সংসদ সদস্যদের অসংসদীয় আচরণ ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন

উইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক: জাতীয় সংসদের হুইপিং সিস্টেমকে কার্যকর করা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এজন্য রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করবার রেকর্ড আছে এমন দলের নিবন্ধন না-করার ব্যবস্থা নেয়াসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ।
পাশাপাশি জাতীয় সংসদকে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে পারস্পরিক আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের দলীয়ভাবে ইন্ধন দিয়ে অসংসদীয় কাজে যুক্ত করা থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণ করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক কয়েকটি অধিবেশনে কয়েকজন সংসদ সদস্য নারীর অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে প্রথমে একটি টিভিতে এবং পরে একটি দৈনিকের উপসম্পাদকীয় কলামে বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ জাতীয় সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাটি বাতিলের প্রস্তাব করেছেন।
তিনি বলেছেন, আমাদের নাগরিকদের উচিত, অবিলম্বে সংরক্ষিত নারী আসন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা। নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তাঁর এই বক্তব্যে নারী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো আশংকা প্রকাশ করেছে।
সংগঠনটি বিবৃতি বলে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হওয়া বিভিন্ন আলোচনায় ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ মাইনাস টুর আদলে দুই নেত্রীকে বাদ দেয়ার পিতৃতান্ত্রিক ফন্দিফিকিরও হাজির করছে।
সংগঠনটি জানায়, জাতীয় সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন নারীসমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল। এই ব্যবস্থাটি সৃষ্টি হয়েছিল, পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জাতীয় সংসদে নারীসমাজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবার জন্য, যার প্রয়োজন আজো ফুরায়নি। মাত্র ১৫টি আসন নিয়ে এই ব্যবস্থার সূচনা হলেও ক্রমশ বেড়ে এই আসন সংখ্যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৫০টিতে। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল মিলে মোট ৫০ জন নারী এই পদে থেকে তাঁদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। দীর্ঘ ৮৩টি কর্মদিবস ধরে সংসদ বর্জন করে থাকার পর সাম্প্রতিক বাজেট অধিবেশন থেকে বিরোধী দল পুনরায় অংশ নেয়ায় জাতীয় সংসদে বাজেট নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী বিতর্কের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ করছি, দেশের মানুষের কল্যাণে বাজেটের ওপর আলোচনা-সমালোচনা নয়, জনগণের চাহিদা, তাদের জীবনমান উন্নয়ন, নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ, পরিবেশ, কৃষি, যাতায়াত, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, শিক্ষার মানোন্নয়ন, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো; সর্বোপরি দারিদ্র্য দূরীকরণে ঘোষিত বাজেট যথাযথ কি না সে বিষয়ে আলোচনা বা বিতর্ক নয়; বরং সংসদ সরগরম হয়ে থাকছে কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণে, যা সরাসরি সংবিধান ও সংসদীয় রীতিনীতিবিরোধী।
বিবৃতিতে বলা হয়, টিআইবির জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ অধিবেশন পরিচালনায় গড়ে প্রতি মিনিটে ব্যয় হয় ৭৮ হাজার টাকা। এছাড়াও আছে সংসদ ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মচারীদের বেতনভাতা বাবদ ব্যয়। এই টাকা দেশের জনগণের। সংসদ সদস্যগণ জনগণের প্রতিনিধি হয়ে জাতীয় সংসদে আসেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁরা দেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করে আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সাথে কর্তব্য পালন এবং নির্দিষ্ট কর্তব্যকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে না-দেয়ার শপথ গ্রহণ করেন। তাঁদের কর্তব্যের মধ্যে আছে সংবিধানকে সমুন্নত রেখে দেশ ও জনগণের স্বার্থে আইন ও বিধি প্রণয়ন, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, সার্বিক উন্নয়ন ও নীতি নির্ধারণ এবং জাতীয় বাজেট পাস। এই সমুদয় কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য যেখানে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা পালন করার কথা, সেটা না-করে তাঁরা জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাদা-ছোঁড়াছুড়ির মাধ্যমে সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে চলেছেন। সংসদ সদস্যদের দায়বদ্ধতা জাতীয় সংসদ ও সংবিধান এবং দেশের জনগণের কাছে। তাঁরা মোটেই সেটার ধার ধারছেন না, বরং উলটোভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে চলেছেন। আমরা মনে করি, সংবিধানকে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অসাংবিধানিক কাজ এবং জনগণের অর্থের অপচয় করা এক ধরনের দুর্নীতি। একইভাবে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের দলীয়ভাবে ইন্ধন দিয়ে অসাংবিধানিক কাজে যুক্ত করা ও সংসদকে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে পারস্পরিক আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের ক্ষেত্র বানানোও দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে। এতে একদিকে যেমন দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাও যোগ হয়।
টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, নবম সংসদের অষ্টম থেকে পনেরোতম অধিবেশনের মোট ১৬৩টি কার্যদিবসে বাজেট আলোচনা ও আইন প্রণয়নে ব্যয় করা হয়েছে যথাক্রমে মাত্র ২৩ শতাংশ ও ৭ শতাংশ সময়। এ অবস্থা কারো কাছেই প্রত্যাশিত নয়।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে আরেকটি বিষয়ও বলা দরকার, সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হয়ে না-আসায় ভোটারদের কাছে তাঁরা সরাসরি দায়বদ্ধতা অনুভব করেন না। এমনকি তাঁদের যে নারীসমাজের প্রতিনিধিত্ব করার কথা, সে বিষয়েও তাঁরা কোনো ভূমিকা পালন করেন না। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দলের নেতৃবর্গ তাঁদের টেবিল চাপড়ানো থেকে শুরু করে এ ধরনের অসংসদীয় কাজে নিয়োগ করবার অবকাশ পান। আমরা মনে করি, এ অবস্থা বন্ধ করবার জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। এসব বিষয় বিবেচনা করেই নারী আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন চালু করবার দাবি তুলে ধরেছে।
