এক যোদ্ধার ডায়েরি (প্রথম পর্ব)

tania morrshedতানিয়া মোর্শেদ (উইমেন চ্যাপ্টার):
সেপ্টেম্বর ৮, ২০০৯
আমার ক্যান্সার ক্লাবে যোগদানের আজ তৃতীয় বার্ষিকী! দীপ্ত’র সপ্তম জন্মদিন দেখবো কি না জানতাম না তখন! আমার কাছে আজ মানে “আজ”! আগামীকাল “ভবিষষ্যৎ”! জয় হোক জীবনের!!

নভেম্বর ১৯, ২০০৯: ৩৪ বছর পর শেষ পর্যন্ত বিচার হলো! তিরিশ লক্ষ শহীদের, ২~৪ লক্ষ মা-বোনদের ধর্ষণের, আর অসংখ্য মানুষের অবর্ণনীয় অত্যাচারের সুবিচারের আশা ত্যাগ করা যাবে না কিছুতেই! একজন রাজাকারকেও ছাড় দেওয়া যাবে না।

ডিসেম্বর ২৬, ২০০৯: হৃদয়ে মাটি ও মানুষ দেখবার সময় দীপ্ত জানতে পেরেছে যে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং (বৈশ্বিক উষ্ণতার) প্রথম শিকারের মধ্যে বাংলাদেশ আছে। সে বলা শুরু করলো, “আমাদের কিছু করতে হবে।” আমি বিশ্বাস করি যে, একটি ছবি হাজারো কথার সমান মূল্যবান। এখন থেকে সে এ’ব্যাপারে সচেতন হবে তা আশা করি। আমি অনুভব করছি যে, “বাংলাদেশ” নামটি তার হৃদয়, মনে খুব ভালো ভাবে বোপিত হয়েছে। শুধু সঠিক ভাবে পরিচর্যা করে যেতে হবে!

জানুয়ারী ২৭, ২০১০: ১৯৭২-এ বঙ্গবন্ধু নাটোরের উত্তরা গণভবনে যখন গিয়েছিলেন, যে ছোট্ট মেয়েটি তাঁকে ফুলের মালা দিয়েছিল, সেই মেয়েটি আমি! তাঁর সেদিন জ্বর ছিল, আমারও জ্বর ছিল। তিন বছর পর বাবার চোখে প্রথমবারের মত জল দেখেছি! আমার অল্পবয়সী সন্তানটি সব সময় গুলিয়ে ফেলে, কে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করেছে! সে মনে করে পাকিস্তানি সৈন্যরা করেছে!

ডিসেম্বর ২৪, ২০১০: গান গাইতে/শুনতে ভালবাসেন এমন কয়েকজনকে গতরাতে নিমন্ত্রণ করেছিলাম। মা’র বয়সী এক ভাই যাবার সময় বলে গেলেন, “২০ বৎসর এখানে আছি। এতো আনন্দ কোন বাড়িতে পাইনি।” প্রবাসী বাংলাদেশীরা অতি ধার্মিক(মুসলমান) হয়ে যাচ্ছেন। বাঙ্গালি পরিচয়ের আগে মুসলমান পরিচয় দিয়ে থাকেন। ধর্ম/নাস্তিকতা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, এ’চিন্তার সাথে মিল থাকা মানুষ হারিকেন নিয়ে খুঁজতে হয়! ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধটা বেশি কঠিন না সমাজের অসুখগুলোর সাথে!

মার্চ ৮, ২০১১: শিক্ষা শুরু হয় বাড়িতে। আমাদের যাদের ছেলে সন্তান আছে তাদের উচিৎ সন্তানকে নারীদের শ্রদ্ধা করতে শেখানো। আর কন্যা সন্তানের বাবা-মা’দের উচিৎ সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী হতে শিক্ষা দেওয়া। প্রতিটি শিশুকেই প্রতিটি মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শেখানো উচিৎ।

