রানা প্লাজার এই শ্রমিকদের ভবিষ্যত কী?

rana plazaউইমেন চ্যাপ্টার: রানা প্লাজা ধসের দুই মাস পরেও স্বজনহারা মানুষরা তাদের স্বজনকে খুঁজে ফিরছে। পথচারীদের জিজ্ঞাসা করে তাদের স্বজনের খোঁজ। দিনশেষে স্বজনের খোঁজহীন নির্বাক চোখগুলি আবারো তাকিয়ে থাকে আরেকটি ভোরের, যদি দেখা মেলে তার স্বজনের। কিন্তু সবারই উত্তর ‘নির্বাক’।

রানা প্লাজা ধ্বংসের ভয়াবহতার শিকার শানু বেগম, পাখি বেগমসহ আরও অনেকে। কারও এক পা গেছে, কারও বা দুই পা। ওরা জানে বাংলাদেশে কাজ করে বেঁচে থাকার মূল্য কতখানি। রানা প্লাজার ধসের দু-মাস পরে বাংলাদেশ ঘুরে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের নানান দুঃখ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক বেন ডহারটি।

শানু জানায়, দুর্ঘটনার সাত ঘন্টা পর উদ্ধার করা হয় তাকে। ডান পা হারিয়েছে বাম পা-ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দু-মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো হাসপাতালেই আছে। ক্ষত সারছে, কিন্তু খুব ধীরে। তাই ডাক্তাররাও বলতে পারছেন না, কবে নাগাদ তাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেয়া যাবে। ২৪ এপ্রিলের কথা বলতে গিয়ে তিনি এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

শানুর বরাত দিয়ে নিউ এজের রিপোর্টে লেখা হয়, যখন ঝাঁকুনি দিয়ে রানা প্লাজার ইট ও কাঁচগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে সে তখন সিঁড়ির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পৌঁছাতে পারেনি। কিছুক্ষণ পরেই তার পা’য়ের উপর এসে পড়ে আটতলা রানা প্লাজার একটি বিশাল বিম। পা থেকে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হয়ে একসময় অনুভূতি হারিয়ে ফেলে সে।

শানু বলেন, আমি জানতাম আমার পা শেষ। প্রচন্ড রক্ত ঝরে পা অবশ হয়ে গিয়েছিলো। প্রচন্ড ধুলায় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। হাত নাড়াচ্ছিলাম সহায়তার জন্য কিন্তু একেবারে ঢাকা পড়ে যাওয়ার কারণে উদ্ধাকর্মীরা আমাকে দেখতে পায়নি। পরে উদ্ধারকর্মীদের ডাক শুনে প্রাণপণে চিৎকার করলে তারা শুনতে পায়।
নিউ এজকে শানু বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের রংপুরের গ্রামের বাড়িতে আমার সাত বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। মেয়েটিকে লেখাপড়া করিয়ে শিক্ষিত করানোর স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু এখন ওকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে।’ হয়তো আমি আমার হাতদিয়ে কিছু করতে পারবো, কিন্তু তাতে কি আমি আমার মেয়েকে প্রয়োজনীয় সবকিছু দিতে পারবো? প্রশ্ন শানুর মনে।

এ প্রসঙ্গে শানুর বোন কাজলী (যিনি গত দুইমাস ধরে হাসপাতালে শানুর পাশেই আছেন) বলেন, আমরা খুব গরীব। দুর্ঘটনার পর আমাদের পরিবারের সবাই শানু ও শানুর মেয়েটির ভবিষ্যত নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। আমাদের টাকা-পয়সা নাই, জানি না কি হবে এখন ওদের।
শানুকে তার কোম্পানি ‘নিউ স্টাইল ওয়েভ’ এর পক্ষ থেকে এপ্রিল মাসের বেতন ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। সরকারে পক্ষ থেকে শানু পেয়েছে মাত্র ১৫০০০ টাকা।

এদিকে নিহত ও আহতদের মধ্যে অধিকাংশ নারী এবং সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।

জীবিত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে কেউ কেউ সরকারি ত্রাণ তহবিল, বেসরকারি অনুদান, ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন ধরনের সংস্থার কাছ থেকে ভালো অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছেন। অনেক সাধারণ মানুষই মাঝে মাঝে এসে টাকার খাম দিয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু সমন্বয় না থাকায় চিকিৎসা এবং তাদের পুনর্বাসন বেশ অনিশ্চিতই বলা চলে।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অর্থনৈতিক ও চিকিৎসা সহায়তার কোন তদারকি না থাকায় অনেকে হাজার হাজার টাকা পেলেও কেউ কেউ কিছুই পায়নি।
রানা প্লাজা দুর্ঘটনা অনেক পরিবার, কমিউনিটিকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। হতাহতদের অধিকাংশই নারী, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম।
টাকা পাওয়াদের মধ্যেও নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে। কয়েকজন নারী শ্রমীকের বরাত দিয়ে রিপোর্টটিতে বলা হয়, অনেকে সাহায্য পেলেও তাদের স্বামীরা সেই টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে।

এখানেই সমস্যার শেষ নয়, ধসের দিন কতজন শ্রমিক ছিলো রানা প্লাজার মধ্যে সেটি নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা ১১২৭ বলা হলেও আরো কয়েকশ শ্রমিকের কোন খোঁজ আজো পাওয়া যায়নি। প্রিমার্ক নামক এক ব্রিটিশ পোশাক কোম্পানি রানা প্লাজার সকল শ্রমিককে তিন মাসের পারিশ্রমিক দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে তালিকা তৈরি শুরু করলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এ ধরনের নানান অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার তথ্য উঠে আসে।

এদিকে জীবিত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে কাজ করছে নানান আতংক। দুই দিন আটকে থাকার পর দুই পা কেটে উদ্ধারকৃত পাখি বেগম জানান, বিবাহ বিচ্ছেদের পর দুই কন্যা সন্তানের পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম। একমাত্র সেলাই কাজ জানেন তিনি। কিন্তু আবার সেই কাজে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভীত।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.