গল্পগুলো সাধারণ-১

0

kakoliকাকলী তালুকদার: ডাক্তারকে আমি বললাম যদিও আমার প্রথম সন্তান সিজারে হয়েছে এই সন্তানটি আমি নরমাল চেষ্টা করতে চাই। ডাক্তার আমাকে আস্বস্থ করেই বললেন তুমি চেষ্টা করো, নরমাল ডেলিভারিই হবে তোমার কোনো সমস্যা হবে না। 

সেদিন থেকেই আমার প্রস্তুতি, আমার পাশে যেহেতু কেউ নাই কে দেখবে? মেয়েটাকে তার বাবার কাছে রাখতে পারবো কিন্তু আমাকে আর নতুন বাচ্চাকে কে সামলাবে সিজার হলে? আর মা শব্দটি বেশি করে অনুধাবনের জন্যও ইচ্ছে ছিল নরমাল ডেলিভারির কষ্টটা নিতে। বড়টার সময় দেশে ছিলাম ইচ্ছা সত্বেও শেষ পর্যন্ত সিজার করতেই হলো। পরিবারের সবাই তখন পাশে ছিল।
২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে নিশ্চিত হলাম আমি আবার মা হতে যাচ্ছি। মে মাসে বিজয় (আমার হাজবেন্ড) জব নিয়ে চলে আসলো বারহেড, ক্যালগেরি থেকে ৫ ঘন্টার ড্রাইভ।এখন আমরা এখানেই আছি। নিজে তখন জব করি। মেয়ের বয়স আড়াই বছর। সাথে আরেকটা বাচ্চাকে বেবি সিটিং করি। সময়টা একা হয়ে গেলাম, মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম জীবন এমনই।
প্রথম দিকে বিজয় এক সপ্তাহ পর পর যেতো, পরে সেটা দশ দিন পনেরো দিন হতো। বুঝতাম তার ড্রাইভ করতে ভালো লাগে না। আমাদের সপ্তাহের বাজার করে দিয়ে আসতো। মাঝখানে যা লাগতো আমি কাজ থেকে ফেরার সময় নিয়ে আসতাম। নির্দিষ্ট সময়ে বাস ধরতে হতো তাই মেয়েকে ড্রপ করে দিয়ে অনেকদিন নিজের অজান্তেই দৌঁড়ে গিয়ে বাস ধরেছি। একজন বাস ড্রাইভার খুব হেল্পফুল ছিল, তার কথা আমার আমৃত্যু মনে থাকবে।

দ্বিতীয় পর্ব: প্রথম দিকে মনে হলো জবটা ছেড়ে দেই, শারীরিক কষ্টগুলো বেশী হয়ে যাচ্ছে। প্রেগনেন্সির প্রথম তিন মাস শরীর তা অনেক দুর্বল লাগে, অল্পতেই ক্লান্তি লাগে। বাসার রান্না, দুইটা বাচ্চা সামলানো আবার বাইরে গিয়ে আট ঘন্টা কাজ, যাওয়া আসা দুই ঘন্টা জার্নি। কাজের জায়গায় আধা ঘন্টা বিরতি ছাড়া পুরো সময়টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

দেশে কথা বলি দুই একদিন পরপর, সারাক্ষণ দেশে থাকি মননে ও চিন্তায়। এখানে আসার আগে কখনও এমন হয়নি পরিবারের সবাইকে এত দীর্ঘ সময় না দেখে থাকা। ভিতরে ভিতরে দেশের জন্য একটা ক্ষরণ চলে সবসময়। বিদেশ নিয়ে আমার কোন স্বপ্ন ছিল না কোনোদিন।
তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখাও একটা কাজ হয়ে গেল। মনকে খারাপ হওয়ার সময় দেয়া যাবে না। সারাক্ষণ মনের মধ্যে চব্বিশ ঘন্টাকে অংকের মতো হিসেব করছি।

