আমার জীবনের টুকরো কিছু গল্প

Friendsসুমন্দভাষিণী: আজ ২০১৫ সালের শেষদিন, অর্থাৎ ৩১শে ডিসেম্বর। প্রতিটা বছরই শুরু হয় প্রত্যাশা নিয়ে, স্বপ্নপূরণের স্বপ্ন নিয়ে, ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্তির অভিপ্রায় নিয়ে। আমরা সবাই চাই, চলে যাওয়া বছর যেন কোনোরকম ছাপ না ফেলে নতুন অনাগত বছরে। কাউকে যেন না হারাই, কেউ যেন ভুল না বোঝে, যেন ভালভাবে থাকি সবাই। ভালবাসায়, ভাললাগায় মাখামাখি হয়ে।

আসলে কী হয়? হয় না। আবার কিছু যে হয় না, তাও না। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মাঝ দিয়েই আমরা বয়ে চলি নিরন্তর। নতুন মানুষ আসে, নতুন ইস্যু আসে, নতুন জীবন আসে, আমরা হাসি, আমরা কাঁদি, একে-অন্যকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার আশা করি। এই তো। মূল কথা এটাই।

তবে জীবন যাদের শুরুর পর্যায়ে তাদের নতুনত্ব অনেক থাকে, আমরা যারা মধ্যবয়সে এফোঁড়-ওফোঁড় করছি, তাদের নতুন কমই হয়। শুধুমাত্র্র জোয়ার-ভাটায় ভাসতে ভাসতে আমরা বয়সী জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি, যেখানে থাকে না পাওয়ার কষ্ট, আবার সব ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ানোর আনন্দও। কতো কী!

২০১৫ শুরুটা কেমন হয়েছিল মনে নেই। আজকাল অনেক কিছুই মনে থাকে না। এটাও তেমনই। একটা সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়ার সময় এই দিনটা ছিল জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। প্রেসিডেন্ট তার বার্ষিক ভাষণ শেষ করতেন নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে, লোকজন অধীর আগ্রহ নিয়ে সেই ভাষণ শুনতেন, সেজে-গুজে, যেন সেই ভাষণ না শুনলেই না। আসলে ওই যে নতুন বছরের শুভেচ্ছার সাথে সাথে খোলা হতো শ্যাম্পেনের বোতল, সেখানেই মজাটা লুকানো থাকতো। আধাভেজা হয়ে সবাই গ্লাসে গ্লাসে ঠোকাঠুকি করে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতাম।

এখনও কোথাও কোথাও ঠোকাঠুকি হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে সেদিনের প্রাণ আর থাকে না। সমাজতন্ত্রের প্রাণই আলাদা। মানুষের মনের মাঝে যখন পূজিঁবাদ চরমভাবে প্রোথিত থাকে, সেখানে সাম্যবাদ আর আশ্রয় পায় না। ফলে ঠোকাঠুকিও সমান হয় না, কেমন যেন বিভেদ থেকেই যায়। শ্যাম্পেনের বোতল শেষ হলে আরও কতো বোতল আসতো, থাকতো নানান পদের খাবার। বাইরে তখন মাইনাল ডিগ্রি তাপমাত্রা। এর মাঝেই দেখা যেতো, একেকজন বীর পুরুষ শুধু শার্ট গায়ে দিয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাতে চলে গেছে। থাকগে সেসব কথা। নস্টালজিক হযে কোনো লাভ নেই।

আমাদের দেশে গতকাল একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই সবার মাঝে বেশ চাঞ্চল্য দেখেছি। কিন্তু আমি ছিলাম নির্বিকার। আমি গ্রিস বা আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে যতটা উল্লসিত হই, চিন্তিত থাকি, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ততোটাই মনোবৈকল্য বোধ করি। কেন করি, এটা বন্ধুমাত্রই জানেন।

যমুনা টিভির একটা রিপোর্টে দেখলাম, একজন ভোটার এসেছে, যার আইডি কার্ড হয়নি, বাবার নামও মনে নেই। এরকম ভোটারের সংখ্যা সেই লাইনে ছিল অনেক কজন। কী আনন্দ! দেশ আমার, মাটি আমার, গর্ব আমার। এখানে নির্বাচনের নামে কেন যে এই প্রহসনগুলো হয়, সেটাই বুঝি না। কিছু মানুষ আবার মরেও যায় নির্বাচনের কারণেই। কী এমন হতো নির্বাচন না হলে? মানুষগুলো তো বেঁচে থাকতো। তাদের ছেলেমেয়েরা ভালো থাকতো। একটি মানুষ খুন মানে একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না।

আবারও ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে বসলাম। ঠিক করেছি, ডাক্তারও বলেছেন আমাকে, কোনো দুষ্ট চিন্তা করা যাবে না, মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। তাই তো আমি প্রতিদিন সকালে উঠেই মাথায় তেল দিয়ে বসে থাকি। তারপরও দেখি কেমন কেমন গরম ভাপ বেরুতে থাকে। কেন রে বাবা, একটু ঠাণ্ডা থাকলে কী এমন ক্ষতি!

