Muzzle me notশারমিন শামস্: ১৫ তারিখ পার  হওয়ার পরও বইমেলা যেতে পারিনি বলে বিকেলেই মনটা খারাপ করছিলাম। সন্ধ্যা পার হতেই যে সংবাদ কর্ণগোচর হলো, মনে হলো, বইমেলায় না গিয়ে আমার অনেকটা সময় বেঁচে গেছে।

অমর একুশে বইমেলার নামে বাংলা একাডেমি আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের নামে মাননীয় সরকারের ভড়ং কাছ থেকে দেখার চেয়ে বাসায় বসে স্টার জলসায় দেবর-ভাবির বিয়ে দেখা ভালো।

ইসলাম ও বিতর্ক নামক বই প্রকাশের অপরাধে বিকেলেই বন্ধ করে দেয়া হয় বইমেলায় ব-দ্বীপ প্রকাশনীর স্টল। আর ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেয়ার অভিযোগে এদেশের অন্যতম মুক্তমনা প্রকাশনা সংস্থা ব-দ্বীপ প্রকাশনীর মালিক শামসুজ্জোহা মানিক -কে আটক করা হয় রাত ন’টা নাগাদ।

এর আগে দুপুরেই আলাদা আলাদা বিবৃতিতে ছাত্রশিবির আর খেলাফত আন্দোলন অবিলম্বে প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিককে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেয়।কে বলে এদেশের সরকার জনগণের দাবি মানেন না? এই তো। ২৪ ঘণ্টা আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন তেনারা- ৪/৫ ঘণ্টার মধ্যেই হাতে হাতে ফল। কে কয় এই সরকার জনগনের সরকার না?

আমি অবশ্য জনগণের মধ্যে পড়ি কি না জানি না। এর আগে আমি অভিজিৎকে যারা হত্যা করেছে, থাবা বাবার গলা যারা কেটেছে, অনন্ত বিজয়কে যারা রক্তাক্ত করে নিথর করে দিয়েছিল, নিলয়কে যারা খুন করে গেছে, তাদের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছিলাম। সাগর রুনির হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন আর বিচারও চেয়েছিলাম।

কিন্তু এইসব কোন ঘটনাতেই জামায়াত কিংবা খেলাফতের হুজুররা আমার সাথে একমত ছিলেন না। ফলে, সরকার আমার দাবিকে থোড়াই কেয়ার করেছেন। সরকার জ্ঞানী, বিচক্ষণ। তিনি জানেন, কে তার প্রকৃত আপন, কে পর। কে আসল নাগরিক, কে নকল। কে প্রকৃত বাঙালি, কে ভুয়া। তো আমার মতন ভুয়া পাবলিক, কী চাইলো না চাইলো, তাতে সরকারের কী?

আমি সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদকে চিরতরে বিনাশ করার দাবিতে ঘ্যান ঘ্যান করছি, আমি মুক্তমতের বিকাশ চাইছি, আমি জ্ঞানের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিতে বলছি তারস্বরে। কিন্তু আমার মতন নিতান্ত তুচ্ছ, ফালতু সামান্য এক মানুষের দাবি, কোন দাবির পর্যায়েই পড়ে না। ফলে, বইমেলা থেকে ব-দ্বীপ বিদায়, প্রকাশক মানিক গ্রেফতার।

Boi Mela 2এই শামসুজ্জোহা মানিক হলেন তিনি, যিনি ষাটের দশকের বিখ্যাত ছাত্র নেতা ছিলেন। পরবর্তীকালে হন কৃষক নেতা। তিনি একজন চিন্তাবিদ, সমাজ গবেষক, বিশ্লেষক এবং লেখক। তিনি ছিলেন আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এবং ষাটের দশকে বাঙ্গালীর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতির অন্যতম প্রধান সংগঠক। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের সঙ্গে বিভিন্ন মৌলিক প্রশ্নে মতপার্থক্যের কারণে তিনি ১৯৭২ সালে কমিউনিস্ট রাজনীতি ত্যাগ করেন। গবেষক হিসেবে তিনি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BIDS), মাল্টি-ডিসিপ্লিনারী এ্যাকশন রিসার্চ সেন্টার ও আদিবাসী উন্নয়ন কেন্দ্র’র সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে আছে রাজনীতির পুনর্বিন্যাস, মার্কসবাদের সংকট ও বিপ্লবের ভবিষ্যৎ, কৃষক আন্দোলন: অভিজ্ঞতার সারসংকলন, জাতির মুক্তি কোন পথে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রক্রিয়ার নমুনা বিশ্লেষণ, আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা, বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যা, ষাটের দশকে বিপ্লবী ছাত্র-যুব শক্তি: অভিজ্ঞতার শিক্ষা।

তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ব-দ্বীপ থেকে প্রকাশিত বই নানা সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তো এরকম একজন লেখক, গবেষক ও প্রকাশককে আর রাতে গ্রেফতারের পর বইমেলায় যাবার রুচি আমার অন্তত আর অবশিষ্ট নাই। আমি জানিনা কাদের খুশি করতে, কিংবা কাদের রক্ষা করতে এই গ্রেফতার। যদি তা শামসুজ্জোহা মানিককে প্রাণে রক্ষার জন্যও হয়ে থাকে, ব-দ্বীপের স্টল বন্ধ করে দেবার ঘটনা কোনভাবেই এর সঙ্গে যায় না।

তদুপরি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেবার যে অভিযোগ মানিকের ওপর দেয়া হযেছে, তাও অত্যন্ত বিতর্কিত ও আপত্তিকর। এবং আমি সরকারের কাছে জানতে চাই, ছাত্রশিবির ও খেলাফতের ধর্মীয় অনুভূতি ও বর্তমান অসাম্প্রদায়িক সরকারের অনুভূতির লেভেল একই কোয়ালিটি ও কোয়ান্টিটির কী না।

যদি যুক্তি ও মত প্রকাশ, প্রচার এবং এ নিয়ে আলোচনা ও তর্ক বিতর্কের কোন সুযোগই না থাকে, তবে সরকার মহোদয়ের উচিত হবে, বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সেটি করে ফেলা। আমি তাহলে রাত জেগে এই লেখা লিখে সময় নষ্ট না করে অন্য কোন কাজে ব্যয় করতে পারি আমার সময়। কিংবা চলে যেতে পারি অন্য কোথাও, যেখানে বই প্রকাশের অপরাধে জ্ঞানী লেখককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস রাখে না অশিক্ষিত, মূর্খর দল।

আর হ্যাঁ, অভিনন্দন ছাত্রশিবির, খেলাফতে আন্দোলন। আপনারা এগিয়ে যান। এ দেশ আপনাদেরই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.