল আদিবাসীদের পল্লীগুলোতেও।

ছবিতে এই আদিবাসী নারী ভয়, মৃত্যু, শ্লীলতাহানী, নিজের ইজ্জতের কথা ভাবেনি। ভেবেছে নিজের জাতির প্রতি শোষক দলের নিপীড়নের কথা, নিরাপত্তার নামে আদিবাসী পল্লিতে অগ্নিসংযোগের কথা, নিরাপত্তার নামে আদিবাসীদের পল্লিতে হামলার জন্য সেটেলার বাঙ্গালীদের সহযোগিতার কথা, তাই আজ সেই জুম পাহাড়ের সহজ-সরল নারী ও তীব্র প্রতিবাদী হয়ে ভয়কে দূরে হটিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে হামলা প্রতিহত করতে।

জীবন যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্তই লড়াই চলবে। এই ছবিই বলে দিচ্ছে পাহাড়ের আসল রুপ কী! আর সেই ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সালে কী হয়েছিল সেই সাজেক ইউনিয়নের পুড়ে ছাই হওয়া ১১টা আদিবাসী পল্লীতে।

সেইদিনটিতে জ্বলছিল আদিবাসী পল্লী, পুড়েছে আদিবাসী বাড়ি আর ছাই হয়ে যাচ্ছিলো ৭৫০ পরিবারের স্বপ্ন, ৭৫০ পরিবারের ভবিষ্যৎ..

কিন্তু সরকারের হৃদয় একটুও টলেনি সেই ঘটনাতেও। এইভাবেই জয় হোক সেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের, এইভাবেই শান্তি ফিরে আসুক সেনাশাসন অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামে।

 

শেয়ার করুন:
  • 1.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.9K
    Shares

লেখাটি ৫৬,৪১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

আদিবাসী বলতে কাদের বোঝায়? বাঙালী, বাংলাদেশী, পাহাড়ী, জাতি, উপজাতি, ক্ষুদ্র- বৃহৎ জাতি গোষ্ঠীর যারা এ দেশে জন্মগ্রহণ করছে তারা সবাই আদিবাসী। সুতরাং শুধু পাহাড়িদেরকে আদিবাসী বলে সরিয়ে রেখে ফায়দা লুটেরা ফায়দা লুটছে। বরং আমরা সবাই বাংলাদেশী এটাই হোক আমাদের সকলের পরিচয়। এতেই মঙ্গল, এতেই কল্যাণ। পাহাড়িদের উন্নয়নের আসুন সবাই এগিয়ে যাই, ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে, সাহসিকতার সাথে, আস্থার সাথে, বিশ্বাসের সাথে, বিশ্বতবতার সাথে।
সেই সাথে সরকারের সকল উন্নয়নের সহযোগী হই আস্থার সাথে।

Shame on us! Shame on the common people of Bangladesh. We have educated ourselves to become bigger criminals. We all blame the government even though we are the ones to blame. We are the ones who create groups and divisions among ourselves and we are the ones who oppress others in the name of religion, complexion, geographic location and so on.

I will do everything is my capacity to change these disgusting practices.

amra ato ghani, je adivashir je songa ase UN a ta porar dorkar nai, khali hojoke adivashi boli, tara jodi adivashi hoi taile to amra sobai setlar,hajar hajar bochor dore pahare bangalider boshobas, r aj amra bolchi setlar,age amra adivashi ki seta jani tarpor, itihas jani, tarpor boli adivashi o setlar somporke.ai rokom gotonar sotik thodonto kore bichar howa dorkar doshiderdoshider.

Ami Sajek e giechilam goto bochor, Pahari manush somporke amar kono dharona chilona. Gie mone holo Sajek akhono oshanto. Ebong Pahari Manush gulo valo but mone holo tara isolated thakte chai. Mane nijeder moto kore thakte chai. Ete je problem gulo hoy ja kina cultural and communication conflict. Bangladesh e shob dromer lok bas korche. Native der uchit arektu mile mishe chola. Ar Yes, Kharap Manush Bangali der modhe o ache, ja kina Bangali rao suffer kore.

