গল্পগুলো সাধারণ-৩ (শেষ)

2

kakoliকাকলী তালুকদার: বাসে উঠে মানিব্যাগে হাত দিয়ে বাস পাস বের করতে গিয়ে মনে হলও মানি ব্যাগটা আমার না! কি করবো? আবার বাসায় গেলে বাস তো এতোক্ষণ দাঁড়াবে না, তারপর গতি তো এখন কচ্ছপের হয়ে গেছে, ইচ্ছে করলেই আগের মতো দৌড়ে আর স্কুলের প্রথম পুরস্কারটা নিতে পারবো না। সমাজ জন্ম থেকে মেয়েদেরকে অনেক ওজন দিয়ে দেয়, সেটা দিন দিন বাড়তে থাকে, সাথে প্রাকৃতিক দায়িত্বগুলোও মেয়েদের! তবে সমাজের আরোপিত পাথর গুলো ভয়ানক, সেগুলো নিয়ে আগানো খুব কষ্ট তার জন্যই মেয়েরা এখনো অনেক পিছনে।

বাস 71 তাই ড্রাইভারের কাছে আমার দাবি যথার্থ। সে আমার দিকে চেয়ে বুঝলো কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। বললাম, আমি আমার মানিব্যাগ রেখে আমার হাজবেন্ড এর মানিব্যাগ নিয়ে চলে আসছি। সে আমাকে বলল তোমার কতক্ষন লাগবে মানিব্যাগ আনতে?

আমি বললাম আমি যাচ্ছি যদি দেখো দুই মিনিটে না ফিরছি তুমি চলে যেও। দুই মিনিট বলেও অস্বস্থি লাগছিলো বাসে আরও অনেক যাত্রী তারা তো বিরক্ত হবে এই ভেবে। বাস থেকে নেমে দিলাম দৌড়, পেটে তখন 6 মাসের বাচ্চা। হাপাতে হাপাতে বাসায় গেলাম, বিজয় গতরাতে বাসায় এসেছে, সকালে ঘুমাচ্ছে দেখে আমি আর ডাকি নি। আট ঘন্টা ডিউটি করে 5 ঘন্টা আবার ড্রাইভ করে বাসায় এসেছে। আমাকে হাপাতে দেখে বললো কি হয়েছে? বিস্তারিত জেনে বললো আমি ড্রপ করে দিবো এখন আর বাসে যেতে হবে না। নিশ্চিত হলাম কিন্তু বাস ড্রাইভারের জন্য চিন্তা হতে লাগলো সে কতক্ষণ দাঁড়াবে? যাত্রীরা বিরক্ত হয়নি তো? বিজয় আমাকে ম্যাকনাইট স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসলো, স্টাফ বাসে উঠতে গিয়ে দেখলাম 71 এর ড্রাইভার কাকে যেন খুঁজছে, বুঝতে পেরে আমার হাত নাড়তে থাকলাম আমাকে দেখে সে আশ্বস্থ হলো বুঝলাম। বুঝলাম দায়িত্বশীল মানুষ জন এমনি হয়।
কাজের শিফট পরিবর্তন করে এখন ক্লোজিং নিয়েছি।বিকেল থেকে কাজে যাই, নতুন ম্যানেজার ইয়াং এবং স্টুপিড। সে আমাকে বললো তোমার তো এখন কষ্ট হয় ছুটিতে চলে যাও, আমি ওর মুখের উপর উত্তর দেই সব সময় তাই আমাকে চেষ্টা করেও পছন্দ করতে পারে না। বাকিরা সেটা করতে পারে না, বাকি স্টাফরা আমাকে বললো, আমরা এই ম্যানেজার চাই না, তুমি লিখো অফিসের কাছে, আমরা সবাই সাইন করবো । প্রথম দিকে ভাবলাম লিখি, পরে মনে হলো অনুর সাথে একটু কথা বলে নেই, এই মেয়েটির উপর আমি নির্ভর করি যার হাসি দেখলেই মন ভালো লাগে সেই সাথে সে বিবেচক।

