নারী যখন কেবলই নারী

0

Societyলীনা পারভিন: আমাদের দেশ বর্তমানে মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্টের কোটা পেরিয়ে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্টের ধাপে আছে। এমডিজি এর একটা অন্যতম অর্জন নারীর ক্ষমতায়ন। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে।

তবে প্রশ্ন থেকে গেলো নারী যে ক্ষমতা ব্যবহার করবে তা মেনে নেবার মত মানসিকতা কি আমাদের সমাজের অন্যদের, বিশেষ করে পুরুষের হয়েছে?

আমার ১৪ বছরের কর্মজীবনে প্রতি মুহূর্তে এর সত্যতা উপলব্ধি করছি। হয়তো আমার সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের কারণে সরাসরি কোন প্রস্তাব বা হুমকি দিতে না পারলেও, আকারে ইংগিতে বা পরোক্ষভাবে চেষ্টা কিন্তু অব্যাহত আছে কিভাবে আমাকে মনে করিয়ে দেয়া যায় যে, আমি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হলেও আমি একজন নারী।

আমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে দেখেছি সেখানে সাকুল্যে উচ্চপদে, মানে ডিপার্টমেন্টকে লিড করার মত পদে খুব নগণ্য সংখ্যক নারীই সুযোগ পায়। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে খুবই সরল এবং নিরেট, এই সমাজের একজন সচেতন কিন্তু প্রচলিত অর্থে নারীদের যে বৈশিষ্ট্য থাকার কথা সেগুলি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। আমাদের অন্তত ৯৮% কর্মজীবি নারীদেরই মনে হয় এই অবস্থা।

একদিন কথায় কথায় আমাকে একজন নারী কলিগ বলছিলো, ”আপা আপনি আসার পর মনে হচ্ছে যেন আমি একটা ভরসার জায়গা পেয়েছি, নাহলে এতোগুলো ছেলের মাঝে আমি কিভাবে যে কাজ করতাম?”

আমি বললাম কোন সমস্যা নাই আপা। কোথাও পরামর্শ লাগলে আমাকে জানাবেন, আর আপনার জায়গায় আপনি শক্ত থাকবেন। কেন নিজেকে দুর্বল মনে করছেন?

সাধারণত যা হয় অফিসগুলোতে খুব সোজা কথায় বললে পুরুষ ম্যানেজাররা সরাসরি মন্তব্য করেন “এই জন্যই বলি মেয়েদের দিয়ে কিছু হবে না”। এবং এই কথার মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তির আভাস পাওয়া যায়। সুযোগ পেলেই নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়। নিজের গরজে এগিয়ে এসে পরামর্শ দেয় কি করিলে কি হইবে, আর কি না করিলে কি না হইবে ইত্যাদি।

কিন্তু ঘটনা প্যাঁচ খায় তখনই, যখন দেখে মেয়ে হয়েও তাদের কোন পরামর্শকে আপনি প্রাধান্য দিয়ে গদগদ হয়ে ‘থ্যাংকু ভাইয়া’ না বলেন।

Leena 2তখন তারা ধরে নেয় যে একে দিয়ে নিজের কোন স্বার্থ হাসিল করা যাবে না এবং শুরু হয় “পলিটিক্স টু মেইক ইউর লাইফ হেল”। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লক্ষণের কথা বলছি।

মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করার ফলে আমাকে প্রতিনিয়ত লোকজন হায়ার-ফায়ার করতে হয়। ঘটনাক্রমে আমারই ডিপার্টমেন্টে একজন নারীকে আমরা সিলেক্ট করলাম। তার একদিন পর সে ফাইনালাইজেশনের আগে এসে বললো যে, সে প্রেগনেন্ট। মেয়েটি খুবই আপসেট মুডে ছিলো। তার মতে অনেক অর্গানাইজেশনেই প্রেগনেন্ট হলে রিক্রুট করে না, এমনকি সে যে প্রতিষ্ঠান থেকে আসছে সেখানেও একই প্র্যাকটিস। তবে সে রিকোয়েস্ট করলো যদি আমি কনসিডার না করি তাহলে তার ক্যারিয়ারে একটা গ্যাপ তৈরি হবে।