@maruf mostafa apni tahole govire dhukte parenni. ai conflict ta emni emni sristi hoini eta porikolpito vabe kora hoyeche jar master plane korechilen mejor jia. mile mishe thakar kotha bolchen seta possible hobena kenona choto kal theke amra jani sape chobol mare tai amra sap voi pai r dure thaki amader belai o tai hoyeche. ami nije 3 bar basha theke paliye jongole lukiye thekesi bangalira attack koresilo tai. amader mentality o tai evabei gore utheche. r ekta kotha ki janen ami bere uthsi bangali meyer kole amader paseri silo basha. amake nijer cheler moto ador kore.r unar chelei hosse amar life er first friend. eksathei boro hoyechi. tokhon aisob kisui bujhtamna. amader oi parai silo 2ta muslim 1ta hindu r 3ta chakma family dhiginalai. sukhei silam ai 6ti family. tokhon amar boyos 6 baba khagrachari asar por durottota ektu bere jai but ekhon o valobasha oi bangali auntir sathe temon e ase. so apni bolte parben na je amra mela mesha korina. jodi vaben baniye bolchi tobe amar life er oi 1st bondhutir fb id niye jigges korte paren. se ekhon gajipur somorastro karkhanai job kore. jai hok kgc asar por tokhon boyos koto hobe janina onek choto silam tokhon moner modde prothom bangalider upor voi suru hoi. bangalira amaderparai attack korechilo. ai sob dekhe esober modde boro hoye ta ekhon biroktir porjai e. ami dhaka porsuna korechi dhaka asle abar temonti lagena . manlam bangalira osuffer kore but kokhono sunechen chakmara bangali parai giye basai agun diyeche. sob ghotona jevabei suru hok na keno bangalira attack kore r amra nijeder protect kori. ekhono amar jana mote emon kono ghotona ney j paharira songoboddo vabe bangali parai attack koreche.

উগ্র জাতিয়তাবাদী রাষ্ট্রের কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো আচরণ আশা করা অরণ্যে রোদন। যে রাষ্ট্র ভাষাঅধিকার আদায়ের জন্য রক্ত দেয় সেই রাষ্ট্র কি আদিবাসীদের ভাষার অধিকারে ন্যূনতম সম্মান দেখায়? উগ্র জাতীয়তাবাদ মানেই তো ক্ষুদ্র জাতিসত্তার উপর দমন-পীড়ন করে মোড়লীপনা চালানো।
যখনই আমি পার্বত্য এলাকায় গিয়েছি, আমার মন “বাঙালি সেটেলার”দের উপর বিষিয়ে উঠেছে পূর্বের চেয়েও বেশিমাত্রায়। অথচ আমি নিজেই সেই পাপীষ্ঠকূলের এক হতভাগা বাঙালি।
তোমরা ক্ষমা করো না, নতজানু হয়ো না, লাভ নেই। অধিকার কেউ কাউকে এমনিতেই দেয় না; বৃটিশ বা পশ্চিম পাকিস্তানও আামাদের দেয় নি; অধিকার অর্জনের বিষয়। কিভাবে সেটা অর্জন করতে হবে–সেই সিদ্ধান্ত তোমাদের।

Your Comment অাদিবাসী নির্যাতন ! সহ্য করা উচিৎ নয় । তাহলে অার অামরা সহিদের রক্তমাখা বাঙ্গালি পরিচয় দেবো কোন মুখে ? অামরাও তো তাহলে রক্ত খেকো অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর মতই হয়ে যাই । এ নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটা কিছু করতেই হবে । জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মনে রাখা রাখা উচিৎ অামাদের দুর্দিনে একদিন এরাই অামাদের অাশ্রয় প্রশ্রয় এবং সকল প্রকার সাহায্য করেছিলো । এঁদের বাঁচাতে হবে, রক্ষা করতে হবে । চলুন একটা ব্রিগেড জাতীয় কিছু তৈরি করুন, অাপনি বাঙ্গালি রাজি তো ? অামি যেকোন ডাকের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকলাম । জয় হোক অাদিবাসীদের, ফিরে পাক পৃথিবীর অাদি গর্বের পরিচয় ।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.