কাজের জায়গায় আমার ম্যানেজার বাঙালী, উনার নাম আলম । আলম ভাইও আরো বেশী দাায়িত্ব নিয়ে যাই যাই করছেন এই সময়। নতুন একজন সুপার ভাইজার নিয়ে আসলেন স্টোরে। আলম ভাইয়ের মাধ্যমেই ওখানে আমি কাজ নেই, তাই সহজেই নিজের সমস্যাগুলো আলম ভাইকে বলি না। কারণ অন্যরা যেন এই কথাটি না ভাবে ম্যানেজারের পরিচিত বলে বিশেষ সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে। আমাকে আমার দায়িত্ব সম্পর্কে বেশী সচেতন থাকতে হয়।
Kakoli 2তখন আমি স্টোরের ওপেনিং করি। সকালে উঠে মেয়েকে ড্রপ করতে দশ মিনিট হেঁটে যেতে লাগতো, শরীরের কারণে সেই দশ মিনিট দীর্ঘ হতে লাগলো। আর মনে মনে আমার বাস 71 আর বাস ড্রাইভারের মুখ ভেসে উঠতো । বাসটা ধরতে পারবো তো? বাসটা মিস করলেই ম্যাকনাইট থেকে স্টাফ বাসটা পাবো না। এক ঘন্টার ফেরে পড়তে হবে। ওপেনিং লেইট হয়ে যাবে অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করতে হবে।
আমার বাসের নাম্বার 71, আমার খুব পছন্দ নাম্বারটি। 71 মানে আমার কাছে একটা ইতিহাস, একটা মুক্তির গল্প। সাথে বাসের ড্রাইভারকে মনে হত মুক্তির নায়ক। যদি কখনো সে দেখেছে আমি রাস্তা পার হচ্ছি সে নির্দিষ্ট স্টপেজে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো আমি বাসে না উঠা পর্যন্ত। ঘটনাটি ঘটতো কয়েক মিনিটের মধ্যে।
কাজ থেকে ফেরার সময় মেয়েোক এবং রিয়ানকে নিয়ে বাসায় ফিরি। রিয়ান যাকে আমি বেবি সীট করি, আমার মেয়ের ছয় মাসের বড়। দুইটাই তখন আমার সন্তান, ঐতিহ্য এখনও তাকে দাদা বলেই জানে। বাসায় ফিরে এক কাপ চা খেয়ে আবার বাসার ডিউটি শুরু হয়ে যেতো।
তার মাঝখানেই নিজের রেগুলার চেকাপ করতে যেতে হয়। বিজয় তখন বাসায় থাকলে ওই আমাকে ড্রপ করে দিতো, নয়তো আমি বাসে-ট্রেনে চলে যেতাম। বিজয় আসতো ২ দিনের জন্য,বাসায় যখন থাকে তার পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।আমাদের বাজারসহ অন্যান্য কাজগুলো করে নিতো। ফেরার সময় তার কয়েকদিনের রান্না করে দেই। ওখানে তার কাজ আর নিজের স্টাডি নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। এর মাঝখানে সে কানাডার মেডিক্যাল পরীক্ষাগুলোও দিচ্ছিল।

তার স্টাডি নিয়ে ব্যস্ততা আমাকে ভিতরে ভিতরে কষ্ট দিচ্ছিল, কারণ প্রেগন্যান্সির সময়টায় আবেগগুলো ভিতরে বেশি কাজ করে মেয়েদের। এসময় একটু নির্ভরতা, একটু যত্ন পেতে অনেক ভালো লাগে। মনের স্বাস্থ্যটাও তখন খুব সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। মুখ ফুটে কিছু বলতাম না, নিজের খাওয়াটা নিজেই রুটিন করে চালাতে লাগলাম। পাশে কেউ নেই এটাই ভাবতাম সবসময়। শরীর ভারী হচ্ছে মাসে মাসে, ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা নিয়েই দিন চলতে থাকলো।

ভেবেছি মায়েদের যুদ্ধগুলো হয়তো এমনই। নয়তো পৃথিবী থেমে যেত। আমার জবটা শেষ পর্যন্ত ছাড়তে পারিনি চেষ্টা করেও। বড় বোনটা একটা বড় বিপদে পড়েছে, বড় এমাউন্ট টাকা লাগবে। সেটা দেশে ম্যানেজ করা সম্ভব না, আমি জানি। ভাবলাম, যুদ্ধ তো এমনই, কষ্টের মধ্যেই কষ্ট, অনেকটা মাঝ সমুদ্রে তীর খোঁজার মতো।

