শুধু একথালা শাদা ভাত চাই

0

Lailiসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: ছোটবেলায় যখন সবার মাঝে থেকেও আমাকে আলাদা করে দেওয়া হতো, খুব কষ্ট পেতাম মনে মনে। নিজের অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে যখন ব্যর্থ হয়ে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাতাম, খুব ইচ্ছে করতো আমারো আপন কেউ এসে পাশে বসুক, মাথায় হাত দিয়ে বলুক ‘এতো কী খুঁজিস, আমি আছি না?’

কেউ আসতো না পাশে। কারো হাতের উষ্ণ ছোঁয়া আমাকে স্পর্শও করতো না। কান্না দলা বেঁধে বুকে জমে থাকতো। ক্ষুধার ভাত দলা ঠেলে ঠেলে নিচে নেমে যেতো যখন, তখন বুকটা হালকা লাগতো। এই ভাতকেই খুব ভালবাসতাম আমি।

যখন একটু বড় হলাম, ভাতের থালাটাও বড় হতে থাকলো। খাবারে ভালো-মন্দ নিয়ে কোন বালাই ছিল না আমার। মানে পছন্দ-অপছন্দ বলার কোন মানুষ ছিল না যে। কিছু একটা হলেই সেরে নিতে পারতাম এক থালা ভাত। বাড়িতে চাকর-বাকর মিলে ৩০/৩৫ জনের রান্না হতো। এতো মানুষের মাঝেও প্রতি বেলা্য়ই অনির্ধারিত ২/৪জন অতিরিক্ত লোকের খাবারও চলেই যেতো। কিন্ত আমার এক থালা ভাত প্রায়ই কারো না কারো কাছে খোটা শুনেই গিলতে হতো। খেতে বসে যখন খাবার নিয়ে কথা শুনতাম, সামান্য তরকারিতে মাখা ভাতগুলো থেকে সবটুকু ঝোল উবে গিয়ে আরো ঝরঝরে হয়ে যেত। গিলতে কষ্ট হতো অনেক। চোখের কয়ফোঁটা জল রোজ ভাতের সাথে মিশে গেলে ভাত আবার সরস হযে উঠতো। আমি সবটুকু ভাত খেয়ে তবেই উঠে যেতাম। অনেক ভাত ভালবাসতাম আমি।

আমাকে যখন সে বাড়ি থেকে বিদায় করে দেয়ার কথা উঠলো। আমি যেতে চাচ্ছিলাম না কোথাও। ভালবাসা না থাক, এ বাড়ি আমার একটা ঠিকানা দিয়েছে, যে ঠিকানাটা আমি হারাতে চাচ্ছিলাম না। আর তিন বেলার তিন থালা ভাতও তো ছিলো। আমি যাবো না শুনে আমার মাথার উপর থেকে খোটা দিয়ে বলতে থাকলো ‘তিন বেলার তিন থালা ভাত আর এ বাড়িতে হবে না। তাই তোকে বিদায় করে দিতে হচ্ছে। যেখানে যাবি সেখানে খেয়ে পরে থাকবি।’

শুনে এই বাড়ি, এই বাড়ির পথ চিনে যদি কেউ কোনদিন আমাকে খুঁজতে আসে, এমন আশার কাছে আমার ভাতের থালা বড় ভারী হয়ে গেলো। আমার বিদায়ের নিনাদ বাজতে থাকলো চারদিকে। তবুও আমি ভালবেসে একথালা ভাত খেয়েছিলাম সেদিনও।

আমার ঠিকানা বদল হলো। সে বাড়িতে আমার ভালবাসার ভাত আরো বেশি দামী। তিন বেলা রান্না হয় না। দুই বেলা খেতে হয়। তবুও বাড়ির সবার খাওয়ার পর পোষা কুকুরটাকে খাইয়ে যদি কিছু বেছে যায় তবেই। মাঝে মাঝে কুকুরটাকে আমার খুব হিংসা হতো। সে রোজ আমার আগে খাবার পায়। তার খাবার কম পড়লে বাড়ির সকলে মনোকষ্টে ভোগে। আবার কখনও কিছু ভাত বেশি বেঁচে গেলে বড়দের হুকুমে তুলে রাখতে হতো থালায় করে। পাছে কারো খিদে পায় তার জন্য। যেদিন যতটুকু থাকে, সেটুকুই খাওয়ার অভ্যাস করতে হলো আমাকে। কারণ আমি ভাত ভালবাসতাম।

কারো প্রতি ক্ষোভ বা প্রতিবাদ করার কোন সাহস আমার ছিল না। পাছে আমার এটুকু ভাতের নিশ্চয়তাও হারিয়ে যায়! তাই চুপ করে থাকতে লাগলাম। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ এ খাবারগুলো আমি সামনে থাকলেও কখনও খেতাম না। শুধু সামান্য ভাত ও সস্তা সবজি বা ডাল খেতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। খুব বেশি মন খারাপ হলে আমি নিজেকে শাস্তি দিতাম, আজো দেই। শীতের রাতে বাসার ছাদে বসে থাকি। অসুখ করলে ওষুধ না খেয়ে কষ্ট ভোগ করি। দূর-দূরান্ত পায়ে হেঁটে চলে যাই। অবশ-বিবশ হয়ে পড়ি যখন আছাড়-পিছাড় খেয়ে ফিরে আসি, দুইদিন একটানা না খেয়ে পড়ে থাকি। আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়, ভাত না খেয়ে থাকতে। তবুও এ্ই কষ্টটা আমি উপভোগ করি। ভালবাসার ভাতকে দূরে রাখার কষ্ট।

আমার সন্তানরা বড় হতে থাকলো। ওরা ভাত খেতে চায়। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ খেতে চায়। আমার কাছে দাবী তোলে। কিন্তু আমার কোন সামর্থ্য নাই। ঘরে চাল নাই। হাতে টাকা নাই। কারো কাছে চাওয়ার মতো কোন আপন জন নাই। শুধু ক্ষুধা আছে। ভাতের ক্ষুধা। দাউ দা্উ করে জ্বলতে থাকা ক্ষুধা। সন্তানরাও ক্ষুধা নিয়ে আমাকে কামড়াতে আসে। শুরুতে আমি তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেই কামড়ানোর জন্য। ওরা কামড়ায়। জোরে জোরে কামড়ায়। রক্ত বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ে। ওদের ক্ষুধা মেটে না। ওরা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রক্ত ঝরা দেখে ওরা কাঁদে না, আমার চোখের জল পড়া দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে।

সেদিন আমি ওদেরকে সাথে নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ি। কোন ঠিকানার জন্য নয়। কোন স্বজনের ভালবাসার জন্য নয়। ক্ষুধার জন্য। ভাতের জন্য। কাজের জন্য। আমার আর ফেরা হয়নি কোনদিন।

আজ আমার সন্তানরা বড় হয়েছে। এখন ওরা নিজেদের ভাত নিজেরাই খুঁজে নিতে পারে। শুনে আমার ভালো লাগে। কিন্তু আমি আজো ছুটে চলছি একমুঠো ভাতের জন্য। আমি আর স্বজন খুঁজি না। ভালবাসা খুঁজি না। কারো জন্য পথ চেয়েও থাকি না। কারো হাতের উষ্ণ ছোঁয়া খুঁজি না। শুধু ভাত চাই। নিজের থালাটায় একথালা শাদা ভাত। কারো দয়া, অনুগ্রহে নয়। আমি যে ভাত বড্ড বেশি ভালবাসি।

লেখক সাংবাদিক  

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.