স্মৃতিময় সেইসব দিন

0

Hasina Nigar 2হাসিনা আকতার নিগার: শীত এবার তেমন করে আসেনি। কদিন পরে ফাল্গুনি সমীরণ আর রং এ মাতবে প্রকৃতি এবং জীবন। শুরু হয়েছে বাঙালীর প্রাণের মেলা বই মেলা। ভালোবাসা দিবস, ১লা ফাল্গুন আর ২১ ফেব্রুয়ারি সব যেন উচ্ছাসের মিলন মেলা। বই মেলা প্রাঙ্গনে লেখক পাঠকের কোলাহল। বই মেলাতে বিক্রি যেমনই হোক, নিজের বইটি থাকবে এমন প্রত্যাশাতেই সারাটি বছর থাকেন লেখকরা।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে এ ফেব্রুয়ারি মাসটি ছিল একটু অন্যরকম। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে টিএসসিতে থাকতো আমাদের চরম ব্যস্ততা। সংগঠনের শো, রিহার্সেল, সে এক এলাহী কাণ্ড। কোনভাবে ক্লাশ শেষ করেই দৌড় দিতাম রিহার্সেল রুমে। দেরি হলেই বকুনি ছিল অবধারিত। তারপর সুযোগ পেলেই বই মেলা ঘুরে বেড়ানো। তখন বই মেলা মানেই ছিল হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, মোনজাত উদ্দীনের বইয়ের বেশ কাটতি।                                                                              

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে তখন চলতো সাংস্কৃতিকসহ নানা প্রতিযোগিতা। আবার মূল অনুষ্ঠানে নিজেদের আয়োজনের পাশাপাশি থাকতো দেশের বিশেষ শিল্পীদের অনুষ্ঠান। প্রতিযোগিতায় বিচারক হয়ে আসতেন কবি, সাহিত্যক, নাট্য ব্যক্তিত্বসহ অনেকে। এরপর ডাকসু প্রতিযোগিতাসহ আরও কত কী! দম ফেলবার জো ছিল না।

তখন কিন্তু ভালোবাসা দিবস তেমন করে পালন হতো না। ১ লা ফাল্গুনটাই ছিলো আমাদের জন্য সাজগোজের দিন। হলুদ শাড়ী, মাথায় গাঁদা ফুল আর সবার প্রিয় পিয়ারু ভাইয়ের তোলা ছবি। সবটাই ভাসির্টিকেন্দ্রিক আয়োজন। কখনো কখনো পত্রিকার পাতায় নিজেদের আয়োজনের ছবি দেখতাম, আর অন্যরকম ভালো লাগায় ভাসতাম কদিন।
এরপর ২১ ফেব্রুয়ারির আগের দিনে কালো পাড়ের সাদা শাড়ী রেডি করা নিয়ে সে কী ব্যস্ততা হলের মেয়েদের সবার। আর আমরা যারা বিএনসিসি করতাম তাদের জন্য শহীদ মিনারে থাকতো ডিউটি।

Hasina Nigar 3এখন সেই দিনগুলিকে মনে করে স্মৃতি রোমন্থন করি, আর তখন বলতাম পরের বছর আর বিএনসিসি করবো না। ২১ ফেব্রুয়ারিতে রাত জাগা আর দুপুরের পর ক্লান্ত হয়ে রুমে ফিরে লম্বা ঘুম দেয়া। ভাষা দিবসের পর সব কিছুতে যেন আলস্য পেয়ে যেত। বই মেলাতে শেষের দিকে কী কী বই কিনবো তার পরিকল্পনা। আমাদের শেষ ফাল্গুনের সেই বেলাগুলোকে তেমন করে আর ফিরে পাওয়া হবে না কোনদিন।     

সেইসাথে এখন বই মেলাসহ নানা আয়োজনে সারা শহরের মানুষের ভীড় থাকে বলে নিজেদের খুঁজে পাই না তেমন করে। তবে ভালো লাগে এক সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আয়োজন আজ সর্বজনিন রূপ নিয়েছে এই ভেবেই। বাঙালীর বাঙালিয়ানা হারিয়ে যাবার যে শংকা ছিল তা আর আছে বলে মনে করি না। তবে গত কয়েক বছরে শুধুমাত্র লেখার কারণে যেসব অমূল্য প্রাণ ঝরিয়ে দেয়া হয়েছে, তা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অপূরণীয় এক ক্ষতি হয়ে গেল। তাদের আর ফিরে পাওয়া হবে না ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি এটাও চাই না যে, আর একটি প্রাণও ঝরুক এবারের বা সামনের সব বইমেলায়, বা যেকোনো উৎসবে, যেকোনো উপায়ে। মৌলবাদীদের থাবা যেন আমাদের বাঙালীয়ানাকে আর স্পর্শ না করে।

রক্তাক্ত না হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পিচঢালা পথ। যদিও আমার নিজের ব্যক্তি জীবনে  ১৯৯১ এর বই মেলাতে ঘাতক বাস কেড়ে নিয়েছিল আমার চাচার প্রাণ। সেই থেকে বই মেলা এলেই এক ধরনের আতংক তাড়া করে আমাকে।
হল জীবনের প্রিয়মুখ যারা আমরা প্রতিটি আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলতাম, জীবনের প্রয়োজনে আজ যে যেখানেই থাকি না কেন আত্মার দিক দিয়ে আমরা সবাই তেমনি আছি। মনের কোনে এখন বাস করে আমাদের সেই দীপ্তময় তারুণ্য। ভালো থাকো জীবনের সেই প্রিয় মানুষগুলো। আর আমৃত্যু আমাদের মনের ফাল্গুন যেন জাগ্রত থাকে সে প্রত্যাশা নিরন্তর।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.