সোভিয়েত নারীর দেশে-৩১

0

8সুপ্রীতি ধর: রীতিমতো উস্কানি পেয়েই লিখতে বসলাম। সোভিয়েত রাশিয়াতে ছিলাম আমি মোট সাড়ে নয় বছর। ১৮ বছর পূর্ণ করে পা দিয়েছিলাম বরফ-শীতল দেশটিতে, বেরিয়ে এসেছি এক কন্যার হাত ধরে, আরেক সন্তানকে পেটে করে। চলে আসার কোনোই কারণ ছিল না, স্রেফ ভাগ্যের ফেরে, আমার সেই থেকেই সব সর্বনাশের শুরুও বলা চলে, যার বীজ বোপন হচ্ছিল একটু একটু করে। নিজের কথা কাঁহাতক বলা যায়!

জীবনের সোনালীতম দিন যদি কোনকিছুকে বলা হয়, এসবই ছিল সোভিয়েত জীবনের সেইসময়টাতে। একটা দেশের ভাঙন, গড়ন, রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন, অর্থনৈতিক প্রভাব কোনকিছুই আমাদের অনুভূতির বাইরে ছিল না। আমরা পলে পলে তার তিক্ততা যেমন পাঠ করেছি, তেমনি সেখানকার সাধারণ মানুষের কাতারে মিশে গিয়ে ভাগাভাগিও করে নিয়েছি সব পরিবর্তন।

রুটি যখন মাথাপিছু বরাদ্দ হলো, আমার মেয়ে পেটে। স্বভাবতই খিদে আমার বেশি। রুটির জন্য লম্বা লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়ানো রুশরা তখন ঠিকই আমার জন্য তাদের সামনের জায়গাটি দিয়ে দিয়েছে বিনা বাক্যে, শুধু তাই নয়, পরিমাণে কম পেলে নিজেদের ভাগ থেকেও দিয়েছে। আমার ডাক্তাররা আমাকে দেখতে আসতেন এটা-সেটা হাতে নিয়ে, বেশিরভাগই দুর্লভ খাদ্য। বিনিময়ে কিছুই দিতে পারিনি হাসিটুকু ছাড়া। তারা বলতো, ওই টোলপড়া গালের হাসি দেখতেই নাকি চায় তারা। এও হয় কখনো?

7এতো এতো ঋণ দেশটার প্রতি, মেয়েটাকে আবার কোনদিন নিয়ে যেতে পারলে আমি মাথায় মাটি ঠেকিয়ে একবার প্রণাম জানিয়ে আসতাম।

ভৌগলিকভাবে রাশিয়া ইউরোপে হলেও বেশ রক্ষণশীল সমাজ ছিল। সমাজতান্ত্রিকতার পাঠ পরিবারগুলোতেও সমানভাবেই চর্চিত হতো। একটা শিশুর জন্ম থেকে বেড়ে উঠা, আচার-আচরণ, সামাজিকতা, নারীর প্রতি সম্মান, পরিবারের কাজে সাহায্য, সবই আপনা-আপনিই শেখানো হয়ে যেতো। পরিবারকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা তখনও সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করে চলছিল।  

আমরা বিদেশিরা প্রায় সবাই কোনো না কোনো রুশ বা অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের পরিবারের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম। আমি তো ছিলামই। যেখানেই যেতাম, আমার মা হতো, বোন হতো, কতো সম্পর্ক।

উস্কানির কথায় আসি। দিন কয়েক ধরে ফেসবুকে চলছে একটা ইভেন্ট নিয়ে গরম-নরম সমালোচনা। সম্প্রতি নাস্তিকতার খেতাব পেয়ে দুজন বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েই একটা ইভেন্ট খুলে ফেলেছেন আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য।

তাহলো, পুলিশি পাহারায় প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার ইভেন্ট। ব্যস, হয়ে গেল। একবারও ভাবলেন না কিছুদিন আগেও যে দেশটাতে তারা ছিলেন, সেই দেশটার পরিস্থিতি আসলে কী?

