এখনো বনের গান বন্ধু হয়নিকো অবসান- ১

Meye 2লীনা হাসিনা হক: ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ, ২০১৫।  সকাল প্রায় নয়টা বাজে, আমার হেল্পিং হ্যান্ড সাহেরা এখনো আসে নাই, উঠতে ইচ্ছে করছে না, যদিও এক কাপ কফির জন্য প্রাণ কুই কুই করছে। কানে এলো খুটখাট শব্দ, খাবার টেবিলে কেউ কিছু করছে। সারা বাড়িতে আমি আর কন্যা, প্রায় ২৪ ঘন্টার উড়াল যাত্রার ধকল, টাইম জোনের বৈপরীত্য ইত্যাদিতে সে তো এখনো জেট ল্যাগই কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ঝকঝকে রোদ্দুরভরা এই সকালে চোর আসবে বলেও মনে হচ্ছে না!

গলা তুললাম বিছানা থেকেই, কন্যার উত্তর, আমি, চানাচুর খাই!!!!

এই সকালে চানাচুর কেন? বিস্কুট আছে, পাউরুটি আছে, ডিম সেদ্ধ বা পোঁচ অথবা দুধে ভিজিয়ে কর্ণ ফ্লেক্স বা মুসলি খেতে পারো, নিদেন পক্ষে খেজুরের গুড় দিয়ে মুড়ি বা চিড়া ভাজাও চলে, কিন্তু চানাচুর?

না, তার প্রাণ চেয়েছে চানাচুর খেতে এই সাত সকালে! আহারে যাদু আমার! ছেলের কাছে গেছিলাম যখন, দেখেছিলাম, ছোট এক প্যাকেট প্রাণের চানাচুর প্রায় যক্ষের ধনের মতন একটা কৌটাতে যত্ন করে রেখেছে, কারণ ২৫০ গ্রামের ঐ প্যাকেটের দাম চার মার্কিন ডলার, মানে বাংলা টাকায় ৩২০ টাকা। চোখ ভিজে উঠেছিলো, আমার অবশ্য সন্তানদের যে কোন বিষয়েই চোখ ভিজে উঠে। তাও আবার পাঁচ-পাঁচবার সার্জারি হওয়া খানদানি চোখ কিনা!
আমার দুটি সন্তানই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়ে। পুত্র নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করছে নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আর কন্যা আন্ডারগ্রাজুয়েশন শুরু করেছে এই বছরের সেপ্টেম্বরে মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, অর্থনীতিতে।

কন্যাকে তার ইউনিভার্সিটিতে দিয়ে আসতে আমিও সাথে গিয়েছিলাম। এতো তাড়াতাড়ি তার আসার কথাও নয়, আর আমারও অঢেল অর্থপ্রবাহ নাই যে পাঁচ মাসের মাথায় বিশাল অংকের টাকা দিয়ে টিকিট কেটে মাত্র ২০ দিনের জন্য দেশে ছুটি কাটাতে নিয়ে আসবো কন্যাকে।

Leena wid chilfren
ছেলে এবং মেয়েসহ ডানদিকে লীনা হাসিনা হক

তবে ঐ যে কথায় কথায় কারণে- অকারণে ভিজে ওঠা চোখের সাথে বেআক্কেলে আবেগী হৃদয়ও একটা আছে যা কিনা কোন যুক্তি তর্কের ধার ধারে না, বিশেষত সন্তানদের বেলায়।
সেপ্টেম্বরের ১৯ তারিখে যখন জেএফকে এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি চেক ইনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মজকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিচ্ছিলাম, পাশ দিয়ে চলাচলকারী এমন কোনো যাত্রী বা এয়ারপোর্টের কর্মচারী ছিলো না যে কিনা আমার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নায় একবারও নজর ফিরিয়ে তাকায়নি!

