ফুলকুমারীর অচেনা বাসর ও কয়েকটি কালো রাত

0
kakoli

কাকলী তালুকদার

কাকলী তালুকদার: ফুলকুমারীর আজ ফুলশয্যা, বাইশ বছরের জীবনের একটা বড় স্বপ্নের দিন তার। দুদিন আগে তার বিয়ে হয়েছে, স্বামীর মুখটি এখনো সে ভালো করে দেখেনি, তবে আজ দেখবে, কথা বলবে ,তার বাইশ বছর জীবনের অপেক্ষার কথা বলবে। সেই স্বপ্নে বিভোর ফুলকুমারী বউ সেজে বসে আছে।

পাশ থেকে বিভিন্ন জন বিভিন্ন প্রশ্ন করছে, কারোর প্রশ্নের উত্তর মাঝে মাঝে সে দিচ্ছে ছোট স্বরে, মাঝে মাঝে সে শুনতে পাচ্ছে না। বাড়ি ভর্তি মানুষ, সবাই অচেনা, কেউ কেউ এসে মুখটা উপরের দিকে তুলে বলছে, দেখি দেখি বউ এর মুখ দেখি। সে নিচের দিকে তাকিয়ে মুখটা আবার নামিয়ে নেয়। লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রাখা, কারোর চোখের দিকে না তাকানো, কারো মুখের উপর কথা না বলা এই রকম অনেক কথা মা বলে দিয়েছে তাকে।

ফুলকুমারী এতদিন সব মেনে চলেছে, তার মা যা যা বলেছে। ফুলকুমারী মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তার মায়ের আর কোন সন্তান কোনোদিন হয়নি। বাবা গান লিখে, গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে বেড়ায়, বাড়িতে কিছু কৃষি জমি আছে নিজেদের খাওয়া পরাটা চলে যায়। সংসারে খুব স্বচ্ছলতা না থাকলেও তিন বেলা খাবার জোটে। তবে ফুলকুমারীর কোন অভাব মা-বাবা কোনদিন রাখেনি।

এখনও বাবা বাড়ি ফেরার পথে তার জন্য চকোলেট নিয়ে আসে।

পাশ থেকে কেউ একজন বলছে বউ তো কালা, হোকনা, গায়ে মাংস নাই, তা বউ এর বাড়ি থাইকা কী দিছে? তাড়াতাড়ি পাশ থেকে আরেকজন বলছে, দিছে, পঁয়ত্রিশ হাজার টেকা নগদ, তিন পদ অলংকার সোনার, আর জামাইরে গলার চেইন। ফুলকুমারী মাথা নিচের দিকে থাকলেও কান খাড়া করে সব কথা শুনে।

বউ ভাত শেষ করে অতিথিরা ফিরে গেল, তার বড় জা একটি ছোট ঘরে ফুলকুমারীকে বসিয়ে দিয়ে গেল, আর বলে গেলো, আজ সব ঢাইলা দিও সোয়ামীরে। একটি হারিকেন জ্বলছে ঘরে, সে যখন বুঝলো ঘরে কেউ নাই, এক চিলতে ঘর টিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে থাকলো। কয়েকটি কাগজের ফুল দিয়ে একটু সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে ঘরটাকে। তার রুমে কোন দরজা নেই তবে নতুন বউ এর জন্য একটা পর্দা দিয়ে দেয়া হয়েছে।

পর্দা সরিয়ে হুট করে কেউ একজন তার ছোট্ট রুমে ঢুকেছে, একটা সুন্দর গন্ধ এসে তার নাকে লাগলো। ফুলকুমারী আন্দাজ করে মুখ নামিয়ে নিলো।বুকে তার দুরু দুরু শব্দ হঠাৎ বেড়ে গেলো। ফুলকুমারী ছোট্ট চকিতে বসে আছে, কেউ তার পাশে বসলো।

মুখ থাইক্যা কাপড় সরাও, ফুলকুমারী একটু ভীত হয়ে কাপড় একটু সরিয়ে নিলো। পুরাটা সরাও, ফুলকুমারী ইতস্তত করে সরালো মাথার কাপড়। হারিকেনটা কমাইয়া দেও।

ফুলকুমারী আস্তে নেমে হারিকেন কমিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। ফুলকুমারীর বুকের দুরু দুরু শব্দ এতোটাই বেড়ে গেলো, তার মনে হতে থাকলো পাশের ঘরে যারা আছে তারাও শুনতে পাচ্ছে। ঐখানে কি করো, চকিতে আসো।

Lonely Girl 1ফুলকুমারী পাশে গিয়ে বসে, সাথে সেই সুন্দর গন্ধটা আবার পেলো। শোন, আমার বিয়া করার চেয়েও জরুরি ছিল তোমার বাপের দেয়া টাকাটা। নয়তো তোমার মতো মেয়েরে আমি বিয়া করতাম না। কথাগুলো ফুলকুমারীর কানে সুঁই এর মতো ঢুকছে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত সুঁই দিয়ে তাকে কেও ঘা দিচ্ছে মনে হয়।

