পুলিশের বিরুদ্ধে আমার কোনো SAY নেই

0

Police Abulসুমন্দভাষিণী: একজন চা-বিক্রেতাকে আগুনে ঝলসে মেরে ফেলেছে আমাদের বীর পুঙ্গবরা। গতকাল থেকে খুব বেশিজনকে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে উচ্চবাচ্য করতে দেখিনি। নিজেও করিনি। আমি করিনি, কারণ আমার করায় কিছু আসে যায় না। যাদের করায় আসে যায়, তারাও চুপ অজানা কারণেই। আবুলের গরীবপানা চেহারা আসলে মনের ভেতরে খুব একটা কষ্ট জাগায় না।  

সারাদিন ধরে টিভি পর্দায় নিহত আবুলের স্বজনদের আহাজারি দেখেছি। তার মেয়ের বুকফাটা আর্তনাদ দেখেছি। সত্যি বলতে কী, আমার ভিতরেও কোনো কষ্ট কাজ করেনি। কোনো অনুভূতিই জাগেনি এই মানুষগুলোর জন্যে। এইদেশের এমন অনেক লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন কাঁদে, প্রতিদিন আহাজারি করে, প্রতিদিন স্বজন হারায়, আমাদের কী আসে যায়? আমাদের আসে যায় তখনই যখন আমরা নিজেদের ভেতরে কাউকে হারাই, কাউকে কাঁদতে দেখি। তখন আমরাও কেঁদে বুক ভাসাই, প্রতিবাদী হই, ঝড় তুলি অনলাইনে-অফলাইনে। অনেকসময় তাতে কিছু একটা ফলও ফলে।

এই যেমন কিছুদিন আগে ব্যাংক কর্মকর্তা রাব্বীকে পেটালো সেই একই বীর পুঙ্গবেরা। তখন সেকী ঝড়! ঝড়ের প্রতাপে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসনও, যদিও ভিতরে ভিতরে প্রশাসন পুঙ্গবদের পক্ষেই গিয়েছে। বেচারা রাব্বী এখন অনিশ্চয়তা, আতংকে দিন কাটাচ্ছেন শুনেছি। পুলিশের বিরুদ্ধে তার মানে এখানে কিছু বলা যাবে না। বললেই প্রশাসন তার আঠারো ছুঁচালো নখ বের করে  খামচে ধরবে। কে যায় এসব ঝক্কি পোহাতে? তার চেয়ে মার খাওয়াই উত্তম। পকেটে ইয়াবা ভরে দিয়ে মাদক ব্যবসায়ী সাজালেও আমাদের কিছুই করার নেই।

ছেলেটাকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকি। টিনএজ ছেলে। একদিন এসে জানালো, কোচিংয়ে যাওয়ার পথে পুলিশ তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে শরীরে তল্লাশি করেছে। মা সাংবাদিক শুনে চলে যেতে দিয়েছে। রিকশাওয়ালা বয়স্ক লোক, ঊনি তখন আমার ছেলেকে বললেন, ‘মামা, কিছু মনে করো না, সময়টা খারাপ, পারলে চুলটা কেটে ফেল’।

আমার ছেলে সেদিনই তার চুল কেটে আসে। তার মানে ভয় তাকে গ্রাস করেছে। ও প্রায়ই আমার কাছে শুনতে পায়, ‘আজ আমাদের অমুককে খুন করে ফেলেছে, তমুকের ওপর হামলা হয়েছে, তুমি সাবধানে থেকো বাবা’। ও বলে, ‘কেন? আমি কী করেছি’? আমি বলি, ‘তোমার কিছু করতে হবে না, তুমি আমার ছেলে, এটাই কি অনেক কিছু না? কার মনে কী পরিকল্পনা আছে, কে জানে!

আমরা প্রতিনিয়ত নিজের জীবন নিয়েই এতোটা অস্থির থাকি যে, কার কী হারালো, কে মারা গেল, আর কে হারিয়ে গেল, গুম হয়ে গেল, এতোকিছু ভাবার সময় কোথায়?

তার চেয়ে বরং আমরা পার্লারে যাই, সাজগোজ করি, বিয়ে বিয়ে উৎসব করি, ফ্যাশন শোতে যাই, হা হা হি হি করি, রান্নার ছবি দিয়ে ফেসবুক সয়লাব করি, এও ঢের ভালো। জীবনটা তো অক্ষয় হবে! চাপাতি নিশ্চয়ই ধার দেয়া হবে না এক্ষেত্রে!

তাছাড়া দু’চারজন এমন দরিদ্র লোক চাঁদা দিতে না পেরে আগুনে ঝলসে যাবে, বা হারিয়ে যাবে সারা জীবনের জন্য, তাদের জন্য হা-হুতাশ করে জীবনটা ভারাক্রান্ত করতে আর রাজী নই। প্রায়ই রাত গভীর হলে বেড়িবাঁধের দিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসে, সচকিত হয়ে গুলির উৎসটা কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করি, মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি, কোন মায়ের বুক খালি হলো আজ কে জানে! সেই লাশগুলো কোথায় ভেসে যায়, জানি না। হয়তো মাটিচাপা পড়ে যায়।

এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর অধিকাংশই আমাদের অজানাই থেকে যায়, তাদের পরিবার পুলিশের হয়রানি বা চোখরাঙানির ভয়ে চুপ মেরে যায় একেবারে।

কথা আছে না, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে ৩৬ ঘা। তো, সেই ৩৬ ঘা খেতে কে যায়! ভয়ে সেঁদিয়ে যায় স্বজনহারা মানুষগুলো। আগুনে পুড়ে মরে যাওয়া আবুলের পরিবারও একসময় চুপ হয়ে যাবে, পুলিশ এসে প্রতিদিন তাদের বাড়িতে হাজিরা দিয়ে বুঝিয়ে যাবে, চুপ করে থাকার কত গুণ।

ঢাকার আদাবর থানার যে এসআই এর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে,  সেই এসআই আবার আমার একটি জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। কোনদিন একটিবারের জন্যও খোঁজ নেননি। হয়তো আমার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারবে না বলেই আর এমুখো হয়নি, কে জানে!

দেশে আইনের শাসন চলছে বহুমুখি, আমরা আম-জনতা ঠিক কোন শাসনের মধ্যে আছি বলা মুশকিল। তাই দু’একজন রাব্বী বা সিটি কর্পোরেশনের ওই কর্মকর্তার মতো মানুষজন নির্যাতিত হবে, হুমকির মুখে পড়বে, উল্টো মামলাও খেতে পারে, আর দু’একজন আবুল হয় আগুনে দগ্ধ হয়ে বা ক্রসফায়ারে পড়ে মরে যাবে, যেতেই পারে। এ নিয়ে আফসোসের কিছু তো দেখি না।

দিনশেষে বা রাতশেষে পুলিশকে যতোই আমরা জনগণের বন্ধু ভাবি না কেন, পুলিশ পুলিশই হয়। আর এইসময়ে গোপালগঞ্জের প্রায় প্রতিটি ঘরের কেউ না কেউ যখন পুলিশ হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, ক্ষমতার উৎসটা আসলে কোথায়? তবে সবকিছুরই একটা ‘লিমিট’ আছে, কেউ যদি সেই ‘লিমিট’ অতিক্রম করে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এর একটা ফলাফল চলে আসে। সেটা খুব একটা সুখকর নাও হতে পারে।

 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.