সাংবাদিকতায় ‘মাতৃত্ব’ যখন অপমানিত

2

Pregnant 1প্রভাষ আমিন: দুদিন আগে আমার এক সাবেক নারী সহকর্মী এসেছিলেন বাসায়। একসময় রিপোর্টিং করতেন। পরে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদভিত্তিক চ্যানেলে বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বছরখানেক আগে মা হয়েছেন। তারপর হুট করে চাকরি ছেড়ে দেন।

মা হওয়ার পর ফেসবুকে তার যে উচ্ছ্বাস, মেয়েকে নিয়ে যে আদিখ্যেতা; আমি ভেবেছি, মেয়েকে বেশি করে সময় দেয়ার জন্যই বুঝি চাকরি ছেড়েছেন। সেদিন আসার পর একটু বকাই দিলাম, চাকরি ছাড়লেন কেন? তারপর তার কাছ থেকে যা শুনলাম, বিস্ময়ে আমি থ। তিনি চাকরি ছাড়েননি, আসলে ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

তার দাবি, চাকরিটা তার আরো অনেক আগেই ছাড়া উচিত ছিল। তার কথা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি, ভেবেছি, চাকরি ছাড়ার ক্ষোভ থেকে বাড়িয়ে বলছেন। তিনি অসত্য বলছেন, এটা নিশ্চিত করার জন্য এখনও কাজ করছেন, এমন অনেকের সাথে কথা বললাম। সবাই নতুন নতুন তথ্য যুক্ত করলেন। অবিশ্বাসে আমার রীতিমত কান্না পাচ্ছিল।

সবগুলো অভিযোগ সত্যি হলে, সেই সংবাদভিত্তিক চ্যানেলের নিউজরুম নারীদের জন্য ভয়াবহ নির্যাতন কেন্দ্র। অথচ সেই নিউজরুমের নীতিনির্ধারকরা সবাই সুশীল হিসেবে পরিচিত, প্রতিদিন টক শো করেন, জাতিকে জ্ঞান দেন। কিন্তু অফিসে তারাই ভয়াবহ নারী বিদ্বেষী, নির্যাতনকারী।

সেই সহকর্মী বললেন, প্রথমবার গর্ভধারণের পর তিনি অফিস থেকে নাইট এবং ভোরের ডিউটি অফ চেয়েছিলেন। তাদের যা লোকবল, তাতে সেটা সম্ভবও ছিল। কিন্তু তাকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। নিউজ চ্যানেলের ডিউটি সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই, তাদের জন্য বলি, ভোরের ডিউটি শুরু হয় ভোর ৬টায়। আর ৬টায় অফিস করতে হলে তাকে অন্তত ৫টায় উঠতে হয়। একজন প্রসূতির জন্য এটা ভয়ঙ্কর শাস্তি। আর নাইট ডিউটি মানে রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা। সাধারণত রাতে নিউজরুমে ২/৩ জন লোক থাকে।

সাধারণ সময়ে নারী সহকর্মীরা এখন সব চ্যানেলেই নাইট ডিউটি করেন। কিন্তু একজন প্রসূতির জন্য সেই বিরান নিউজরুম একটি আতঙ্কের ক্ষেত্র। তিনমাস পর তার গর্ভপাত হয়ে যায়। পরে আবার তিনি গর্ভধারণ করেন। কিন্তু আবারও নাইট এবং ভোরের ডিউটি অব্যাহতি চেয়েও পাননি তিনি। বরং তাকে বলা হয়েছে, আপনারা বারবার অসুস্থ হলে অফিস চলবে কিভাবে?

ছয়মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে মা হয়ে অফিসে যোগ দিয়ে দেখেন, তার প্রতি অফিসের মনোভাব আরো কঠোর। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে চাকরিটা ছেড়ে দেন তিনি। শুধু তিনি নন, মা হওয়ার পর অপমান সইতে না পেরে চাকরি ছাড়ার অারো উদাহরণ আছে সেখানে। উপায় নেই বলে দুয়েকজন সব অপমান মুখ বুজে সয়ে চাকরি করছেন। মা হওয়ার পর চাকরি ছাড়তে বাধ্য হওয়া কেউই তাদের বেতন থেকে কেটে রাখা প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পাননি। উল্টো অফিস, মাতৃত্বকালীন ছুটির পর অন্তত তিনবছর চাকরি না করায় সেই ছুটির সময়কার টাকা ফেরত চেয়েছে। তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দেয়া তো হয়ইনি, উল্টো অফিসের হিসেবে তারা দেনাদার।

তার কাছ থেকে শুনলাম, সেই অফিসের একজন পুরুষ বার্তা সম্পাদক অপর এক গর্ভবতী সহকর্মীকে প্রকাশ্য নিউজরুমে সবাইকে শুনিয়ে ধমক দিয়ে বলেছেন, আপনারা দুদিন পরপর পেট বাধিয়ে আসলে অফিস চলবে কিভাবে? এই কথা বলার পরও সেই বার্তা সম্পাদক এখনও বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের অফিসে নিয়ম হলো, দুই বাচ্চার বয়সের ব্যবধান অন্তত চারবছর না হলে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন না বা চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।

P{robhash

প্রভাষ আমিন

দেশের সবচেয়ে সচেতন পেশাজীবীদের একটি কর্মক্ষেত্র নারীদের জন্য এতটা বিপদজনক, এটা এতবার শোনার পরও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। বাংলাদেশে সব পেশায় এখন নারীরা পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন। ব্যতিক্রম নয় সাংবাদিকতাও। নারীরা রিপোর্টিঙে, নিউজরুমে, ক্যামেরায়, ভিডিও এটিডিঙে সমানতালে কাজ করছে। অনেক নিউজরুমে নারীরাই নেতৃত্বে। এমনকি যে অফিসের কথা বলছি, সেখানেও দায়িত্বশীল পদে নারীরা আছেন।

অামার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো নারীরা অনেক বেশি সময়ানুবর্তী, দায়িত্বশীল, কর্মঠ, পরিশ্রমী। আর গর্ভধারণ নারীর কোনো অসুস্থতা নয়, এটা আনন্দের উপলক্ষ্য। পুরুষের চেয়ে নারী শ্রেষ্ঠ, কারণ তিনি গর্ভধারণ করতে পারেন। নারীতেই সভ্যতার বিকাশ, অগ্রগতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ ও নমাজ  এখনও পুরুষশাসিত। কিন্তু পুরুষশাসিত হলেই নারী বিদ্বেষী হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং যতদিন মর্যাদার সমতা না আসবে, ততদিন  পুরুষশাসিত সমাজও নারীর প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে। সংবেদনশীলতার হাত ধরেই আসবে সমতা।
অনেকে পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন, আপনিও তো একটি নিউজ চ্যানেলে কাজ করেন, আপনাদের ওখানে কী অবস্থা?

আমাদের নিউজরুমের প্রধান একজন নারী এবং নিউজরুমও নারী অধ্যূষিত। আমি দাবি করে বলতে পারি, আমাদের নিউজরুম নারীর প্রতি সংবেদনশীল। আমাদের নিউজরুমে প্রসূতি মায়েদের প্রতি বাড়তি সংবেদনশীলতা দেখানো হয়। প্রত্যেক মা’ই আমাদের অফিসে উৎসব বয়ে আনে, বিরক্তি নয়। বাংলাদেশের সব অফিস নারীদের প্রতি, মায়েদের প্রতি সংবেদনশীল হবে, এই প্রত্যাশা কি খুব বাড়তি কিছু?

প্রভাষ আমিন
[email protected]

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,২১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.