আমার গর্ভজাত আমার রক্ত মাংসের অংশ আমাকে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে মৃদু স্বরে বলে চলেছিল, মা, এইতো আর কয় মাস পরেই তুমি আবার আসবে। মা, কেঁদো না, লম্বা ফ্লাইট শরীর খারাপ করবে, মা, আর দু’তিন বছর পরে আমরা তিনজন আবার একসাথে থাকবো। মা শান্ত হও। মা তোমায় ভালবাসি। ভালবাসি মা তোমাকে। ওই সময়ের জন্য আমি যেন ওর মেয়ে হয়ে গিয়েছিলাম।
এইতো সেদিন যেন ছেলেটি জন্ম নিলো শেষ পৌষের তীব্র ঠাণ্ডা মধ্য দুপুরে। প্লাসেন্টা আটকে গিয়ে মরতে বসেছিলাম প্রায়, কিন্তু মরিনি। মেয়ে জন্মেছিল আশ্বিনের শেষে এক ভ্যাপসা গরম ঝিরঝিরে বৃষ্টি ভেজা মধ্য রাতে। মেয়ের জন্মের সময়ে গর্ভের জলের থলে ভেঙ্গে সব গর্ভজল বের হয়ে গিয়েছিল, মেয়ে পেটের মধ্যে উল্টে গিয়ে প্লাসেন্টা তার গলায় জড়িয়ে গিয়েছিলো। নিজের অপারেশন করার সম্মতিপত্রে নিজেই সাক্ষর করে ডাক্তারকে বলেছিলাম, শুধু সন্তান নয়, আমি নিজেও বাঁচতে চাই। রক্তপাত বন্ধ হচ্ছিল না, বোন, ভাই, তাদের বন্ধুরা মিলে রক্তের ব্যবস্থা করেছিলো। ডাক্তার আর আমার নিয়তি আমায় আবার এই পৃথিবীর আলো দেখতে সহায়তা করেছিল।  

আচ্ছা, আমার ছেলে-মেয়ে দুটোই ভারী অদ্ভুত সময় বেছে নিয়েছিলো একজন দিনের মধ্যভাগ আরেকজন রাতের মধ্যভাগ। আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম কার্তিকের শেষে এমন সময়ে যখন সূর্য পাটে বসেছে আর চাঁদ উকি দিচ্ছে। নিজের মাকে প্রায় মারতে মারতে আর নিজেও মরতে মরতে পৃথিবীতে এসেছিলাম। নেহায়েত পিতৃদেব এবং মাতামহ দুজনেই চিকিৎসক বলে যার যার স্ত্রী এবং কন্যাকে বাঁচানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করে সফল হয়েছিলেন।