মার্চ ১৪, ২০১১ : প্রতিটি মুহূর্তে কোথাও না কোথাও ভূমিকম্প/সুনামি হয়ে চলেছে, অনেক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে। যা অন্য মানুষরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জানে না। যখন কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে ব্যাপকভাবে এবং বদলে যায় অনেক মানুষের জীবন, আর মানুষ তা জানে/দেখে টিভিতে, সবাই শোকাহত হয়। ব্যক্তিগত ও প্রাকৃতিক, দু’টোই জীবন বদলে দেয়। আমার হৃদয় মুচড়ে ওঠে প্রতিবার, সবার জন্য। এখন জাপানের মানুষদের জন্য।

শ্বাশত সত্য!
(সামথিং ভেরি ওল্ড বাট অলওয়েজ নিউ)

১৪ এপ্রিল, ২০১১: দীপ্ত তিনদিন আর দু’রাতের জন্য আউটডোর স্কুলে। প্রতি বৎসর ফিল্ড ট্রিপে যায়। কিন্তু এবারই প্রথম রাতে বাইরে থাকা। দু’রাত আমাকে ছাড়া থেকেছে এ পর্যন্ত। একবার বাবার সাথে ফুপুর বাড়িতে একরাত, কিছুদিন আগে এক বন্ধুর (পারিবারিক ভাবে খুব জানা) বাড়িতে আউটডোর স্কুলের প্রস্তুতি হিসাবে। জরুরি কারণ ছাড়া ফোন করা যাবে না। ওর কাছে ফোন রাখতে দেয়নি। কেবলমাত্র রাতের খাবারের সময় দেখা করা যাবে। ৪০ মাইল দূরে গিয়েছিলাম আজ সন্ধ্যায়, দেখা করতে। আমাদের দেখে সে বিড়ম্বিত হয়েছিল, দেখে বুঝেছি। ১২০টি ছেলে-মেয়ের মধ্যে কেবল ওর বাবা-মা গিয়েছে। ওর অনুভূতি যা ছিল তাতে আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই। প্রতিটি ছেলে-মেয়ে আমাদের দেখছিল। সাথে সাথে বুঝেছি যে রাতের খাবারের সময়ের জন্য আমাদের থাকা ঠিক হবে না। জিজ্ঞাসা করলাম যে, ডিনারে থাকবো কি না। ও বললো যে, বন্ধুদের সাথে আজ ডিনার করবে। আগামীকাল আমাদের সাথে। আমি বললাম যে, আগামীকাল নাও আসতে পারি। ও যেতে বললো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে, ডিনার না ক্যাম্প ফায়ারে আসবো? সাথে সাথে উত্তর, “ক্যাম্প ফায়ার।”
ফেরবার পথে আমরা বুঝলাম যে, আমাদের বাচ্চাটা বড় হয়ে যাচ্ছে! অনেকেই মনে করে যে, আমি অতি সচেতন মা। আমি ভালো অনুভব করলাম যে, সে বড় হচ্ছে। আমার একটা অংশ সব সময় তাকে নিয়ে চিন্তিত থাকে, আরেকটি অংশ চায় যে সে শক্ত, আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী হোক। যদিও সে আমাদের নিয়ে দু:শ্চিন্তা করে, বিশেষত আমার স্বাস্থ্য নিয়ে, সময় সময় সে দেখিয়েছে যে সে মানসিকভাবে শক্তিশালী আর দু:সময়ে শান্ত থাকে, বাবার মত। জীবনটা সহজ নয়, অনেক মানুষেরই। আমি ও’কে নিয়ে দু:শ্চিন্তা করি, ২০০৬ থেকে। সে বেড়ে উঠছে শুধু বাবা-মা’কে কেন্দ্র করে। তার কোনো ভাই-বোন না থাকায় সে বেশ একাকি। একজন অনুভূতিপ্রবণ ও যত্নশীল (কেয়ারিং) মানুষ হবার জন্য সে আঘাত পাবে বারে বারে এই পৃথিবীতে! এইজন্যই তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। একবার অসুস্থ হয়ে তাকে ইমার্জেন্সিতে যেতে হয়েছিল। নার্স তার ভেইন না পাবার জন্য অনেক খোঁচাচ্ছিল। আমি বলেছিলাম, আমার হাত ধরতে আর যত জোরে ইচ্ছে চাপ দিতে, যত ব্যথা তত চাপ। কিছু মাস পর আমার পায়ের সার্জারির পর যখন কোনো ব্যাথানাশক কাজ করছিল না, ও আমাকে বলেছিল ওর হাত ধরতে, চাপ দিতে। বলেছিল, “মা তোমার সব ব্যথা আমায় দাও।” আমি কাঁদতে চেয়ে পারিনি! সার্জারির আগ দিয়ে আমার সার্জন নিডল বায়োপসি করেছিলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী। ল্যাব থেকে ফিরে আমার চোখের দিকে আর তাকাননি। মুখ পার্পল রঙ ধারণ করেছিল। তিনি একজন শ্বেতাঙ্গ। আমার সাড়ে ছয় বৎসরের সন্তান আমাকে বলছে আমার সব ব্যথা তাকে দিতে! আমি মনে মনে তখন তার কাছে ক্ষমা চাইছি, আমার জন্য সে ভবিষ্যতে যে কষ্ট পাবে তার জন্য। এক তৃষ্ণার্তের মত তখন আমি অপেক্ষা করছিলাম তার সপ্তম জন্মদিনের জন্য! সে এখন ১১। গত গ্রীষ্মে আমার অনকোলজিস্ট যখন তার চিন্তার কথা জানালেন, আর শুরু হলো নতুন সব টেস্ট, আমি ওর ১১তম জন্মদিনের জন্য অপেক্ষা শুরু করলাম!