Kakoli 2অনুর সাথে কথা বলতে গিয়ে জানলাম হেড অফিস থেকে প্রমোশন দিচ্ছে, আমাকে সুপারভাইজার হিসেবে নিতে চাচ্ছিল কিন্তু আমি এক মাস পর থেকেই ছুটিতে চলে যাবো। অনুও স্টাডি শুরু করবে তাই পার্ট টাইম কাজ করবে সে। আর নতুন ম্যানেজারের বিরুদ্ধে না লিখতে বলল সে, আমিও ভাবলাম অফিসের সাথে ম্যানেজার এর আচরণ নিয়ে কথা হয়েছে, লিখিত আর দিবো না। আরেকজন ম্যানেজার যদি ওর চেয়েও খারাপ হয় তখন কি হবে? এই ভেবে নিজেকে ক্ষান্ত করলাম, অনুরও তাই মতামত।
কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত 11 টা বেজে যায়। মেয়েকে নিয়ে ফেরার সময় ঠাণ্ডা মধ্যে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকি, মেয়ে বলে মা ঠাণ্ডার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে না, আরো অনেক প্রশ্ন করতে থাকে আমাকে, উত্তর দিয়ে, অন্য গল্প করে ভুলিয়ে রাখি যেন আর ঠাণ্ডার কথা না বলে।

রাতের বাসটা মাঝে মাঝেই দেরি করে আসে। বিজয় বাসায় থাকলে ওই মেয়েকে নিয়ে আসে।সেদিন আমার কষ্ট কম হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি ছুটিতে চলে যেতে পারবো, এর পরেই বারহেড চলে যাব বিজয়ের ওখানে। এর মধ্যে আমার শাশুড়ি মায়ের জন্য বিজয় এপ্লাই করেছে। মনে মনে ভাবলাম, উনি এলে ভালই হবে, তবে না আসার সম্ভবনার কথাও বিজয় বলে রাখলো আমাকে। তবুও মনে একটু আশা নিয়ে আমি আমার কাজ করতে থাকলাম।

রিয়ান এই মাসে ডে কেয়ারে চলে গেছে, বিজয় এখন তার জন্য রান্না করে দিতে না করে। একটু একটু ছুটি মিলছে, শরীর ভারী হচ্ছে, ভিতরে আরেকজন এখন বেশ নড়া চড়া করেন যখন-তখন। শরীরের ভিতর শরীর কি এক অদ্ভুত অনুভূতি! সেপ্টেম্বর মাসটা কেটে গেলো নিজের কাজ, গোছানো, আর সাধের নিমন্ত্রণ খেয়ে। আলপনাদি, দীপ্তি বৌদি, বৈশাখী বৌদি,শম্পা বৌদি আর পূরবী দির বাসায় আমাকে সাধ দেয়া হলো। সবাই এত যত্ন করে আমাকে খাওয়াল সেই সাথে সবার বাসায় আরও অনেককেই নিমন্ত্রণ করা হতো।

সবার আয়োজন দেখে আমি কষ্ট ভুলে যেতাম, আপ্লুত হয়ে যেতাম। এখানে আপন বলতে এই মানুষ গুলোই। বৈশাখী বৌদির বাসায় মাসিমা(বৌদির মা) যখন আমাকে আশীর্বাদ করছিলেন আমি বোকার মতো কাঁদতে থাকলাম উনাকে জড়িয়ে ধরে। মা কে মন পড়ছিল খুব ,সাথে কাছের মানুষ গুলোর মুখ। সেপ্টেম্বরের 24 তারিখ শরীর টা খারাপ লাগছিলো নতুন ম্যানেজার কে ফোন করে বললাম আমি আর আসতে পারবো না, ভেবেছিলাম মাসটা শেষ করব কিন্তু আর পারছিলাম না, শরীর বেশী ক্লান্ত।
অক্টোবরের 2 তারিখ চলে আসলাম বারহেড, বিজয় বাসা নিয়েছে আমাদের জন্য। এতদিন বেইজমেন্টে ছিলাম, এখানে আপস্টিয়ারে বাসা নিয়েছে, অপরিচিত জায়গা, আমরা ছাড়া বাঙালি নেই। ছোট্ট শহর, ছিমছাম পাঁচ হাজার লোকজনের বাস। প্রথম কয়েকদিন খারাপ লাগলো সবার জন্য, অন্তত আগের শহর টাতে কোলাহল ছিল এখানে তা নেই। সেটা বুঝেই বিজয় অনেক বড় একটা কাঁচের জানালা আছে, যা দিয়ে বাহিরের আকাশ, রাস্তার গাড়ি, কয়েকটি গাছ আর সূর্যাস্ত দেখা যায় সেই বাসাটা নিলো। ওই জানালাটাকে আমার মনে হতো জীবন্ত টিভি স্ক্রিন।
হঠাৎ করে বেকার হয়ে গেলাম, নতুন বাসা গোছালাম একটু একটু করে। বাসার রেগুলার কাজ, মেয়ে আর ল্যাপটপের সাথে সময় কাটতে থাকলো। বিজয় জব আর নিজের স্টাডি নিয়ে ব্যস্ত, মাঝে মাঝে আমাদের নিয়ে আসে পাশের জায়গা গুলোতে বেড়াতে নিয়ে যায়, ঠান্ডার জন্য গাড়িতেই বসে দেখি সব। বাসায় বসে থাকবো, ড্রাইভিং এর জন্য পড়তে থাকলাম। শিখার ব্যাপারে বিজয় সব সময় উৎসাহিত করে সেটা যে কোনো বিষয়ে। রাতে ঘুমাতে পারি না বেশী, ওয়াশরুমে যেতে হয় ঘন ঘন, এপাশ থেকে ওপাশ করতে অনেক সময় লাগে। নভেম্বর 20 তারিখ, মেয়েটার জন্মদিন 3 বছর পূর্ণ হবে। শরীরটাও অনেক নরম হয়ে আসছে দিন দিন, ক্লান্তি পায়ে জড়িয়ে রাখে সারাক্ষন। সকালে ড্রাইভিং লার্নার টেস্ট দিতে যাবো,গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না বিজয় বলল।