মেয়েটির সততা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সে তো লুকিয়ে রেখেও কাজে যোগ দিতে পারতো। তা সে করেনি। নিজে এসে আমার কাছে শেয়ার করেছে। আমি বুঝালাম এটি আপনার অপরাধ নয় বা আপনি কোন ক্রিমিনাল কাজ করেননি। খুবই স্বাভাবিক ঘটনা এবং প্রাকৃতিক নিয়মেই মেয়েরা মা হবে। এর সাথে তার কর্মযোগ্যতার কোন সম্পর্ক নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি চ্যালেঞ্জ নেবো। মেয়েটিকে মানসিকভাবে সান্তনা দিলাম। আমি একজন যোগ্য টিম মেম্বারকে হায়ার করছি, কোন নারীকে নয়।

এই ঘটনা আমাকে যথেষ্ট ভাবিয়েছে। প্রতিটা কাজের প্রতিটা ধাপে আমাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে, আমি নারী হিসাবে নয় একজন যোগ্য মানুষ হিসাবে একটি পদে আছি।

মাঝে মাঝে নিজেকে মনে হয় এ কোন দুনিয়ায় আমি আছি? উঁচু পদে বসে থাকা লোকেরা সরাসরি মন্তব্য করে “মেয়েদের মাথায় তো বুদ্ধি কম”। কোন দ্বিধা নেই সেই কথা বলায়। নিজেকে বড় প্রমাণ করার জন্য আরেকজন মানুষকে ছোট করতে বিন্দুমাত্র লাজশরম দেখি না।

কিছু সিম্পটম শেয়ার করছি –

১। আপনি যদি দেখতে সুন্দরীদের তালিকায় থাকেন তাহলে আপনার কদর একরকম। যদি না হন তাহলে দেখবেন আপনার প্রতি তাদের আচার ব্যবহার আরেক রকম।

২। আপনি যদি হেলিয়ে-গলিয়ে কথা না বলতে পারেন, খটাখট মুখের উপর জবাব দেন তাহলে আপনার সাথে ব্যবহার একরকম, আর না পারলে আরেক রকম।

৩। আপনি যদি অফিসে দামি পোষাক পরে গালে লাল আভা এনে না যেতে পারেন তাহলে একরকম আর পারলে আরেক রকম।

৪। আপনি মাঝে মাঝেই কারণে-অকারনে খাওয়াতে না পারলে আপনি নাই কোথাও।

৫। কোন সিদ্ধান্ত নেবার সময় যদি নিজের মতকে প্রাধান্য দিতে চান এবং আপনার সম-লেভেলের কলিগকে নিচু করে দেন তাহলেই আপনি অন্যরকম ব্যবহারের জন্য রেডি থাকেন।

এ রকম হাজারো লিস্ট দেয়া যাবে, কিন্তু লিস্ট দিলেই সমাধান আসছে কোথায়? সাস্টেইনেবল এর যুগে নারীর স্বাধীনতা বা ক্ষমতায়ন এখনো অবস্থানই করছে খুবই সরু রশির উপর, টেকসই তো অনেক দূরের কথা।

নারীরা এই মুহূর্তে খুবই বিচ্ছিন্নভাবে লড়াই করে যাচ্ছে। এই বিচ্ছিন্ন লড়াই নারীকে কেবল দুর্বলই করে দিতে পারে, শক্ত কোন ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে দেবে না। একজন নারী যদি তার লড়াইয়ে কোন প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা না পায়, তাহলে টেকসই উন্নতি কেবল কথাতেই থাকবে। এই মুহূর্তে আমরা সবাই বিচ্ছিন্নভাবে বিপ্লবী, বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদী। কিন্তু দরকার সমন্বিত লড়াই, সমন্বিত প্রতিবাদ। আমরা কি তৈরি…………? সেই ঐক্য কই আমাদের?

 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২০১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.