কয়েক বৎসর আগে দীপ্ত আর আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে সে আমায় বললো, “মা অপরাধ নিও না। প্রাকৃতিক নিয়মেই তুমি এক সময় থাকবে না, তখনো কি তুমি আমায় দেখে রাখবে? (মনে হয় কোনো বই পড়ে এই প্রশ্ন জেগেছে, সে জানে না আমার বিগ “সি” (ক্যান্সার)-র কথা। আমি বলেছিলাম, “যেখানেই থাকি না কেন তোমাকে সব সময়ই দেখে রাখবো।” সে ছোটবেলা থেকেই জানে যে, সান্তা ক্লজ নেই, টুথ ফেয়ারিও নেই। তবুও আমি চাইছিলাম যে, সে একটা কিছুতে বিশ্বাস করুক যা তাকে সান্ত্বনা দেবে হয়তো!

আগামীকাল আমরা যাব দেখা করতে। তবে ও’কে স্পেইস দেবো, বিড়ম্বিত করবো না। ও’কে শুধু বুঝিয়ে দেবো যে, আমরা সব সময়ই ওর জন্য আছি। ওর দরকার লাগুক বা না লাগুক। এই দু’রাত সম্পূর্ণ নিদ্রাহীন কাটবে আমার! এ হচ্ছে বাবা-মা হবার অংশ। আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি আমার মা’র কথা! কীভাবে জীবন পার করছেন তিনি! আমার ভাইদের দেখেন না তিন বৎসর, আমাকে দেখেন না আড়াই বৎসর! আর তিনিই একমাত্র মা নন, যার জীবন এরকম! আমার বাচ্চাটা! আমাকে তোমায় ছেড়ে দিতেই হবে … তোমাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী হবার জন্য! অচিরেই দেখা হবে!

হতাশা!
মে ২২, ২০১১: দশদিন আগে একজনের কিডনি ট্র্যান্সপ্ল্যান্টের জন্য ফান্ড চেয়ে অনুরোধ এসেছে, অংকুরে। তার আগে একজনের ক্যান্সারের চিকিৎসার। গতরাতে একটি পাঁচ বৎসরের শিশুর ক্যান্সারের জন্য! বাংলাদেশে অল্প বয়স্ক মানুষের (শিশুসহ) দুরারোগ্য ব্যাধির প্রকোপ বেড়েছে সাংঘাতিকভাবে। এখন অনেক অসুখ ধরা পড়ছে, আগে যা সম্ভব ছিল না। কিন্ত ক্যান্সার, কিডনি ফেইলিওর এসব অসুখ অনেক বেড়েছে এটিও সত্য। শিল্পায়নের জন্য এবং শিল্প বর্জ্যের সঠিক নীতিমালা না থাকবার জন্য পরিবেশের (পানি বিশেষত ঢাকার নদী-নালাগুলোর, বাতাস, মাটির উপর ও নীচ) অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে!
এই সব দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা খরচ সাংঘাতিক বেশি! খুব কম পরিবারের পক্ষেই পুরো খরচ যোগাড় করা সম্ভব। আর নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত হলে তো কথাই নেই! প্রতি সপ্তাহে অংকুরে কোন না কোন অনুরোধ আসে। খুব সামান্যই করা সম্ভব হয়। তবুও চেষ্টা করা হয় কিছু না কিছু করবার। কাউকে কী না বলা যায়!! যে সব রোগীর বন্ধুরা এদেশে বাস করেন, তারাই প্রধানত ফান্ড তোলায় নিযুক্ত থাকেন। যাদের কেউ নেই, তাদের জন্য অংকুরের নিজস্ব ফান্ড (মানুষেরই দেওয়া) থেকে কিছু দেওয়া হয়। আমি প্রতিবার মনে মনে বলি, “দুঃখিত।” যদি সবার জন্য করতে পারতাম পুরোটা! আমি সব সময় মনে মনে বলি, “চেষ্টা করা কিছু না করবার থেকে ভাল। বিন্দু বিন্দু জলে সাগর না হলেও পুকুর তো হয়।”