এছাড়া জাতীয় সংসদের সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত কয়েকজন পুরুষ সংসদ সদস্যও জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মেয়াদে ও সময়ে অশালীন ও অসংসদীয় বক্তব্য রেখেছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ করেছেন, যা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করতে হয়েছে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, সংসদের ভিতরে ও বাইরে যত সমালোচনা হয়েছে তা হয়েছে ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু যখন কয়েকজন নারী সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদে অশালীন ভাষার ব্যবহার করলেন, তখন অনেকেই সমালোচনা করছেন নারী হিসেবে ও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাটি নিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টতই পুরুষতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক। এরকম বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে কোনো সমস্যারই সঠিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন সম্ভব নয়; এবং এ ধরনের বিশ্লেষণ থেকে চিহ্নিত সমস্যার সমাধানে পৌঁছুতে চাইলে মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো অযৌক্তিক প্রস্তাব আসতে পারে, যেমনটি আমরা পেয়েছি সৈয়দ আবুল মকসুদ ও আরো কারো কারো কাছ থেকে।
সবাই জানেন, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অশালীন ও অসংসদীয় আচরণ করেছেন হাতেগোনা কয়েকজন সংসদ সদস্য। তা-ও এটা তাঁরা করেছেন দলের ইন্ধনে। দলের হুইপগণ এখানে কোনো কর্তব্য পালন করেননি। আমরা মনে করি, তাঁদের এই অসংসদীয় আচরণের জন্য প্রথমত ব্যক্তি সংসদ সদস্যরাই দায়ী এবং দ্বিতীয়ত দায়ী নির্দিষ্ট সদস্যদের দল। কারণ দল থেকে পিঠ চাপড়ানো না-হলে, হুইপিং সিস্টেম কাজ করলে, এ আচরণকে সমর্থন ও সহায়তা না-করলে সংসদের ভিতরে একের পর এক এ ধরনের কার্যকলাপ চালানো কার্যত অসম্ভব। এসব ব্যাপার মোটেই আমলে না-নিয়ে মাত্র কয়েকজন সংসদ সদস্যের অসংসদীয় আচরণের কারণে পুরো সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাটিকে দায়ী ও বাতিলের প্রস্তাব করা কিংবা দুই নেত্রীকে বাদ দেবার প্রস্তাব উত্থাপন করা দারুণভাবে হঠকারিতা ও নারীবিদ্বেষমূলক। আমরা এ ধরনের প্রস্তাবের প্রতি তীব্র অনাস্থা জানাচ্ছি।
আমরা প্রসঙ্গক্রমে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়েও আমাদের মত জানাতে চাই। কারণ সম্প্রতি সংসদে ও তার সূত্র ধরে সংসদের বাইরে কারো কারো ধর্ম ও ধর্মাচার নিয়েও বক্তব্য দেয়া হচ্ছে, যা কাম্য নয়। শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদদের মুখে জাতীয় সংসদে ও সংসদের বাইরে এ ধরনের বিতর্ক অনাকাঙ্খিত। বাংলাদেশের জনগণ কে কোন ধর্মের মানুষ, কে ধর্মচর্চা করে কে করে না, কে আস্তিক কে নাস্তিক- এগুলো একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়, রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে তার পরিচয় বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে। নাগরিকদের এসব ব্যক্তিগত বিষয় দেখবার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের নয়; একইভাবে নয় রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদেরও। রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক দল চলবে দেশের সংবিধান অনুযায়ী। রাজনীতিবিদদেরও তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা সংবিধানের নির্দেশ মেনেই।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে সমান অধিকার দিয়েছে, বৈষম্যহীনভাবে সমান চোখে দেখেছে ও দেখতে বলেছে। কাজেই ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি সংবিধানবিরোধী ও বেআইনি। বিষয়টি নিশ্চিত করবার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কখনোই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সকলের অবগতির জন্য সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরছি :
• জাতীয় সংসদের হুইপিং সিস্টেমকে কার্যকর করার ব্যবস্থা নিতে হবে;
• রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করবার রেকর্ড আছে এমন দলের নিবন্ধন না-করা এবং নিবন্ধিত কোনো দল ধর্মকে ব্যবহার করলে সেই দলের বিরুদ্ধে সংবিধান সমুন্নত রাখার স্বার্থে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে;
• জাতীয় সংসদকে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে পারস্পরিক আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে;
• নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের দলীয়ভাবে ইন্ধন দিয়ে অসংসদীয় কাজে যুক্ত করা থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় কৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে কেউ তাঁদের দলের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে;
• জাতীয় সংসদে সংবিধানকে সমুন্নত রেখে দেশ ও জনগণের স্বার্থে আইন ও বিধি প্রণয়ন, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নীতি নির্ধারণ ও সার্বিক উন্নয়ন এবং বাজেট বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আলোচনা উত্থাপন করবার ও অংশ নেবার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বিষয়ের বাইরে সংসদ সদস্যদের কথা বলবার সুযোগ রহিত করা যায়;
• সংসদের নিয়মকানুন মেনে চলা ও নিজেদের দায়দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে;
• নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী সদস্যদের তাঁদের দায়দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে নারীর সমানাধিকার অর্জনে ভূমিকা রাখতে হবে এবং লক্ষ রাখতে হবে তাঁদের কার্যকারণে নারীর ক্ষমতায়ন যাতে ব্যাহত না হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.