গতকাল জুতা বের করেছি, সকালে-বিকেলে হাঁটবো এখন থেকে। কেউ আর ফেরাতে পারবে না আমাকে। রাতেও জুতা দেখে রেখেছি, সব ঠিক আছে। সকাল হলেই বেরিয়ে যাবো। ছেলেকে বললাম, বাবা সেদিন কয়টার দিকে তুমি ছিনতাই হতে দেখেছো রাস্তায়? সে বললো, সাড়ে পাঁচটা-ছয়টার দিকে। কোনো এক আন্টি হাঁটতে বেরিয়েছিল, ছিনতাইকারী তার ব্যাগটা নিয়ে গেছে। ঊনি হয়তো ভেবেছিলেন, ফেরার পথে শাকটা-মূলোটা কিনে আনবেন, সন্তানদের ফ্রেশ খাওয়াবেন। হলো না। তাই আমি ঠিক করলাম, ছয়টাতেই বেরুবো, আর টাকা-পয়সা রাখবো না, মোবাইলটাও রেখে যাবো। কিন্তু সকাল আর হলো না আমার। ঘুম ভেঙে দেখি নয়টা বাজে। এইসময় কেউ হাঁটতে যায়? বছরের শেষদিনের প্রথম কর্মসূচি এভাবেই মাঠে মারা গেল আমার।

তবে আমি নাছোরবান্দা। আজ কিছু একটা করবোই। নতুন কিছু।

একটা মজার কথা বলি। গত ১০ দিন ধরে আমি খুব ডিপ্রেশনে ভূগছি। হাসপাতাল, ডাক্তার, বন্ধু-বান্ধব সবার ঘুম হারাম করে দিয়েছি। রাত দেড়টায় একজন রিকশা করে আমার বাসায় এসেছে, আরেকজন এসেছে আড়াইটায়। রাত-ভোর-সকাল সবাইকে নাস্তানাবুদ করে, বন্ধুদের ‘শত্রু’ হিসেবে উল্লেখও করেছি। তার চেয়েও মজার ঘটনাটা ঘটেছে এক বন্ধুর বাসায়। ঘুমের ঘোরে আমাকে খেতে দেয়া হয়েছে, কী খেয়েছি জানি না, তবে ওদের বাসার যে মেয়েটা রান্না করে, ওর নাম চান, ওকে নাকি বলেছি, আমি ছেলে হলে অবশ্যই তোমাকে বিয়ে করতাম। বুঝলেন তো, আমি কী প্রকৃতির মানুষ!

একটা আন্তর্জাতিক অফিসের মেঝেতে বসে আমি কেঁদেওছি এই কদিনে। অফিস স্টাফ আমাদের কাছের মানুষ। সে আমাকে ভোলানোর জন্য বিরিশিরি নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমি তো আপ্লুত রীতিমতো।

সত্যি বলছি, এই যে এতোক্ষণ যা বলেছি, এর একটিও আমার মনে নেই। কিন্তু শুনেছি। শুনেই কেমন যেন সিনেমাটিক লাগছে। জীবন বিচিত্র, আমার জীবনও তার ঊর্ধ্বে নয়। এই বিচিত্র জীবনে অনেক বিচিত্র মানুষের আনাগোণা। সবাইকে যে ভালবাসি, তা নয়, সবাইকে যে ঘৃণা করি তাও নয়। কিন্তু সবাইকে নিয়েই আমার এই সংসার। জগত।

সবশেষে বলি, পুরনো বছরে আমরা যাদের হারিয়েছি, সেই কষ্ট-ক্ষত বুকে নিয়েই চলতে হবে বহু বছর। এই ক্ষতি পূরণ হবার নয়। কিন্তু কাউকে ভুলবো না, তাদের সবার প্রতি আমার ভালবাসা থাকবে অম্লান। অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নীলয় নীল, দীপন, তোমরা কেউ আমাদের ক্ষমা করো না, আমরা যে শুধু ভালবাসতেই জানি, ঝাণ্ডা তুলে নিতে জানি না।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.