তার চোখ ভরে এলো, গলার কাছে কষ্টগুলো এসে আটকে গেলো। হুট করে টান দিয়ে তাকে বিছানায় ফেলে দিলো তার স্বামী। টেনে হিঁচড়ে তার সব গায়ের কাপড় খুলতে লাগলো। সারা শরীরে কেউ চিপতে লাগলো, কামড়াতে লাগলো, কামড়গুলো ফুলকুমারীর শরীরে ব্যথা দিচ্ছে, কিন্তু সে কোনো শব্দ করল না, তার মনে হতে থাকলো পাশের ঘর থেকে সবাই সব শুনতে পাচ্ছে।

ফুলকুমারীর গায়ে কোন কাপড় নেই, তার মনে হচ্ছে তার গায়ের উপর অবিরত কেউ কামড়াচ্ছে, ফুলকুমারী টের পায়, তার চাওয়াগুলোও মাথা চারা দিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তার এতদিনের অপেক্ষার বাসর আজ।

ফুলকুমারীর হাতটি আস্তে করে তার স্বামীর দুই উরুর মাঝে গিয়ে ঠেকায়, কিন্তু হাত দিয়েই সে মুহূর্তে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এতোক্ষণ ধরে তাকে যে কামড়াচ্ছে, আদর করছে, সেই উত্তেজনা সে হাত দিয়ে টের পেলো না!

ফুলকুমারী ঠিক বুঝতে পারছে না, কি করবে এখন? সে অপেক্ষা করতে থাকলো আরো সময়ের জন্য, কিন্তু না সেই উত্তাপ সে পুরো সময় ধরেই টের পেলো না। শুধু কামড়ের দাঁতগুলো তার শরীরে চলতে থাকলো।ফুল কুমারীর স্বপ্নগুলো চোখ বেয়ে বালিশে পড়তে লাগলো।

ফুলকুমারীর চোখে ঘুম নেই, পাশ থেকে নাক ডাকার শব্দ কানে আসছে। ফুলকুমারী ভাবতে থাকে তার ছোটবেলার কথা, বাবা বলতো, আমার ফুলকুমারী রে রাজপুতের কাছে বিয়া দিয়াম ধুম ধাম কইরা। ভাবতে ভাবতেই কষ্টগুলো বমির মতো করে বের হতে চাইলো, দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরে বসে থাকে সে।

ভোরে তার জা এসে তাকে ডাকলো, রাতভর জেগে থাকা ফুলকুমারী আস্তে করে বিছানা থেকে নামে যেন তার স্বামীর ঘুম না ভাঙে। নতুন বউ এর ভোর বেলা উঠতে অয়, যাও পুস্কুনি থাইকা ডুব দিয়া আইও, মানুষ উঠনের আগেই স্নান করতে অইবো। আমিও তাই করছি, লও আমি সাথে যাই, নতুন বউ পথ-ঘাট চিনতা না। তা সোয়ামীর সোহাগ কেমন লাগলো? ফুলকুমারী মুখে শব্দ করলো না, শুধু মাথাটা নাড়লো, হ্যাঁ বা না ঠিক বুঝা গেল না।

ফুলকুমারী স্নান সেরে একটা লাল শাড়ী পড়ে,কপালে যত্ন করে সিঁদুর পড়ে ছোট্ট আয়নায়। রান্না ঘরে গিয়ে জানতে চায় জা’এর কাছে, কি কাজ করতে হবে? চায়ের চুলার আগুনটা দেখো।

সকালবেলা ফুলকুমারী তার শাশুড়ি, ভাসুর আর স্বামীকে চা দেয়। জা এর কাছে এক কাপ চা এগিয়ে দেয়, জা জানতে চায় তুমি চা খাও? ফুল কুমারী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। আরেকটা কাপ নিয়ে তার জা দুই ভাগ করে একটা কাপ ফুলকুমারীর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘বালাই অইছে, এই ঘরের মানুষ ভাত এক বেলা কম খাইবো, কিন্তু চা কম খাইতো না, আরেকজন চা খাওয়ার মানুষ জুটলো আইজ থাইকা’।

প্রতিদিন নতুন বউকে দেখার জন্য এ পাড়া ও পাড়ার বউ মেয়েরা আসে। বউকে দেখে নানান মন্তব্য করে, হাসাহাসি করে চলে যায়। তাদের মাঝে একজনকে ফুলকুমারীর মনে ধরে। সেই একজনই তাকে দেখতে এসে জিজ্ঞাসা করে, কিগো, মনটা খুব খারাপ লাগে মা-বাবার জন্য তাই না? শ্বশুর বাড়ি অনেক কঠিন জায়গা, এখানে নিজের স্বামী না বুঝলে অনেক কষ্ট। তবুও ভালো থাইকো। এই কথাটি যে বলছিল, ফুলকুমারী মুখ তুলে একটু দেখার চেষ্টা করলো তার মুখ খানি।

