৮ মার্চে আসছে ‘টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল’

0

Bad Girl 2 উইমেন চ্যাপ্টার: টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল, প্রায় আধা ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের এই ডকু ফিকশন ফিল্মটি প্রচারিত হবে একাত্তর টিভিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে।পরিচালক শারমিন শামসের প্রথম ডকু ফিকশন ফিল্ম এটি।

সমাজ নির্ধারণ করে নারীর চরিত্র। সমাজ আখ্যা দেয় তাকে ভালো অথবা খারাপ। কিন্তু তা কীসের মাপে, কোন দাড়িপাল্লায়, কোন নিয়ামকে, তা সমাজই জানে। তবে পুরুষের জন্য এসব নিয়ামক কিংবা নিয়ম খাটে না। সমাজের এই অদ্ভুত অযৌক্তিক চিন্তার জগৎ আর আচরণ নিয়েই ডকু ফিল্ম- টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল।

টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্লের চরিত্র চারটি। চারটি মেয়ের জীবন মিলিয়ে মিশিয়ে একটি কেমিস্ট্রি তৈরি করেছেন পরিচালক। একটি মেয়ের জীবন যাপনের সংগ্রাম কখন আরেকটি মেয়ের জীবন সংগ্রামের সাথে মিশে যায়, দর্শক অজান্তেই এক কাহিনী থেকে আরেকটিতে যাত্রা করবেন।

Bad Girl 1ফরিদা পারভীন সাঁকো: এ ফিল্মের প্রধান চরিত্র বলা যেতে পারে সাঁকোকে। দর্শক প্রথমেই দেখবেন সাঁকোর মুখ। সাঁকোই তাদের টেনে নিয়ে যাবে কাহিনীর গভীরে। সাঁকো নিজের পার্লার আর জিম চালান। দুশ্চরিত্র স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে বহুকাল। নিজের সন্তান সোহা, ভাইয়ের মেয়ে বাবলি আর বৃদ্ধ মা’কে নিয়ে তার সংসার। বাবলিও তাকে মামনি বলেই ডাকে। জীবন নামের লড়াইয়ের মাঠে সাঁকো এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। আর্থিক অনটন তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। সে সংগ্রাম করেই যায়। কিন্তু সমাজ তাকে বারবার মুখোমুখি করায় সেইসব সময়ের, যখন তাকে পরীক্ষা দিতে হয়, প্রমাণ করতে হয় যে, সে ভালো মেয়ে। একা নিঃসঙ্গ এই নারীর জীবনে বারবার আসে এইসব সময়, যখন সমাজ তাকে খারাপ আখ্যা দ্যায়, প্রতিবেশি ভ্রু কুঁচকে তাকায়, আপনজনেরা সন্দেহ করে। আর সাঁকোকে তখন ভাবতে হয়, পরের দিন চাল কিনতে হবে, মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে হবে, মাকে ডাক্তার দেখাতে হবে।

এ ফিল্মটিতে কাজ করতে গিয়ে সাঁকোর অনুভূতি চমৎকার।বললেন, শারমিনের সাথে পরিচয় আমার পার্লারে, আমি জিমের রুমে শুয়ে হুমায়ূন আজাদের একটা বই পড়ছিলাম। সাধারণত যখন কেউ জিমে ভর্তি হতে আসে নানাধরনের প্রশ্ন করে! কিন্তু এই মেয়েটা কোন প্রশ্ন ছাড়াই ভর্তি হয়ে গেল। আমার জিমের প্রতিটি সদস্য আমার ফ্যামিলির মতো! শারমিনের সাথে খুব অল্পসময়ের মধ্যেই বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। যদিও ও বয়সে আমার চেয়ে অনেক ছোট!! আমাদের সম্পর্কটা কখনো বোনের মতো, কখনো বন্ধুর মতো!! মাঝে মাঝে হয়তো গল্পের ছলে আমার জীবনযুদ্ধের কিছু অংশ নিজের অজান্তেই বন্ধু ভেবে শেয়ার করেছি!! আর সেখান থেকেই এই পাগলী মেয়েটার মাথায় ঢুকেছে আমাকে ওর ফিল্মের চরিত্র করার ভাবনা। সাঁকো আরো বলেন, এই সাহসী ফিল্ম এ সমাজ আর সমাজপতিদের আজীবন লালিত চিন্তাভাবনাকে নাড়া দিক, এটাই আমার চাওয়া।