কিন্তু মনে হচ্ছে যে, আমি মানুষকে কিছু করবার ব্যাপারে/অংশগ্রহণ করবার ব্যাপারে উৎসাহ দেবার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছি! আর পারছি না! বাংলাদেশীদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবা (টাকা, সময়, এনার্জি যাই বলি না কেন) করবার আগ্রহ খুব কম। ব্যতিক্রম নিয়ে বলছি না, সাধারণত যা দেখা যায় তা বলছি। বদলে দেবার কথা যারা বলেন সাধারণত তারা করেন খুব কম। যারা “বিপ্লবের” অপেক্ষায় আছেন (বিপ্লবটা অন্য কেউ “নিয়ে আসবে” ভাবেন) তাদের উদ্দেশ্যে বলি, “স্বপ্ন দেখতে থাকুন!”

ইচ্ছে হলেও …
অক্টোবর ১৮, ২০১১: ইচ্ছে হলেও যায় না বলা,”আমাকে আর সূঁচের খোঁচা দিও না তো!” রক্তনালী এতই সরু যে প্রতিবারই কতবার করে খোঁচা খেতে হয়, এবং কত হাজার বার পরীক্ষা! রক্তঝরা (অন্যের) দেখলে অশ্রু ঝরে।
কত বার সার্জনদের কাটাছেঁড়ার বস্তু হতে হয়! জরুরি ওষুধে অ্যালার্জি, চিকিৎসা করতে ডাক্তারদেরও বেগ পেতে হয়! কত-শত বার “সাবধান বাণী” লেখা ঘরের বিরাট যন্ত্রের মাঝে ঢুকতে হবে! কত, কত বার “বায়োপসি” নামের শব্দটার সাথে মোকাবিলা করতে হবে! কত, কত জায়গায় কাটাছেঁড়ার/রেডিয়েশনের চিহ্ন বয়ে বেড়াতে হবে! শহরের সব বড় বড় হাসপাতাল অতি চেনা জায়গা হয়ে যায় … তবুও বলা যায় না, আমি আর চাইনে এসব … বরং প্রশ্ন করি, কেন, কেন আমাকে কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন দিতে পারবে না?
এই ধরনের ক্যান্সার কোটিতে একজনের হয় বলে? “ক্যান্সার” শব্দটি যাকে ছোঁয় তারও কি জাত ভেদ আছে?

সারাজীবন আমি “সংখ্যালঘু”দেরই দলে … এমন কি ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধেও! চাইলেও বলা যায় না, আমি এখন পৃথিবী দেখতে বের হবো … বলা যায় না, আমি এখন বাংলাদেশের অচেনা এক গাঁয়ে শিশুদের সাথে বাস করতে চাই … অথবা শুধুই গান শুনতে চাই, পাহাড় দেখতে চাই … অথবা আবারও কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই … “দীপ্ত” নামের এক প্রাণোচ্ছল বালকের জন্য ….. শুধুই যুদ্ধ করে যেতে হয় … বেঁচে থাকবার জন্য …….. আর প্রতিবার “ধন্যবাদ” জানাতে হয় … … যোদ্ধাটি আমি … আমার কোনো অতি প্রিয়জন নয়!
(প্রিয়জনদের অশান্তিতে রাখবার জন্য আমি ভীষণ দুঃখিত)