কারো কাছে টাকা চাওয়া যাবে না, সুতরাং যা করতে হবে আমাকেই করতে হবে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, কষ্ট হউক হাল ছাড়া যাবে না। কাজের জায়গায় জানালাম প্রেগনেন্সির কথা, আলম ভাই বললেন, ঠিক আছে আপনি কাজ করে যান, আমি তো আছি। মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য 900 ঘন্টা কাজের প্রমাণ লাগবে, সেটা প্রেগনেন্সির শুরু থেকে ঘন্টা পূরণ হতে হবে। ভা

রী শরীর ছুটি চায়, আমি তাকে ছুটি দিতে পারি না। পেটে মাঝে মাঝে হাত রেখে তাকে বলি, জীবন এমনি এখন থেকে বুঝতে শিখ ! বাইরের পৃথিবী আরো কঠিন, তবে আমার সাথে যতক্ষণ আছো আমি তোমাকে আগলে রাখবো। আমি নিজের অজান্তেই আগলে রাখি, সব মায়েরাই রাখে।

মনে মনে হিসেব করি কবে 900 ঘন্টা হবে? দিন দিন ক্লান্তিরা আমাকে আগলে ধরছে। 71 বাসে উঠতে গিয়ে ভুল করে একটু দৌড়াই, ড্রাইভার বলে তোমায় দৌড়াতে হবে না, আমি তোমার জন্য দাঁড়াবো তো! সে যেন অনুভব করতে পারে আমার ক্লান্ত দেহ ভুল করে প্রতিযোগিতায় নামে, আমি মুচকি হেসে তাকে ধন্যবাদ জানাই।
দেখতে দেখতে চার মাস হয়ে পার হয়ে গেল। আগস্ট মাস একদিন রেগুলার চেক আপে যাবো, খুব বৃস্টি সেদিন। মেয়েকে স্টলারে করে একটা ছাতা নিয়ে রওনা হলাম। প্রথমে বাস, পরে ট্রেইন, কিন্তু স্টলার ঠেলতে হচ্ছে, তার মাঝে বৃস্টি তাও আবার অসাধারণ বৃষ্টি, থামবে না, বুঝতে পেরেছি।

যেতে যেতে ছোট বেলার বৃষ্টির কথা মনে পড়লো! হাওরে বাঁশের ভেলা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম ঝুম বৃষ্টিতে, কত সুখের ছিল সেই বৃষ্টি! আর আজ মনে হলো শত্রুতা করতেই বৃষ্টি এলো। মনে মনে নিজের জেদ বেড়ে যায়, ক্লান্ত গতি হুট করে বেড়ে যেতে থাকে। অভিমান গলার কাছে সুড়সুড়ি দিচ্ছে আমি টের পাচ্ছি, কিন্তু তাকে আমার দুর্বলতা বুঝতে দিতে চাই না।

নিজের ভিতরের কয়েকজন আলাদা আলাদা স্বত্বার দ্বন্দ্ব টের পাই। ট্রেন থেকে নেমে ছাতাটা খুলতে গিয়ে পেটে জোরে বারি পড়লো, পেটের ভেতরে কেউ নড়ে উঠলো, বুঝতে পারলাম সে ব্যথা পেয়েছে, অজানা আশংকা কাজ করতে শুরু করলো। মেয়ের স্টলার ঠেলতে ঠেলতে একটা হাত বার বার পেটের কাছে চলে যাচ্ছিল অজান্তেই।

বাচ্চা নড়ছে তো? ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ব্যথা, টেনশন, বৃষ্টি, অভিমান, স্টলার সবাই এক সাথে আমাকে চেপে ধরলো, আমি হাঁটছি পরবর্তী ট্রেইন ধরার জন্য। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, বৃষ্টির জলে কি চোখ ঝাপসা হয়ে আসে? বৃষ্টির জল তো ছোট বেলায় অনেক খেয়েছি কই কখনও তো নোনতা লাগেনি? তবে আজ লাগছে কেন? (চলবে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,০২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.