মেঘবতীর নীল প্রাপ্তি  

1

Kakoli Das 2কাকলি দাস: মেঘবতী যুবরাজের হাতটা ধরার আগে দ্বিধা নিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল, নিজের সাথে বোঝাপড়া করার চেষ্টা করল। সে বুঝতে পারলো এই হাতটা ধরলে পুরো পৃথিবী তাকে ত্যাগ করবে, মুখ ঘুরিয়ে নেবে তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলো, যারা এতোদিন তাকে পরম ভালবাসায় নিষ্ঠুর পৃথিবীর আঁচ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলো।

মেঘবতী নিজের উপর ভীষন বিরক্ত হয়ে দুই পা পিছিয়ে এলো, ভাবলো – এ আমি কি করতে যাচ্ছি? দুইদিনের ভালবাসার কাছে ত্রিশ বছরের ভালবাসায় আষ্টেপৃষ্টে বাধা পৃথিবীটাকেই তুচ্ছ করছি? আরো দুই পা পিছিয়ে এসে যুবরাজকে সে বলল, `আমাকে ক্ষমা কর, আমি পারব না’। না, সে ক্ষমা পায়নি।

সেটা যুবরাজের চোখের জলের কারণে, না তার নিজের যন্ত্রণার কাছে হার মানার কারণে, তা আর মনে নেই। সে পুরো পৃথিবীকে উপেক্ষা করে যুবরাজের বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরেছিল। তাইতো তাকে ঘিরে থাকার ভালবাসার নিরাপত্তা বলয়টাও সরে গিয়েছিলো সাথে সাথেই।   

যুবরাজের সাথে প্রথম যেদিন সে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে, সেদিন তার জন্য কোন বাদ্য বেজে উঠেনি, কেউ বরণডালা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকেনি, নতুন বধুর মুখ দেখার জন্য কোন উৎসুক মুখও সেদিন উঁকি দেয়নি রাজপ্রাসাদে।

শুধুমাত্র একটা মায়ের গন্ধমাখা হাত তার মাথায় পড়েছিল, সে শুনতে পেয়েছিল ভরসার বাণী। তারপরেও মেঘবতী বুঝতে পারছিলো, তার এ জীবন মোটেই সহজ হবে না এবং তার জন্য অপেক্ষা করছে হাজারো পরীক্ষা।

এরপর টানাপোড়োনে কেটে গেছে সাড়ে তিনটি বছর। একদিন মেঘবতী তার মাঝে একটি ছোট্ট প্রাণের ছোঁয়া টের পেল। এটা তার আর যুবরাজের যৌথ পরিকল্পনা হলেও এর পরের ঘটনাগুলো তাদের কল্পনাতেও ছিলো না।   কিছুদিনের মধ্যেই মেঘবতী গর্ভকালীন উপসর্গে ভীষণ নাজুক হয়ে পড়লো।

একে তো সারাদিনভর অস্বস্তি আর খারাপ লাগা, তার উপর কতোদিন মায়ের মুখটা দেখে না – এটা ভাবলেই দিশাহারা হয়ে যায়। অল্পকিছু দিনের মধ্যেই তার অবস্থা আরো নাজুক হয়ে গেল। সে বিছানা থেকে উঠে বসার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলল।

যুবরাজ প্রথমদিকে মেঘবতীর সীমাহীন সীমাবদ্ধতায় বিরক্ত হতো, সেই বিরক্তি কখনো কখনো চরম আকারও ধারণ করেছে। কিন্তু সেটা প্রথম দেড় মাসেরই কথা, তারপর কোন এক যাদুর কাঠির স্পর্শে, না তার উত্তরাধিকারের মঙ্গল চিন্তায়, ঠিক বুঝতে পারেনি মেঘবতী কখন, তবে যুবরাজকে সে পাল্টে যেতে দেখল।

যুবরাজ যথা সম্ভব চেষ্টা করতে লাগল মেঘবতী আর তাদের অনাগত সন্তানকে সাহায্য করার। আর সেই মায়ের গন্ধমাখা হাত?? সে তো কবেই সরে গেছে, সেই হাতে উঠে এসেছে একটি আতসী কাঁচ, যা দিয়ে মেঘবতীর সীমাবদ্ধতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিদিন মেঘবতীকে কয়েকবার বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

অন্য আরেকজন সন্তানসম্ভবা রাজবধুর খোঁজখবর নিতে রাজমাতা সব সময়ই ব্যস্ত সময় কাটান। প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি সেই রাজবঁধুকে ভালবাসা ভরে জিজ্ঞেস করেন, `আজ তুমি কি খাবে মা, তোমার জন্য কি রান্না করবো?`

এবং এই প্রশ্ন করার জন্য তিনি মেঘবতীর কামরায় সামনের জায়গাকেই বেছে নিতেন, হয়তো তিনি মেঘবতীর শ্রবণশক্তির পরীক্ষা নিতেন। মেঘবতীর শ্রবণশক্তি সচল ছিলো এবং সে সবকিছুই শুনতে পেত। তাইতো এই একই রাজমাতাসহ রাজপরিবারের অন্যসব সদস্য কেন মেঘবতীর পাশের কামরাতে থেকেও মাসের পর মাস তার কামরায় উঁকি পর্যন্ত দিতো না – তা ভেবে অবুঝ মেঘবতি কষ্ট পেত।