ঠাণ্ডায় জমে গেছে কয়েকবার চেষ্টা করলো গাড়ি স্টার্ট নিলো না। মনে মনে জেদ বেড়ে গেলো, ভাবলাম আমি যাব ই, আমার খুব চাওয়া গুলো সব সময় এমন বৈরিতার মধ্যে পরে। সিদ্ধান্ত নিলাম হেঁটেই যাব। বাহিরে মাইনাস 24, হাঁটু পর্যন্ত স্নো তবুও যাবো। বের হবার সময় বিজয় তার স্নো বুট আর হেভি জ্যাকেট টা দিয়ে বলল এইগুলো তে একটু কষ্ট কম হবে। আমি বললাম, পেট তো এমনেই ভারী আর এই গুলো মিলে তো আশি কেজির উপরে হয়ে যাচ্ছি, হাঁটবো কি করে? চাঁদে যাওয়ার মতো করে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়লাম। হাঁটছি স্নো র উপর দিয়ে পা আমাকে পিছনে টানে, জেদ বেড়ে যায় আমার সামনে যাওয়ার জন্য।

সাত আট মিনিট হাঁটার পর সামনে যা দেখলাম তাতে আমার আত্মারাম উড়ে গেলো। দাঁড়িয়ে গেলাম, নড়ছি না, মোকাবিলা করতে হবে সিদ্ধান্ত নিলাম। সে ঘেউ ঘেউ করতে করতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো, আমি বলতে থাকলাম হ্যালো? হাউ আর ইউ? উনি বাংলা বুঝবেন না, সেটা বুঝতে পারলাম শহরে একটা বাঙালি থাকলে না একটু জানতো এই ভাষা! মোটামুটি রয়েল বেঙ্গলের কাছাকাছি সমান একটা সাদা কুকুর। ভাবলাম যা, আজ সব সোনায় সোহাগা, আজ আর আমাকে ফিরায় কে? কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে গলার স্বর নিচু করে চলে গেল। আমার আত্মারাম খাঁচায় ফিরলো। পনের মিনিটের হাঁটার রাস্তা, আমি 35 মিনিটে গেলাম। হাজার ভাবনা মনের মধ্যে চলছে। পরীক্ষা দিলাম, শেষের উত্তরটা ভুল হলেই ধরা খাবো, আবার সময় নিলাম উত্তরটা দিতে, শেষ পর্যন্ত ফুল মার্কস পেলাম, মানে পাস। বিজয় কল করলো, গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে, হেঁটে আসতে হবে না। আমি বললাম আমার বাকি কাগজ গুলো নিয়ে এস, লার্নার লাইসেন্সের কাজটা শেষ করে যাই। এখানে কাজ শেষ করে রেস্টুরেন্টে খেয়ে মেয়ের জন্য একটা কেক বেলুন কিনে বাসায় ফিরলাম। ক্লান্ত লাগছে কিন্তু মেয়েটার কথা ভেবে একটা শাড়ি পড়লাম, মেয়েটাকে রেডি করে তিন জন মিলে কেক কেটে জন্মদিন সারলাম।