আমার অ্যাটিচিউড!
মার্চ ১৪, ২০১২:
অনকোলজিস্ট: দু’টো স্পট নজরদারিতে রাখতে হবে। এ’দুটো গতবারের সার্জারির কারণে ক্ষতগুলোর খুব কাছে। এত তাড়াতাড়ি কিছু বলা যাচ্ছে না। তোমার যে ধরনের সারকোমা (রেয়ার ধরণের ক্যান্সার) তা যখন ফুসফুসে চলে যায় তা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। তোমার ক্ষেত্রে খুবই ব্যতিক্রম। এগুলো এত ছোট ছিল। আর পাঁচ বৎসর ধরে তারা ছিল এবং খুব ধীরে তা বেড়েছে। হয়ত তোমার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিয়ুন সিস্টেম)/ খাদ্য/ জীবন যাপন প্রণালী/ জীবনবোধ – দৃষ্টিভঙ্গী (অ্যাটিচিউড) …

আমি: এটা আমার চরম আশাবাদী মনোভাব/দৃষ্টিভঙ্গী! আমার আছে অসম্ভব রকমের আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। গত পাঁচ + বৎসরে আমি স্বেচ্ছাসেবা দিয়েছি আমার বেশীর ভাগ সময়ের। (কি করেছি তা বলিনি, শুধু তাঁকে ধারণা দিয়েছি, আমার অন্তর জগতের)।

অনকোলজিস্ট: তুমি যা করছো তা করে যাও!

আমি: ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ মনে হয় যেন বিনা অপরাধে ফাঁসির আদেশ পাওয়া অথবা যাবজ্জীবন পাওয়া! আমার জীবনটা খণ্ডিত হয়ে গেছে … … এক সিটি স্ক্যান থেকে আরেক সিটি স্ক্যান পর্যন্ত … … প্রতি দু’মাস বা চার মাস অন্তর অন্তর … … … মনে হয় যেন বিচার হচ্ছে বারে বারে … বারে বারে ……… মনে হয় যেন এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দী! দীর্ঘমেয়াদী কিছু পরিকল্পনা করা যায় না … … …কোন বড় স্বপ্ন দেখা যায় না … … … আসলে স্বপ্নই দেখা যায় না (মানুষ যাকে স্বপ্ন বলে)। গতবারের সার্জারির পর দু’মাস ধরে আমার “স্বপ্ন” ছিল একটু পাশ ফিরে শোওয়া … … দীপ্ত’র লাঞ্চ বাক্সে খাবার ভরা (খাবার তৈরি করা নয়) … … … এগুলো এখন আর স্বপ্ন নয়!! দীপ্ত’র ১২তম জন্মদিন দেখতে চেয়েছিলাম! ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে একজন বলছিলেন যে, তার নাতি/নাতনি দেখবার শখ। তার বড় সন্তান টিন এজার। আমি দেখেছি, মানুষ মাথা ব্যথা হলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। পৃথিবীতে সব কিছুই আপেক্ষিক। আমি একবারো ভাবিনি, “কেন আমি”। আমি সব সময় আমার থেকে যাদের লড়াইটা বড়/কষ্টের তাদের কথা ভাবি। এটা আমার আশাবাদী মনোভাবের (পজিটিভ অ্যাটিচিউড) কারণগুলোর একটি।

মার্চ ২৫, ২০১২
যখনই ডকুমেন্টারি শো-এর আয়োজন করা হয় তখনই এক অবস্থা! আজ ছিল, “সেই রাতের কথা বলতে এসেছি” ও “মুক্তির গান”। এর সাথে ফ্রি ডিনার দিলে কি মানুষের সংখ্যা বাড়তো!? ‘৭১-এর পর জন্মানো সবার সব কিছু জানা হয়ে গেছে? আর আগে জন্মানোরা তাদের সন্তানদের জানিয়ে দিয়েছেন সব কিছু? দেশকে সবাই ভালবাসেন, সবাই তাই বলেন। দেশকে ভালবাসার মধ্যে কি মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, দেশের জন্মের ইতিহাস, লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের অসীম ত্যাগ পরে না?!

