দু’টি ছবি ও ভিন্ন চিন্তা

0
Burka 1

আসল ছবি

রিয়াজুল হক: এক. প্রথম আলোকচিত্রটি আদি। দ্বিতীয় আলোকচিত্রটি কৃত্রিম। দ্বিতীয় আলোকচিত্রটি প্রথম আলোকচিত্রটির ওপর সুপার ফটোকম্পোজ করে দু’জন নারীর দু’পাশে দু’টি বস্তা বসিয়ে দেয়া হয়েছে। ইদানিং উল্লিখিত ড্রেসকোড অনুসরণ করা বহু নারীদের আলোকচিত্র সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়। কিন্তু এসব ছবি দিয়ে যা করা হয়, তা হল বিশেষধর্মের অনুসারী নারীদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো এবং ভিকটিম নারীকে ভিকটিমাইজ করা। সেইসঙ্গে নারী ও মানবমুক্তির মূল প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া।

দুই. প্রথম ছবিটি দেখার পর যে বার্তা ডিকোড করা যায়, তা হল দু’জন নারী তাদের স্ব স্ব ধর্মের ড্রেসকোড অনুসরণ করছেন। যখন ভাবা হয় তারা স্ব স্ব ধর্মের ড্রেসকোড অনুসরণ করছেন, তখন তার পেছনে দু’টি কার্যকারণ দাঁড়ায়। হয় তারা সাদরে এই ড্রেসকোড গ্রহণ করেছেন, অথবা তারা বাধ্য হয়েছেন এই ডেসকোড অনুসরণে। আবার যখন ভাব হয়, তারা সাদরে এই ড্রেসকোড গ্রহণ করেছেন, তখন ভাবা যেতে পারে সামাজিকায়ন প্রক্রিয়ায় তাদেরকে এই ড্রেসকোড গ্রহণের সহায়ক মনস্তত্ত্ব তৈরি করা হয়েছে। এই মনস্তত্ত্বের পেছনের দর্শনটা হল পুরুষতান্ত্রিক। যেখানে শরীরকে বিশেষভাবে অর্থাৎ যৌনবস্তু হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে। একইসঙ্গে আছে শরীরকে নিজের (পুরুষের) সম্পত্তি হিসেবে দেখার দর্শন। এখানে আবার যৌনতা ও ব্যক্তিগত মালিকানাবোধ মিলেমিশে গেছে। এই দর্শনের যথার্থতা তৈরি করা হয়েছে ভাল বা ধার্মিকনারী-মন্দনারী, পাপ-পূণ্য এবং পরকালে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দ্বারা।

তিন. নারীর ওপর এই ড্রেসকোড বা অন্যকোনো কোড কি শুধু বিশেষ ধর্মে আছে? অবধারিতভাবে উত্তরটি হল না। এটি সমাজে বিদ্যমান সব ধর্মেই আছে বিভিন্ন প্রকরণে, বিভিন্ন প্রতীকে, বিভিন্ন বস্তুতে, যা নারীর পরিচিতি, পোশাক, সাজসজ্বা, অলংকার, সচলতা, স্বাধীনতা, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। মনে রাখা জরুরি, আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে-বিশ্বে সব ধর্মই প্রতিষ্ঠান হিসেবে নারীর ওপর অবরোধ ও অধঃস্তনতা তৈরি, পুনঃতৈরি, সঞ্চালন ও যথার্থতা তৈরিতে ক্রিয়াশীল।

Burka 2

ফটোশপ করা ছবি, এখানে বোরকায় আবৃত নারীকে বস্তার সাথে তুলনা করা হচ্ছে

আরো ভাবা দরকার যে, এটি শুধু প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্ম নয়, সমাজের সব প্রতিষ্ঠানই (এমনকি রাষ্ট্রও, কারণ রাষ্ট্রও একটি প্রতিষ্ঠান) পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অধঃস্তনতা তৈরিতে।

চার. পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটি আধিপত্যশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্মকে (সকল ধর্ম) না দেখে, যখন শুধু বিশেষ একটি ধর্মের অনুসারী নারীদের ড্রেসকোডকে সামনে আনা হয়, এবং সেই নারীকে বিভিন্ন উপমায় (মেটাফোরে) বিশেষায়িত করা হয়, তখন তা বিদ্যমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি-অর্থনীতির খেলায় অংশগ্রহণ করা হয়। যে ভূ-রাজনীতি-অর্থনীতির খেলার লক্ষ্য নারী মুক্তি নয়, বরং পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদমালার ওপর দখলদারিত্ব তৈরি এবং উদ্বৃত্ত শোষণ।

ভৌগলিকভাবে বিন্যস্ত প্রাকৃতিক সম্পদমালার মানচিত্র এমনভাবে বর্তমান যে, যেসব রাষ্ট্রের সীমানায় মধ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে ফসিল ফুয়েল রয়েছে, সেসব রাষ্ট্রে বিশেষধর্মের অনুসারীদের বসবাস বেশি। তাই সেই বিশেষ ধর্ম এবং তার অনুসারীরা হয়ে দাঁড়ায় বিশেষ লক্ষ্য। একইসঙ্গে মনে রাখা দরকার, বিশ্বজুড়ে উদ্বৃত্ত শোষণের এবং প্রাকৃতিক সম্পদমালার ওপর দখলদারিত্বের ভূ-রাজনীতি-অর্থনীতি খেলায় সবচেয়ে বড় শিকার কিন্তু নারীরা। তাদের ওপর এর অভিঘাত সবচেয়ে বেশি।

পাঁচ. দ্বিতীয় ছবিতে (কৃত্রিমভাবে তৈরি) নারীর ওপর প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্মের অবরোধ-নিয়ন্ত্রণ-এর চেয়ে ব্যক্তি নারীকে বস্তার মেটাফোরে দেখাটাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মানে ভিকটিম নারীকে (পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আরোপনের শিকার অর্থে) আবার ভিকটিমাইজ করা হচ্ছে। তার মানবীয় সত্ত্বাকে অস্বীকার করে শরীর ও তার অনুসরণকৃত ড্রেসকোডকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

ছয়. আমাদের কাছে কোনটি জরুরি? ১. পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নারীর ওপর বিভিন্ন ধর্মের অবরোধ-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, না কি ২. পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপিয়ে দেয়া অবরোধের ও নিয়ন্ত্রণের শিকার অধঃস্তন নারীদের পোশাকে ঢাকা মানবীয় সত্ত্বাকে উপেক্ষা করে তাদেরকে বস্তার রুপক ভাবা ও দেখা? সেইসঙ্গে অধিপত্যশীল বিশ্বশক্তির ভূ-রাজনীতির খেলায় অংশগ্রহণ করা?

আপনি নিশ্চয় একমত হবেন, জরুরি হল প্রথম প্রশ্নটি তোলা এবং এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। একইসঙ্গে এ আলোচনায় সেইসব নারীদের অংশগ্রহণের স্পেস তৈরি করা, যারা চাপিয়ে দেওয়া ড্রেসকোড মেনে নিয়েছেন, বা মানতে বাধ্য হয়েছেন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.