2এদের পেইজ ওপেনই থাকে গালিগালাজ শোনার জন্য। আর তাই হলো। কেউ কেউ আয়োজক নারীকে ধর্ষণের হুমকি দিল, আর অন্যান্য খারাপ গালিগালাজ তো আছেই। এতে একটা লাভ হয়েছে ওদের। থাকাটা পোক্ত হয়েছে। বলতে পারবে যে, দেশে গেলেই তাকে ধর্ষণ করা হবে, হেন তেন।

আমার বিষয়টা হলো, আমি জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণযুগটা কাটিয়ে এসেছি একটা ওপেন দেশে। সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো তখনও অনেক বেশি রক্ষণশীল হলেও রুশরা সেই তুলনায় অনেক লিবারেল। যেখানে শহরের মাঝেই নদীর পাড়ে সৈকত থাকে, যেখানে সবাই ন্যুড হয়ে শুয়ে থাকে। আমাদের বাঙালী ছেলেরা তা দেখতে যেতো চোখে ভারী কালো সানগ্লাস পরে। আমার কখনও দেখার রুচি হয়নি। কিন্তু দেখলে কী হতো? কেউ মেরে ফেলতো আমাকে?

সী- বিচগুলোতে তো অহরহই যেসব দৃশ্য চোখে পড়তো, আমাদের অনভ্যস্ত বাঙালী চোখে তা অস্বাভাবিকই ঠেকার কথা। কিন্তু কৈ, ঠেকেনি তো! উত্তর মেরুর শহর সেন্ট পিটার্সবুর্গে কালেভদ্রে সামার আসতো, ক্ষণস্থায়ী। সেই সামারেও মিনি স্কার্ট বা শর্টস পরে এই আমি নিজেও ঘুরে বেড়িয়েছি। কই, কখনো তো মনে হয়নি আমার বন্ধুটিকে লোক দেখানোর জন্য চুমু দেই। চুমু জিনিসটাই ভালবাসার প্রকাশ, কখন, কিভাবে দেবো, সবটাই নির্ভর করছে পারিপার্শ্বিকতার ওপর। আমাদের বাঙালী ছেলেদের অধিকাংশরই রুশি মেয়ে বন্ধু ছিল, কই তারাও তো আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে চুমু খায়নি কখনও।

আমাদের মধ্যে অনেকেই বিয়ে না করেও বাবা-মা হয়েছে, পরে সময়মতো একটা কাগজের জন্যই বিয়েটা সেরে নিয়েছে, তাদেরও সমস্যা হয়নি জীবনটা চালিয়ে নিতে। আসলে মনের উদারতা বলে একটা বিষয় আছে, সেটা মনের মধ্যে না থাকলে উপর দিয়ে তুমি যতোই লোকদেখানো ইভেন্ট করো না কেন, এতে হিতে-বিপরীতই হবে।

রাশিয়ার পথে-ঘাটে, মেট্রো-বাসে অহরহই ছেলেমেয়েদের চুমু খেতে দেখেছি। বয়সটা কম ছিল, আফসোস যে হয়নি বলবো না। হয়েছে। মনকে প্রবোধ দিয়েছি এই বলে যে, ‘সময়টা খারাপ যাচ্ছে রে কানাই’।

পার্থদা তো বলেই বসতো, আহ্, কী খরা কী খরা, জীবনে! আমরা হো হো করে হাসতাম।

আমার রুমমেটরা প্রায়ই রাতে রুমে ফিরতো না। জানতে বাকি থাকতো না, কোথায় যায় তারা, তা নিয়ে বাঙালী মনে উসখুস থাকতোই। তাতে কী আমার ভিতরে কোনো পরিবর্তন হয়েছিল? নাকি পরিবর্তন হয়নি বলে খারাপ হয়েছে? কোনটা?