ডাক্তার বললো 16 ডিসেম্বর ডেলিভারি তারিখ, পছন্দ হলো তারিখটা। কেমন যেন বিজয় বিজয় গন্ধ, 71 বাস নাম্বার, 16 ডিসেম্বর ডেলিভারি তারিখ। কিন্তু নভেম্বরে শেষ সপ্তাহে টের পাচ্ছি, সময় খুব কাছাকাছি। কদিন থেকে কালো মিষ্টি খেতে তীব্র ইচ্ছে করছে, আর প্রেগনেন্সির সময় এই ইচ্ছে গুলো এমন তীব্র হয় যে মনে হয় এক্ষুনি খেতে হবে নয় তো মরে যাবো।

বললাম বিজয় কে, সে বললো এখানে ত মিষ্টি পাওয়া যায় না। মনে মনে মিষ্টি খেতে চেষ্টা করলাম, মজা পাই না, বুঝলাম জিহবা আমার বস্তুবাদে বিশ্বাসী। বিজয় আমাকে জিজ্ঞাসা করলো মিষ্টি কেমনে বানায়?

আমি বলে দিলাম, সে মিষ্টি বানাতে গেলো আমি দাঁড়িয়ে দেখছি সেই দৃশ্য। যেভাবে বললাম সে একটু চেষ্টা করলো প্রথম পরে যা করলো তার নিজের মনের মতো। আমি বললাম আমিতো কালো মিষ্টি খেতে চাই, এবার সে কালো বানানোর জন্য ছানাতে হলুদ দিয়ে দিলো! আমার হাসি দেখলে সে রাগ করতে পারে কষ্টে সেই হাসি লুকানোর চেষ্টা করলাম। সেই মিষ্টি আমরা কেউ খেতে পারি নি শেষ পর্যন্ত, মানে মুখে দেয়া যায় না এমন স্বাদ।

বিজয় বললো, কানাডা থেকে মাকে আসার পারমিশন দেয়নি। ছোট আশাটুকুও ছেড়ে দিলাম। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খুব স্নো শুরু হলো, ঘর থেকে খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হচ্ছে না। আমার শরীরও দ্রুত খারাপ হচ্ছে। সপ্তাহ টা যাবে না মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের 5 তারিখ দেখলাম এক টুকরা রক্ত, মন শক্ত করতে থাকলাম,কঠিন যুদ্ধের জন্য।

এরই মধ্যে তরকারি বিভিন্ন রকম রান্না করে ডীপ ফ্রীজে একটু একটু করে জমাতে থাকলাম দুর্দিনের জন্য। মাগুর মাছ রান্না করে বিজয়কে বললাম এটা হাসপাতালে আমার জন্য নিয়ে যেও। ছোট মাছ খেলে আমার বাচ্চা অনেক দুধ পায়। ছোট মাছ এর তরকারি গুলো আলাদা করে রাখলাম। বড়টার সময় তো এত সব চিন্তা করতে হয় নি, এখন করতে হচ্ছে। 5 তারিখ থেকেই কোমরে ব্যথা করছে একটু একটু আর অস্বস্তি। এর মাঝেই সব কাজ করছি, নতুন বেবির কাপড় গুলো ধুয়ে তার প্রয়োজনীয় সব কিছু আর আমার কয়েকটা জিনিষ নিয়ে একটা ব্যাগ রেডি করলাম। 6 তারিখ আর একটু বেশি ব্যথা থেমে থেমে।

মাকে প্রতিদিন ফোন করি, জিজ্ঞেস করি আমরা যখন জন্মেছি তোমার কি কি কষ্ট হতো একটু বলো। মা বলতো, আমি প্রতিটা অনুভূতির কথা জানতে চাইলাম, মাকে অনুভব করার জন্য, নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য যেন ভয় না পাই। বিজয় বললো ব্যাথা অনেক না হলে হাসপাতালে রাখবে না। তাই বাসায় অপেক্ষা করছি, রক্ত মাঝে মাঝেই যাচ্ছে।ব্যথা থেকে থেকে হারিয়ে যায় ভিতরে আমার উৎকণ্ঠা। মার সাথে কথা বলি ঘন ঘন , বলি আমি যখন জন্মাই তুমি কি কি করেছ বল আমাকে।

7 তারিখ, ব্যথা আর কোমরে অস্বস্তি নিয়েই দিন চলছে, রাতে ব্যাথা বাড়ছে ঘুম নেই চোখে। হাতে ফোন আর ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছি, বিজয় কে বললাম তুমি মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল অনেক ঝক্কি যাবে তোমার। রাত বাড়ে ব্যাথা বাড়ে যখন ব্যাথা বাড়ে বিছানায় আঁকড়ে ধরি। হঠাৎ মনে হল ঘরে ভাত রান্না করা নেই, কাল হাসপাতালে থাকবো। উঠে রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে দিলাম। মার কাছে একটু পর পর ফোন করছি, মা টের পাচ্ছে আমি খামচে ধরছি মিনিটে আটবার।

