একা এবং একাকিত্ব

Nodiহাসিনা আকতার নিগার: পৌষের হিম হিম শীতে কেন জানি ভারী ভারী ভাবনাগুলো ভাবতে মন চাইছে না। তবু কেন জানি মনের কোনে উঁকি দেয় নানা কিছু। হয়তোবা বাস্তবতার টানাপোড়েনে জীবনটা এতোটাই নিরেট হয়ে গেছে যে, মনের আবেগ, অনুভূতি কিংবা কল্পনাবিলাসী মনটা হারিয়ে গেছে নিজের অজান্তে।  

আজকাল নিজের জন্য খুব বাঁচতে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে, অনেক তো হলো এবার না হয় নিজের জন্য নিজের মতো করে বাঁচি। একার জীবনের এমন ভাবনাগুলো শুধুই তার নিজের সাথে বলা। রাতের অন্ধকার নেমে এলে আকাশের মিট মিট তারাগুলো হয়তো বা মনের কথাগুলো বুঝে কিংবা বুঝে না। কিন্তু আবার রাত পোহালেই সেই অফিস, সেই কাজ আর জীবনের অনুষঙ্গগুলো তাড়া করে ফিরবে একাকে।
একার একাকিত্ব জীবনের গল্পটা সমাজের সাধারণ নিয়মের নয়। আবার এমন গল্প তার একান্তই নিজের, তাও নয়। সমাজের কিছু নিয়ম অনুশাসনকে প্রতিবাদ করে নিজের জীবন সংগ্রামের লড়াইটা সে শুরু করেছে তারুণ্যময় জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সংসারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে। আর সে পথটা তখন যেমন কন্টকময় ছিল আজো তেমন আছে।

আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষ ঘর ভেঙ্গে একা হলে তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু নারী যখন হয় একা তখন যেন সকল দোষ তার। এখানেই শেষ নয়। পরিবার থেকে শুরু করে  জীবনের সকল ক্ষেত্রে আজো নারীকে পড়তে হয় নানা প্রতিকূলতাকে।  

একা আজকাল আর এসব নিয়ে ভাবে না। একজন নারীকে প্রতিনিয়ত উত্তর দিতে হয় ‘আপনার স্বামী কি করে কিংবা সন্তানের বাবা কোথায়’।

আর যখন একার মতো নারীরা বলে আমি আমার মতো থাকি। ঠিক তখনই যেন বিষম খেয়ে যান প্রশ্নকারী। এমনও দেখা যায় অনেকে আবার এক ধরনের সহানুভূতি দেখবার বাহানা খুঁজে। এক সময় বেশ বিরক্তি হতো একার এসব দেখে। এখন মনে হয় এটাই পুরুষশাসিত সমাজের ধরন।

একাকি জীবন বলেই এ সমাজের অনেক কিছু সে চিনতে পেরেছে, জেনেছে একা মানুষের সংগ্রাম কেমন। যদিও এ জীবনের শেষটুকু তার জানা নেই। হয়তো মৃত্যুতেই তার অবসান হবে।
কিন্তু জীবনের পথ চলাতে ‘আমার আমি’ কে আবিষ্কার করার এই মনোবাসনা অপূর্ণ রেখে পৃথিবীকে বিদায় নিতে চায় না একা।

পার্থিব সংসার জীবনে নিজের জন্য যখন কিছুদিন থাকার ইচ্ছা পোষণ করল তখন সে দেখে, এতোটাই একা সে, তার আশপাশে সত্যিকারের আপন কেউ নেই। কিন্তু এতোদিন মনে হতো, কতজনই না তার জন্য আছে। যখন একান্ত মনের অনূভূতি নিয়ে কিছু প্রিয় মানুষের কাছে হাতটা বাড়িয়ে দিলো, ঠিক তখনই  জানলো, কাউকে আপন করার সময় তার ফুরিয়ে এসেছে। সবাই যে বড় ব্যস্ত আপন জগতে। তার প্রতি যে দরদের আকুলতা তা বড্ড বেশী সাময়িক।
একার মন চাইছে সমস্ত যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নিয়ে সেই ছোটবেলার স্বপ্নকে আপন করে মুক্তচিত্তে পাহাড়, সমুদ্র বা অরণ্যে ঘুরে আসতে। কিন্তু এমন কল্পনার জগতে নাও ভাসাতে যে মানুষটি তার পাশে থাকবে বলে তার বিশ্বাস ছিল, সে আজ বলছে , ‘একা, এ তোমার কেমন পাগলামি।’  অথচ কত না দিন তারা গল্প করেছে এমন একটি সময়ের জন্য। ছিল না কোনো শর্ত কিংবা নিয়মের বাঁধন। তবে আজ কেন একা পাবে না তার নিজের জন্য একটু সময়?
এমনি ভাবনাতে একার নিস্তব্ধ ঘরে রাতের আঁধারে কেটে যায় একাকি জীবনের আরো কিছু সময়। এক জীবনের একাকিত্ব সমাজের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ বা কটাক্ষ হয়। আরেক জীবনের একার একান্ত সময়ের একাকিত্ব শুধুই তার। তবে কি একার একাকিত্বের গল্পটা তার নিজের হয়েই থাকবে? যার সাক্ষী সে শুধু নিজেই!

আপন মনের এই প্রশ্নের উত্তর যেন তাকে বলে দিচ্ছে ‘ একা তোমার এই একাকিত্বই হলো  – আমার আমি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.