ফুলকুমারীর স্বামী দুই ভাই, তার স্বামী ছোট। বড় জায়ের একটি মেয়ে,পাঁচ বছর বয়স। শাশুড়ি কানে কম শোনে, চোখেও কম দেখে, তাই সংসারে জা এর কাজ অনেক। স্বচ্ছলতা না থাকলেও তিন বেলা খাবার জোটে সংসারে। তার স্বামী রূপকুমার দেখতে ঠিকই রাজপুত্রের মতো, একটি মনোহারি দোকানে কাজ করে, এইসব জেনেই ফুলকুমারীর বাবা এখানে বিয়ে দেয়।

রূপকুমারের ছুটি শেষ, আর দুদিন বাদেই সে চলে যাবে জেলা শহরে। যাওয়ার আগে সে ফুলকুমারীকে বার বার সাবধান করে যাচ্ছিল, ঘরের বাইরে যেন না যায়, কোন পুরুষের সাথে যেন কথা না বলে।

ফুলকুমারী মুখ তোলে স্বামীর দিকে তাকায়। মনে মনে ধিক্কার দেয় রূপকুমারকে, মুখ ফুটে কিছু বলে না। শুধু রূপকুমারের কাছে জানতে চায়, এবার গেলে কয়দিন পর আবার বাড়িতে আসবে? রূপকুমার বলে, জানি না। ফুলকুমারী নিজের বুকের ভিতর যন্ত্রণা টের পায়, মা আর বাবার মুখ ভেসে উঠে। তার বাইশ বছরের সুখ স্বপ্নরা তার চোখের সামনে সাঁতার কেটে হারিয়ে যায়।

রাতে বিছানায় শুয়ে ফুলকুমারীর চোখ দিয়ে জল পড়ছে, তার পিছনে ফেলে আসা দিনগুলো কীইনা আনন্দের ছিল, কোন অভাব তো তার ছিল না। তবে স্বামী-সংসার নিয়েও তার অনেক বড় একটা স্বপ্ন ছিল। আজ রূপকুমার চলে গেল তার কাজের জায়গায়। এই সব ভাবতে ভাবতে একটু চোখ বুজে এলো যখন, তখনই টের পেলো তার গলার কাছে একটা হাত, হঠাৎ মনে হলো রূপকুমার আজ চলে গেছে, তবে?

চিৎকার করার আগেই মুখ চেপে ধরলো কেউ। ফুলকুমারী নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকলো, শেষ পর্যন্ত সে পারলো না। তার স্বপ্নগুলো খুন হয়ে চোখ বেয়ে নামতে লাগলো, চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে, সে পারছে না।

প্রতিরাতেই এই ঘটনা ঘটতে লাগলো, দেড় মাস পর একদিন রূপকুমার বাড়িতে এলো। ফুলকুমারী স্বামীকে দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যায়, কী বলবে সে স্বামীকে? শেষ অব্দি সে কিছুই বলে না রূপকুমারকে। ভিতরে ভয় নিয়ে সে সকল কাজ করে যাচ্ছে। রাতে ঘুমানোর সময় এক চিলতে রুমে সে যখন ঢুকলো, রূপকুমার চকিতে বসে আছে।

ফুলকুমারীর জা পর্দা সরিয়ে রুমে ঢুকে, হাসতে হাসতে রূপকুমারকে বলে মিষ্টি নিয়া আইলা না? রূপকুমার ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কিসের মিষ্টি? সে জানতে চায়। সংসারে নতুন মানুষ আইতাছে, আর মিষ্টি ছাড়া কি চলে? রূপকুমার বুঝে উঠতে পারে না, কার কথা বলছে বৌদি? সে ভাবে তার বৌদির আবার বাচ্চা হবে, ততক্ষণে বৌদি বলে উঠে, তুমি বাবা হইবা।

কথাটা শুনে রূপকুমার বাঘের গর্জন নিয়ে ফুলকুমারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে লাথি মারে আর মুখ দিয়ে বলতে থাকে বেশ্যা, মাগী, নষ্টা মেয়ে মানুষ, এক্ষুণি ঘর থেকে বেরিয়ে যা। তোর পেটের বাচ্চা আমার না, কোনোদিনও না।

ফুলকুমারী মার খেয়ে শক্ত হয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, সে তার স্বামীকে বললো, আমাকে কালই মার কাছে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করো, আর তোমার মুখটিও যেন আমি আর কোনোদিন না দেখি এই জীবনে। ফুলকুমারী বিয়ের পর এই প্রথম একটি পুরো বাক্য বললো স্বামীর সাথে। তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে অনবরত, বাবার কথা মনে পড়ছে, তোর জন্য রাজকুমার এনে দিব। ফুলকুমারীর ঠোঁট থেকে ছোট্ট করে শব্দ বেরুলো, আহা রাজকুমার!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 119
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    119
    Shares

লেখাটি ১৭,৩৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.