মা বলে হাসপাতালে যা, বললাম যাবো একটু পরেই। আট তারিখ সকাল 6টা, আস্তে করে বিজয় কে ডাকলাম উঠো, হাসপাতালে যেতে হবে। 7 তায় হাসপাতাল গেলাম, ডাক্তার দেখলো বললো দেরি হবে। রবি বার ডাক্তার চলে গেলো চার্চে। গলা শুকিয়ে আসছিল বারবার, মেয়েটা আমাকে জল এগিয়ে দিচ্ছিল বারবার। মেয়েকে কোথাও রাখতে পারলাম না, পরে অবশ্য একজন নার্স এসে নিয়ে গেছিল। বিজয় বার বার হাঁটতে বলছে আমাকে, হাঁটি কিন্তু পায়ে জোর পাই না, থেকে থেকে মায়ের মুখ ভেসে আসছে, মায়ের যন্ত্রনা ভরা মুখ যা আমি জন্মের সময় দেখিনি এখন অনুভব করছি।

পারছি না টানতে নিজেকে, এলানো আমার নার্স, দেবদূত , আমাকে কোমল গলায় কি সব বলছে, কিছুটা শুনি কিছুটা শুনতে পাই না। ব্যথা, ঘামছি, খামচে ধরছি যাই সামনে পাই সেটা। হাই কমোডে বসলাম গিয়ে, উঠতে পারছি না, এলানো বলছে বড় করে শ্বাস নিতে মাঝে মাঝে পারছি, মাঝে মাঝে যন্ত্রনা বেরুচ্ছে শ্বাসের বদলে।

আমি চেষ্টা করেও উঠতে পারি না, কথা বলতে পারছি না, শক্তি নেই, শরীর যুদ্ধের ময়দানে,চোখে ঘুম রাজ্যের, পারছিনা আর। ইশারায় এলানো কে বললাম কেটে ফেল, সিজার করে ফেলো, আমি পারবো না। সে কোমল ভাবে বুঝাতে লাগলো আর একটু ধৈর্য ধরো, তুমি পারবে। বুঝলাম কেউ এখন আমার কথা শুনবে না, বুঝবে না। মাথা মুছে দিচ্ছে ভিজা তোয়াল দিয়ে বারবার ঘাম বেরুচ্ছে, বাহিরে মাইনাস 22 তবে এত ঘাম কেন? সন্তান কি তবে এত কষ্টের ফসল? কেন তবে মেয়েদের এত অপমান? এত কষ্ট? মা তোমার মুখ ভেসে আসছে, না জেনে কত কষ্ট তোমাকে দিয়েছি, ক্ষমা করো।

দুই আঙ্গুল কে কাঁচি বানিয়ে দেখাচ্ছি এলানোকে, পেট কেটে ফেলো আমার। সে আমার কথা শোনে না। হঠাৎ ভিতর থেকে চিৎকার বেরিয়ে এলো, মনে হলো আকাশটা ফেটে গেলো আমার চিৎকারে। বিজয় আর এলানো আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। চিৎকার আর শরীরের শক্তি দিয়ে আমি পুশ দিচ্ছি, ঘাম বেরুচ্ছে, কেউ একজন পাশ থেকে বলছে ডাক্তার নেই এখন, পুশ দিও না, কিছুই আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, আমি এখন কিছু করছি না, তাদের বুঝাতে পারছিনা কেউ আমাকে দিয়ে করাচ্ছে, চিৎকার, ঘাম,পুশ, কান্না সব সব কিছু।

বিজয় আমার মাথা মুছে দিচ্ছে বার বার। হঠাৎ করে টের পেলাম আমি শূন্যে পরে গেলাম, কোন ব্যথা নেই, কান্নার আওয়াজ নিজের অজান্তেই ঠোটের কোণে হাসি টের পেলাম। ততক্ষণে ডাক্তার চলে আসলো, বাকিরা যুদ্ধ পরবর্তী সৈনিকের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন রক্তাক্ত দেহকে সেলাই করে পরিচ্ছন্ন করতে শুরু করলো।

আমি তাকিয়ে আছি যুদ্ধের ফসল আমার সন্তানের মুখের দিকে। ক্লান্তি নেই, যন্ত্রণা নেই! কোথায় গেল সব! মায়ের মুখ মনে পড়লো, মনে মনে বললাম মা……..

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৮৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.