সেই সূত্রে আমিও বেঁচে-বর্তেই পৃথিবীর হাওয়ায় শ্বাস নিয়েছিলাম। ভালোই তো। যেমন মা, তেমন ছা! এই ধুলো ময়লা রোদ বৃষ্টি ঠাণ্ডা ঝড় বাদল তুষারপাত বন্যা অমাবস্যা আর পূর্ণিমার পৃথিবী আমাদের তিনজনকেই বড্ড টানে। জীবনকে বড্ড ভালবাসি আমি এবং আমার আত্মজরাও তাই।
আমরা যেনো একটু অদ্ভুতও আছি। আবেগের বশে পুত্রের সাথে কথা বলতে বলতে দুজনে মিলে মেয়ের দেশে ফেরার টিকিট কিনি দামের পরোয়া না করে থ্যাঙ্কস গিভিংএ সারপ্রাইজ গিফট দিবো বলে, সেই ছেলে আবার চার ডলারের চানাচুর কৌটোয় ভরে আলমারিতে তুলে রাখে, আর আমি নিজে এয়ারলাইন্সের দেয়া ফুড ভাউচার দিয়ে দুবাই এয়ারপোর্টের সিলেক্টেড খাবারের দোকানের জঘন্য স্বাদের বিফ বার্গার, সাথে আরও জঘণ্য স্বাদের পেপসি দিয়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাই, কিন্তু ২০ ডলার পকেট থেকে খরচ করে পছন্দমতো খাবার কিনি না! পাঁচ অংকের টাকা দিয়ে নাইকি’র স্নিকার কিনি মেয়ের জন্যে, কিন্তু ৩০০ টাকা দিয়ে স্লিপার কিনতে এমন খচ খচ করে যেন ব্যাঙ্করাপ্ট হয়ে যাচ্ছি। এমন কেনো আমরা! অদ্ভুতুড়ে!  
আমার নিজের বয়স তো অর্ধশতক হতে চলল, জীবনে কতো সার্কাস যে দেখলাম। নিজেও তো সার্কাস কিছু কম করি নাই। এখনতো পুত্র কন্যাসহ করে যাচ্ছি। সবই ভালো লাগে। সময়ে কষ্ট পাই, বেদনা হয়, চেনা মানুষ অচেনা হয়ে যায়, কোনো কোনো মাসের শেষে ব্যাঙ্কের একাউন্ট জিরো ব্যালান্স শো করে ভেংচি কাটে। তখন মনে হয়, ভাগ্যিস ক্রেডিট কার্ড নামের আলাদিনের চেরাগ ছিলো। কিন্তু কখনো মনে হয় না জীবনের গান শেষ হয়েছে। বরং এ যেনো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্রীর যন্ত্র সুরে তালে লয়ে বেঁধে নেবার প্রস্তুতিকালীন বিরতি।

মেয়ে এসেছে মাত্রই ২০ দিনের জন্য, এর মধ্যে চলেও গেছে কদিন। এই দিনগুলোর পায়ে যেন স্কেটিং স্যু। পাল্লা দিয়ে দৌড়ুচ্ছে। এবার চলে যাবার পরে আবার জুনের আগে তার বা তার ভাইয়ের দেখা পাবো না। আটলান্টিকের দুই পাড়ে আমরা তিনজন। যখন আমার দিনের শেষ, তখন ওদের শুরু। ফোনের ঘড়িতে তাদের টাইমও সেট করে রেখেছি। রেগুলার ফোন, স্কাইপ, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো হেন যোগাযোগ মাধ্যম নাই যা আমার ফোনে ইন্সটল করা নাই। তারপরেও সময়ের হিসাবে, দূরত্বের হিসাবে তারা আমার থেকে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটারের দূরত্বে। চোখে দেখি, স্বর শুনি, স্পর্শ করতে পারি না। কিন্তু তাদের গায়ের ঘ্রাণ আমি পাই।  
দিনের শেষে অন্ধকার ঘরে তালা খুলে ঢুকি যখন, একা থাকি, কিন্তু একাকি নই। মেয়ের রুমে উঁকি দিলে সে বলে উঠে, মা, আমাকে চানাচুর দাও খেতে।
ছেলের ঘরে যাই, সে মায়া ভরে জিজ্ঞেস করে, মা, কিছু বলবে?
ভাবি, তাদের নিজের জীবন হবে, অনেক পরিশ্রমী তারা দুজনেই। জীবনে লক্ষ্য স্থির করেছে তারা, দৃঢ় পায়ে সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে, মায়ের মতন এলোমেলো নয় মোটেও! সফলতা পাবে তারা। তাদের জীবনসাথী হবে, চমৎকার মনের সাথী পাবে তারা। তাদের সন্তানরা পৃথিবীতে আসবে, যেমন এসেছিলো তারাও, তাদের সন্তানেরা কেউ মধ্য রাতে, কেউ বা ভর দুপুরে কেউ হয়তো পিতামহী বা মাতামহীর মতন সাঁঝের মুখেও এই পৃথিবীতে পদার্পণ করতে চাইবে। ভারী ভালো লাগে ভাবতে। বেঁচে থাকতে বড্ড ভালো লাগে গো।
এখনো বনের গান বন্ধু হয়নিকো অবসান…

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.