Bad Girl 5মারজিয়া প্রভা: অ্যারোনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী প্রভার ভাললাগার জায়গা লেখালেখি, স্বপ্ন সাংবাদিকতা করা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ ও অনলাইন পোর্টালে সাহসী আর সচেতনতামূলক লেখালেখির জন্য এই বয়সেই সে অনেকের কাছে পরিচিত নাম।সঙ্গে চলছে নানা ধরনের সমাজ কল্যাণমূলক কাজ। কোনকিছুই তার কাছে বাধা নয়। ‘টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল’ ফিল্মের অন্যতম চরিত্র প্রভা। এই ফিল্মে কাজ করার অভিজ্ঞতা সে তুলে ধরলো এইভাবে:

‘আমার অভিনয় ব্যাপারটাই একটা ঘটনা। জীবনে আমি অন স্টেজ ভূমিকা পালন করতে পারতাম না। এক, সুরত নাই, দুই, ফিগার নেই! তিন, অভিনয় নাই! এত নাই নাই শুনতে শুনতে অনস্টেজ অভিনয় করার শখ আমার মিটে গিয়েছিল। সেই আমাকে যখন বলা হলো “ক্যামেরার সামনে তোমার কয়েকটা শট নিব”। আমি ক্যাবলা হয়ে কয়েক মিনিট বসে ছিলাম। ডিরেক্টার মুনমুন শারমিন শামস্ আপু। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করে ড্রিম প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। প্রথম কাজ টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল

জিন্স পরলে, শার্ট পরলে মেয়ে খারাপ, সিগারেট খেলে মেয়ে খারাপ, মেয়ে সোজাসাপটা কথা বললে খারাপ, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে খারাপ। সেদিন বাসে এক মহিলার ঘাড়ের উপর এক ছেলে পড়ছিল বারবার ইচ্ছে করে। দুই তিনবারের পর চারবারের সময়ে মেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে।

ছেলে গজগজ করে বলে “মহিলা মানুষ এত কথা বললে হয়?”এই ডকুতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি রাস্তায় এক বোরকা পরা মহিলাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো “খারাপ মেয়ের সংজ্ঞা কী”, তখন তার টুপি-পাঞ্জাবি পরা জামাই বউকে ধমক দিয়ে ক্যামেরার সামনে থেকে সরিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে বকবক শুরু করে। এই ছবি করতেই দেখেছি, শারমিন আপুর শার্ট পরা শরীরের দিকে হোটেলবয় তাকিয়ে থাকলে আপুর স্ট্রেইট জবাব “ চোখের দিকে তাকায় কথা বল”।

বেচারার এই জীবনে মেয়েদের বুকের দিকে তাকানোর শখ মিটে যাবে।এই হলো আমার ডিরেক্টর। তাহলে আমরা যারা এর কথামতো কাজ করেছি, অভিনয় করেছি তাদের ব্যাপারটা আঁচ করতেই পারবেন! ডিরেক্টার শুধু চেয়েছেন আমরা কথা বলি, আমরা জানাই সব কথা। ক্যামেরার সামনে বুক চিতিয়ে আমরা যেন আমাদের নিজেদের জীবনের কথা, আমাদের দর্শনের কথা বলি। সমাজ থেকে আমি কতবার খা** গালি শুনেছি তার গল্প বলি। আমি বলে গেছি গলগল করে। বাধা দেননি আপু। টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল সমাজকে তুড়ি মেরে বদলাতে পারবে না। তবে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে, সমাজ যেভাবে একটা মেয়েকে ভাবে, সংজ্ঞায়িত করে, তার বাইরেও এক জগত আছে মেয়েদের। সে জগতে মেয়েরা অনেক বেশী শক্তিশালী, একা হাতে দুনিয়া বদলাতে পারে!’