মার্চ ৩১, ২০১২

অসাধারণ এক সন্ধ্যা! ওস্তাদ জাকির হুসেইন আর মাস্টার্স অব পারকাশন লাইভ শো উপভোগ করলাম গতরাতে! সারাজীবন মনে রাখবার মত ঘটনা!

এপ্রিল ১০, ২০১২
ইকিরু” (বেঁচে থাকা)!!! মিস্টার আকিরা কুরোসাওয়া, আপনি একদম সঠিক ভাবে ধরেছেন!!

এপ্রিল ১৭, ২০১২
প্রায় সবারই একটি গল্প আছে! কোনো কোনো মানুষের একাধিক গল্প আছে! কারো কারো একই সময়ে একাধিক গল্প চলতে থাকে।
যে মানুষগুলোকে দেখে মনে হয় কোনো গল্প নেই, তারা এখনো বলেননি! আমি উপহার বলবো না, অভিশাপ (অভিশাপে বিশ্বাস করিনা) বলবো, আমি না বলা গল্পগুলো বুঝতে পারি! বেশির ভাগ সময় আমি নিজের গল্পগুলো ভুলে যাই!!

এপ্রিল ২৪, ২০১২
আমার আছে প্রতিরক্ষা কৌশল (ডিফেন্স মেকানিজম)। আমি প্রতিটা গল্প (অন্যের ও নিজের) আলাদা আলাদা বাক্সে রাখি! যখন একটি গল্প আমাকে বিহ্বল/সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলে, আমার মন ও হৃদয়কে অন্য একটি বাক্সে স্থানান্তরিত করি! আছে অগুণতি বাক্স!!!

“জীবন”
মে ১০, ২০১২
এক সহযোদ্ধার বর্তমান অবস্থার কথা জানলাম, ষষ্ঠতম কেমোথেরাপির পরও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। ভাবলাম যে তার জন্য কেমো আছে, এ’সময়ে তার হাত ধরবার ইচ্ছে হলো। যদিও সে বাংলাদেশে, তবুও হাতধরা যায় না কী! একজন অল্পবয়স্ক মা’এর আকুতির কথা পড়লাম তার নবজাতককে বাঁচানোর জন্য (প্রায় প্রতিদিনের মত, অনেক বারের মত)।

প্রায় ত্রিশ বৎসরের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে বললাম যে, যে বিষয়ে সে কিছুই করতে পারবে না তা নিয়ে দু:শ্চিন্তা না করতে। এমনকি তা যদি তাঁর নিজের জীবনের বিষয়েও হয়! শুধুমাত্র যে বিষয়ে সে কিছু করতে/করবার চেষ্টা করতে পারবে সেগুলোতেই মনোনিবেশ করতে বলেছি। তাঁকে খুব আশাবাদী হতে হবে (যদিও সে আশাবাদী মানুষই), তাঁর বারো বছরের সন্তানকে মানুষ করতে।

বারো বৎসরের সন্তানটির ফ্ল্যাশব্যাক হচ্ছে, তার মা’এর সার্জারির দিন, সার্জারির পর এগারো দিন হাসপাতালে থাকবার দিনগুলোর!
এবার সে জানে যে, তার মা ক্যান্সারের সাথে লড়ছে, দ্বিতীয়বারের মত! সে এটিও মনে করছে যে, তার বাবা বারো বৎসর বয়সে পিতৃহীন হয়েছিলেন। কিছুদিন আগে তার বড় চাচাকে হারানোর পরবর্তী দিনগুলো তার স্মৃতিতে ফিরে আসছে।

গ্যাবো টেবিলে পরে রয়েছে … কখন পড়া হবে … কুরুসাওয়া অপেক্ষা করছে … কখন দেখা হবে …… কত কিছু অপেক্ষায় আছে পড়বার/পুনরায় পড়বার/দেখবার/পুনরায় দেখবার/শোনবার/পুনরায় শোনবার জন্য ……………! এ’দিকে বারো বছরের একজনের গল্প তৈরি হচ্ছে/লেখা হচ্ছে (?!), যার নাম “জীবন”!!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.