অটিজম, আমরা এবং রাষ্ট্র

Autism 1তামান্না ইসলাম: ফেসবুক আমাদের এক বিভ্রান্তকর ফেস দেখায়। কারো ওয়াল বা পোস্ট দেখে তার মানসিকতা সম্পর্কে কিছুটা আঁচ পাওয়া গেলেও জীবন সম্পর্কে ধারণা কমই মেলে।

একটা গল্প বলি। আমার স্কুলের এক জুনিয়র মেয়ে, তার সাথে আমার বহু বছর কোন  যোগাযোগ নাই। খালি মনে আছে বেশ ভাল ছাত্রী ছিল, দেখতে সুন্দরী। ওর বান্ধবীদের মাধ্যমে খবর পেয়েছি সে পেশাগতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত, প্রবাসী। তারপর অনেক বছর পরে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ হলো। আমি ওর আর ওর পরিবারের ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। ফুটফুটে তিন সন্তান। মেয়েটি যেমন সুন্দরী ছিল, তেমনই আছে, বরও অনেক সুদর্শন।

আমাকে যেটা সবচেয়ে বেশী অবাক করতো সেটা হলো ওদের প্রাণশক্তি আর অসংখ্য গুণাবলী। নাচ, গান, নাটক এহেন কিছু নাই যে তারা স্বামী, স্ত্রী এবং গোটা পরিবার করে না। অসাধারণ সব ভ্যাকেশনের ছবি।

দেখলেই বোঝা যায় যে সব কিছুর পেছনেই ব্যাপক আয়োজন। হয়ত ডিজনিতে বেড়াতে গেছে, পরীর মত মেয়েগুলোকে প্রিন্সেস সাজিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা যারা বাইরে আছি পরিবারের কোন সাহায্য ছাড়া, চাকরিজীবী মা, আমরা জানি ব্যাপারটা কতো কঠিন।

যাই হোক, এই ফেয়ারি টেল পরিবারের মা একদিন একটি পোস্ট দিল, তার বড় মেয়ের জন্মদিনে। অনেকেই দেয় নিজের নিজের বাচ্চার জন্মদিনে। এ আর এমন কি?

পার্থক্য হলো, সেই পোস্টটি পড়ে অতি বড় পাষাণও সেদিন কেঁদেছিল। সেই পোস্টে এক মায়ের গল্প ছিল, যার বড় মেয়েটি অটিস্টিক। আমি কতক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসেছিলাম যে এই দেবশিশুর মতো মেয়েটি যার হাসা, খেলার ছবি দেখে আমি প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হই, যার মা-বাবার প্রাণ চাঞ্চল্য আমাকে মুগ্ধ করে, তারা আসলে প্রতিদিন কী বিরাট এক যুদ্ধ করে যাচ্ছে! ফেসবুক ছবির সদা হাস্যময়ী মা’টি সেদিন সেই যুদ্ধের গল্প বলেছিল।

আমার মনে আছে, এক বান্ধবীর আলট্রাসাউন্ড এর রিপোর্ট দেখে আমেরিকান ডাক্তার যখন বলেছিল, তোমার রিপোর্টে একটা লাইন একটু বেশী সাদা, শতকরা ৫ ভাগ চান্স আছে তোমার বাচ্চা অটিস্টিক হবে, আমার বান্ধবী সেদিন মানসিকভাবে ভেঙ্গে খান খান হয়ে গিয়েছিল।

কী করবে সে? একটা অটিস্টিক বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনা মানে সেই বাচ্চার সাথে সাথে বাবা- মা এর জীবনে এক বিরাট কষ্টকে ডেকে আনা। উপরন্ত বাচ্চাটির ভবিষ্যৎ কী?

বাবা-মা না থাকলে তার কী হবে? সে কি এই ভয়ঙ্কর ঝুঁকির ৫% কে উড়িয়ে দেবে, নাকি ৯৫% সম্ভাবনার সুস্থ বাচ্চাটিকে পৃথিবীর মুখ দেখতে দিবে না? বাচ্চার জন্ম না হওয়া পর্যন্ত টেনশনে অস্থির হয়ে গিয়েছিল সে। বিদেশে তবু অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে ওদের জন্য, অন্তত শেষ সহায় রাষ্ট্র, কিছুটা হলেও দায়িত্ব নেবে বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে। দেশের চিত্র তো সেরকম না।

কয়েক বছর আগে দেশে বেড়াতে গিয়ে আমরা স্কুল কলেজের কিছু বান্ধবী একসাথে হয়েছিলাম। কিছুক্ষণের জন্য আমরা একদম সেই আগের দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছি। তারপর যা হয়, আস্তে আস্তে বাচ্চা, সংসারের গল্প উঠে যায় কেমন করে যেন।

সেদিন জানা গেল, আমাদের দশ জনের মধ্যে পাঁচ জনের বাচ্চারই অটিজম আছে। এদের মধ্যে আবার দুই জন ডাক্তার। আমার এই দুই ডাক্তার বান্ধবী ছিল আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দুষ্টু, হাসাতে হাসাতে পেটে খিল ধরিয়ে দিত। নিজের বাচ্চাদের নিয়ে অপরিসীম কষ্ট আর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাতে কাটাতে হারিয়ে গেছে ওদের সব হাসি, আনন্দ, দুষ্টামি। বাসা, আর কাজে আটকে গেছে ওদের জীবন, এই বাচ্চা রেখে কোথাও যেতে পারে না, এমনকি কাজের পরিধিও অনেক কমিয়ে ফেলেছে, কোনরকমে টিকিয়ে রেখেছে কাজ।

অটিস্টিক বাচ্চার দেখাশোনা করতে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের দিকে খেয়াল করতে পারে না। নিজের জীবন বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। আমি ভাবছিলাম দেশে কি অটিজম বেড়ে গেছে? খাবারের ভেজালের জন্য? দুষিত পরিবেশ? আসল কারণটা কি? নাকি আগেও ছিল এমনই,  ঠিকভাবে সনাক্ত হয়নি? এদের স্পেশাল শিক্ষার কোন ব্যবস্থা আছে এখন দেশে? থাকলে খরচ কেমন? নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের নাগালের মধ্যে?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.