তারা মেঘবতী আর যুবরাজের প্রিয় খাবার কিনে এনে মহাসমারোহে শুধুমাত্র দুইজনকে বাদ দিয়ে খাবারের আয়োজন করতো – তা দেখে অবশ্য মেঘবতী কষ্টের হাসি হাসতো, কারণ, তখন পৃথিবীর যাবতীয় খাবারেই যে তার বড় অরুচি, সে প্রিয়-অপ্রিয় যাই হোক না কেন।

তারপরও শুধুমাত্র একটা ছোট্ট বালিকার উপরই মেঘবতীর খেতে পাওয়া বা না খেতে পাওয়া নির্ভর করতো। এই ছোট্ট বালিকাই শুধু মেঘবতীর কামরায় খাবার নিয়ে আসত। আর চঞ্চলমতি এই বালিকা খাবার দিতে ভুলে গেলে মেঘবতী আর তার অনাগত সন্তান ক্ষুধায় কষ্ট পেত, আর তারা কাজ থেকে যুবরাজের ফিরে আসার অপেক্ষা করতো।  

সেইসব দিনগুলোতে মেঘবতীর কান্নার সঙ্গী হতো তার অনাগত সন্তান নীলকুমার। মেঘবতী ঠিক শুনতে পেত নীলকুমার তাকে বলছে, `মা তুমি আর কেঁদোনা, একটুও দুশ্চিন্তা করো না, আমি ভালো আছি। এইতো আর কয়েকটা দিন পরেই আমিও দিদার মতো তোমাকে সব দুঃখ-কষ্ট থেকে আগলে রাখব। পৃথিবীর কোন অমঙ্গলই তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না, তুমি দেখে নিও।`

আজ মেঘবতী অবাক হয়ে দেখে, সত্যি এই ছোট্ট দুটি হাতের কী বিশাল শক্তি, তাকে জড়িয়ে রাখে পরম ভালবাসায় – যার কাছে হার মানে পৃথিবীর সমস্ত অমঙ্গল আর কষ্ট। মেঘবতী রাজপ্রাসাদ ছেড়েছে আজ অনেকদিন হলো। আড়াই মাসের নীলকুমারকে নিয়ে যখন সে পা বাড়িয়েছিল পথে, তখন দ্বিধান্বিত মন নিয়ে যুবরাজও তার সঙ্গী হয়েছিল। প্রাথমিক গুমোট সম্পর্ক কাটিয়ে এখন যুবরাজ আর মেঘবতী নীলকুমারকে সাথে নিয়ে মাঝে মধ্যে রাজপ্রাসাদে বেড়াতে যায়, তাদের ছোট্টঘরে রাজপরিবারের সবাইও মাঝে মধ্যে আসেন।

তবে মেঘবতী এখনও পর্যন্ত রাজপ্রাসাদের আতিথেয়তা পাবার মত পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও সে তার ছোট্টঘরে হাসিমুখে রাজপরিবারের সবাইকে স্বাগত জানায়। নিজের আন্তরিকতার সবটুকু দিয়ে তাদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করে। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় সেই কষ্ট আর ক্ষুধার দিনগুলোর কথা, অজান্তেই ঝাপসা হয়ে আসে পৃথিবী।

আরো মনে পড়ে যায় ভালবাসায় মাখা কতগুলো মুখের কথা –যুবরাজের হাত ধরার পর যারা তাকে ছেড়ে গিয়েছিল। এই মুখগুলোর কথা মনে হলেই বুকে ব্যথার ঢেউগুলো আছড়ে পড়তে থাকে। মেঘবতী আঙ্গুল গুনে গুনে বের করে আজ কতো বছর সেই মুখগুলো দেখেনা – ঠিক আট বছর।  

না মেঘবতী আর কষ্টের কথা বলতে চায়না। তার সাথে আছে নীলকুমার – তার বেদনাভরা দিনগুলোতে একমাত্র আনন্দ, তার সব কষ্টের মধ্যে একমাত্র বিশ্বাসের জায়গা। যে হাসলেই মেঘবতীর পুরো পৃথিবী হেসে ওঠে, পাখিরা গান গেয়ে ওঠে। এতো বড় যে প্রাপ্তি, তা কি কখনোও সহজ হতে পারে?? কক্ষনো না, তাইতো মেঘবতীও ক্ষমা করে দেয় সেই মানুষগুলোকে।

নিজেকে ভীষণ নির্ভার লাগে, নীলকুমারের হাত ধরে সে সামনের দিকে তাকায়, তাকিয়েই থাকে। মেঘবতীর কথা লিখতে গিয়ে কেন এতোবার মনিটরের চেহারা ঝাপসা হয়ে গেল? কেন এই মেয়েটার সাথে আমার এতো মিল?

 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.