6আমি তো সাধুবাদ জানাই আমার বুলগেরিয়ান রুমমেটকে, যে একদিন গুনে গুনে তার চৌদ্দজন বন্ধুর নাম বললো, যাদের সাথে সে ভালো বাংলায় বলতে গেলে, ‘শুয়েছে’। সাধুবাদ এ কারণেই যে, আজকের এই নষ্ট বাংলার নষ্ট সংস্কৃতিতে পরকীয়ার নামে যা চলছে, প্রতিদিন ঢাকার ক্লাবগুলোতে মেকআপের আভরণে যে বেলেল্লাপনা চলে আজকাল, সেদিক থেকে ওর সততা আমাকে শতগুণে মুগ্ধ করেছিল সেই ২৭ বছর আগেই। ও কাউকে প্রতারণা করেনি। যাকে ভাল লেগেছে, তার সাথেই শুয়েছে। পরদিন হয়তো মনে হয়েছে, ওই লোক তার কাপ অব টি নয়, ব্যস, সরে এসেছে। আমি ওর কাছ থেকেই শিখেছিলাম, সেক্স হচ্ছে একটা আর্ট, একে একটু একটু করে ওপেন করতে হয়, তাহলেই সে তার পূর্ণরূপ নিয়ে ধরা দেয়। আর আমরা বাঙালীরা কী করি? পাগলা কুকুরের মতোন লাফিয়ে পড়ে মিনিটেই অর্গাজম উগড়ে দিয়ে সেক্স সেরে ফেলি। অধিকাংশ পুরুষ তো মেয়েদের কথাটা মাথায়ই রাখে না। তাদের দণ্ড ছোট না বড়, তাদের স্থায়িত্বকাল কম না বেশি, এসব কিছুই না ভেবে ব্যস সেরে ফেলে তাদের কাজটা। আর মেয়েটাও এর পরিবর্তে হাতিয়ে নেয় তার আহ্লাদিত আবদারসমূত। মিডিয়া জগতে আজ এই কালচার বড়বেশি বিরাজমান। মুক্তি নেই আমাদের।

আমাদের এই সময়ে যেসব রংচংমাখা নারীদের পার্টিসাজে, মদের আসরে পুরুষদের বগলদাবা হয়ে বিগলিত হতে দেখি, তার চেয়ে আমার ওই রুমমেটের সততার মূল্য অপরিসীম।

এখন কথা হলো, দুদিন ধরে বিদেশ গিয়েই কেউ যদি বিদেশি কোনো একটা আচরণকে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে আমাদের এই পশ্চাতপদ দেশে, যেখানে মেয়েরা নিচের কাপড় খুলে রেখে ওপরে মাথায় একগাদা কাপড় জড়িয়ে হিজাব করে, যেখানে পরমতধর্মসহিষ্ণুতা শব্দটা আজ বিলীয়মান, সেখানে তা হিতে-বিপরীত হতে বাধ্য।

সমাজ এখন বহুধা ভাগে বিভক্ত। স্পষ্টই চোখে পড়ে এই বিভাজন। একাত্তরের পরে যারা ধনী হয়েছে, ৭৫ এর পরে যারা ধনী হয়েছে, আর যারা ধনী হয়েছে এরশাদ-খালেদা জিয়ার আমলে এবং এখন হচ্ছে বর্তমান সরকারের আমলে, তারা একটা বেশ নিচ্ছে ঠিকই। কিন্তু এটা যে তাদের আসলি বেশ নয়, তাও ষ্পষ্ট ধরা পড়ে কথায়-আচরণে। এরকম একটা ইভেন্ট এই মূহূর্তে এসবকেই জাগিয়ে দেয়।

সমাজে অনেক বৈষম্য। প্রতিদিন পাহাড়ে মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, উচ্ছেদ হচ্ছে আদিবাসীরা, সংখ্যালঘুরা যারা সাতচল্লিশ বা পঁয়ষট্টি বা একাত্তরেও নিজের বাংলাকে ছাড়েনি, তারাও আজ ফোকর খুঁজছে পালিয়ে যাবার।

পারিবারিক ঐতিহ্য, ঔদার্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ আসলে সবাই নিতে পারে না। এমনকি পরিবারের সব সদস্যও এক হয় না। মা-বাবার আদর্শকে কয়জন সন্তান ধারণ করতে পারে? আমরা এখন তেমনই একটা অলঙ্ঘণীয় সময় পার করছি অনবরত।ধুপ করে একটা কিছু চাপিয়ে দিলাম আর লোকজন অবলীলায় তা মেনে নিয়ে চলতে থাকবে, তা ভাবার সময় এখনও আসেনি। আর যারা এটা করতে চাইছে, তাদের বালসুলভ চপলতা আর অদূরদর্শিতাই প্রমাণ করে এর সমালোচনার কারণ। (চলবে)  

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.