Bad girl 4মুশারাত জাভিন লিভু: টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল ডকু ফিকশনের অন্যতম চরিত্র মুশারাত জাভিন লিভু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে মাস্টার্স করা উচ্চশিক্ষিত লিভু একসময় উচ্চপদে কাজ করতেন একটি নামকরা বীমা কোম্পানিতে। পরে সংসার আর সন্তানের জন্য চাকরি ছেড়ে দেন।তারপর সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে মিশে যান সংসারের স্রোতের সঙ্গে। একসময় যে ক্যারিয়ার, যে চাকরিটিকে নিজের সন্তানের মত ভালোবাসতেন, সেই দিনগুলো আজ শুধুই অতীত। এখন দিন কাটে মেয়েকে স্কুলে আনা নেওয়া করে, মেয়ের টিফিন তৈরি করে, বাজার আর রান্না করে, সংসার সামলে। লিভুর ভাষায়, তিনি এতে সুখি। কারণ তার আশেপাশের মানুষগুলো তার এই আত্মত্যাগ আর নিবেদিত মনোভাবের কারণে সুখি হয়েছে, উপকৃত হয়েছে। তার সন্তান তাকে সর্বক্ষণ পাশে পাচ্ছে। এখানেই তার সুখ।

লিভুর সেই সুখের সন্ধান পেতেই তার মুখোমুখি হয়েছিলেন শারমিন। টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল ডকু ফিকশন ফিল্মে লিভু হলো সেই ভালো মেয়ের প্রতিনিধি, যাকে এই সমাজ চায়। ভালো মেয়ে কে? এই প্রশ্নের উত্তরে লিভুর জবাব তাই, ‘আমিই ভালো মেয়ে। কারণ শৈশবে বাবা মা’র কথা শুনে চলেছি। আর আজ সবাই যেটাতে সুখি হয়, সেটা করার চেষ্টা করি। তাই আমিই সেই ভালো মেয়ে’।

কেমন লেগেছে লিভুর টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্লে কাজ করতে? বললেন, ‘একদম অন্যরকম অভিজ্ঞতা, যা আগে কখনও হয়নি। অনেক মজা লেগেছে। লিভু আরো বলেন, ‘আমি আসলে শারমিনের লেখার ফ্যান। এত অল্প বয়সী একটা মেয়ে এত পড়ালেখা করে, এত কিছু জানে আর এত বোঝে যে অবাক লাগে। আই ফিল সো প্রাউড ফর হার। বন্ধু সুমী সাহাবুদ্দীনের মাধ্যমে শারমিনের সাথে আমার পরিচয়। এখন নিয়মিত ওর লেখা পড়ি আর মুগ্ধ হই।

মনে হয়, আমি যা বলতে চাই, কিন্তু বলতে পারি না, শারমিন সেটাই লিখে ফেলে অনায়াসে। টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্লের ক্ষেত্রেও তাই। এরকম একটি বিষয় নিয়ে এর আগে এই দেশে কেউ সিনেমা তৈরির কথা ভেবেছে বলে আমার মনে হয় না। এত ভালো একটা বিষয় বেছে নিয়ে এত সুন্দর একটা ডকুমেন্টরি তৈরি করতে পারার জন্য শারমিনকে আমার অনেক অনেক অভিনন্দন’।

পূর্ণিমা রাণী শীল: IMG_20150410_155800২০০১ এর এক অন্ধকার অধ্যায়ের নাম পূর্ণিমা। সেবার নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার সুযোগে একদল পুরুষ গণধর্ষণ করে ১৩ বছরের কিশোরী পূর্ণিমাকে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে দোষীরা শাস্তি পায় ঠিকই। কিন্তু এ সমাজের চোখে পূর্ণিমা আজো যেন এক কলঙ্ক হয়েই আছে। এ সমাজে তাকে গ্রহণ করেনি। তাকে দূরে ঠেলেছে তার পরিবার, প্রতিবেশি, আত্মীয়, বন্ধু। স্বাভাবিক কোন জীবন পায়নি সে। রাজনৈতিক ফায়দাও লুটতে চেষ্টা করা হয়েছে তাকে নিয়ে। এ সমাজের চোখে পূর্ণিমা খারাপ মেয়ে, কলঙ্কিনি, নষ্ট ভ্রষ্ট নারী। প্রায় আত্মগোপনে থাকা পূর্ণিমাকে তুলে এনেছেন শারমিন ফিল্মের পর্দায়। এই প্রথম নিজের জ্ঞাতসারে ক্যামেরার সামনে নিজের জীবনের সব কথা বলেছেন পূর্ণিমা।

টু ডিফাইন এ ব্যাড গার্ল প্রসঙ্গে পূর্ণিমা জানান, আমি সত্য বলেছি। এই সত্য ভাষণের যে আনন্দ যে ভালোলাগা, তা বলে বুঝাতে পারব না। পরিচালক শারমিন আপুসহ ফিল্মের পুরো টিম আমাকে অনেক সম্মান আর ভালোবাসা দিয়েছে। এটা আমি কখনও ভুলব না।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৫৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.