কিশোরী ফুটবলার বনাম শফী হুজুর

 

Football Team U-14উইমেন চ্যাপ্টার: চিন্তা করা যায়, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত কোনো একটি গ্রামে ভোর হয় মেয়েদের ফুটবল খেলার আওয়াজে। কোথায় ঘুম ভেঙে ঘরের কাজ করবে, হাঁস-মুরগি বের করবে খোয়াড় থেকে, তা না, মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলছে ওরা। কিছু ফুটবল পাগল মানুষ এই মেয়েদের ঘর থেকে টেনে বের করে এনেছেন। আর তারই প্রতিফলন দেখা গেল গতকাল নেপালে, এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ মহিলা ফুটবলের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে।

ময়মনসিংহের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম কলসিন্দুরের মেয়েরা দেখিয়ে দিয়েছে, মেয়েরাও পারে। ফেসবুকে অনেকেই এই ঘটনাকে ‘শফী হুজুর’ বা ‘তেঁতুল হুজুর’ মুখে মোক্ষম চপেটাঘাত বলে উল্লেখ করছেন। যে শফী হুজুর ১৩ দফা দাবি পেশ করেন নারীকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখার ফতোয়া দিয়ে, সরকারও তা মেনে নেয় ইনিয়ে-বিনিয়ে, সেখানে কিশোরী মেয়েদের, বলা ভাল, প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের এভাবে সমাজের সামনে এগিয়ে আসাটা অবশ্যই ইতিবাচক একটা দিক।

এর মধ্য দিয়ে মহিলা ফুটবলে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়লো যেন। সেই ইতিহাসের অংশ শুধু ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত কলসিন্দুরের ১০ ফুটবলারই নয়, তাদের সঙ্গী টাঙ্গাইলের কৃষ্ণা, রুমা, জোছনা ও মৌসুমী; রাজশাহীর নার্গিস; সাতক্ষীরার রাজিয়া; রাঙামাটির মনিকা ও রংপুরের স্বপ্নাও। মেয়েদের জাতীয় বা বয়সভিত্তিক কোনো দলের প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্য এটি।

একাদশে কাল কলসিন্দুরের ছিল ছয় ফুটবলার—সানজিদা, শিউলি, শামসুন্নাহার, মারিয়া, মার্জিয়া ও তসলিমা। ডাগআউটে আরও ছিল মাহমুদা, রূপা, তহুরা ও নাজমা।

ফাইনালটি গত ২৫ এপ্রিল হওয়ার কথা থাকলেও সেদিন প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প নেপালে আঘাত হানায় স্বাভাবিকভাবেই তা স্থগিত হয়ে যায়। পূর্বনির্ধারিত সেই ফাইনালটিই হয়েছে গতকাল ২০ ডিসেম্বর। একটি মাত্র গোলে জয় পেলেও জয় জয়ই। বিশেষ করে ফুটবল যখন প্রায় নির্বাসিত, তখন মেয়েদের এমন উঠে আসাটা সত্যিই বিস্ময়কর ঠেকে। আরও ঠেকে এই কারণে যে, যখন দেশ মৌলবাদের জ্বরে আক্রান্ত, হিজাব-মুসুল্লিতে ছেয়ে গেছে পুরো দেশ, অসহিষ্ণুতার বীজ যখন ধীরে ধীরে মহীরুহ আকার নিচ্ছে, তখন একটি অজ:পাড়াগাঁয়ের মেয়েরা এমন শর্ট প্যান্ট পরে বিদেশের মাটিতে খেলছে এবং জয়ের পর উচ্ছাসে ফেটে পড়ছে, তখন মনের কোণে আশা জেগে উঠে যেন।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে খুবই দুর্বল সেখানে কিশোরীদের এই দলটি এরকমই এক টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরেছে। এই টুর্নামেন্টে খেলেছে ভারত ও ইরানের মতো শক্তিশালী দলও।

খেলাশেষে গতকালই ঢাকায় ফিরেছে ফুটবল টিমটি। বিমানবন্দরে নামার পরপরই টেলিফোনে দলের কোচ গোলাম রব্বানী বিবিসি বাংলাকে বলেছে, আশাতীত ফল করেছে মেয়েরা। “গতবারও ভারতের কাছে আমরা পাঁচ গেলে খেয়েছি, ইরানের কাছে পাঁচ গোল খেয়েছি। এবার আমরা চ্যাম্পিয়ন।”

তিনি বলেন, “দেশে মহিলা ফুটবলের জাগরণ হচ্ছে, তৃণমূলে অনেক প্রতিভাধর মেয়েরা ফুটবল খেলছে।” তবে মেয়েরা এই খেলা কতদিন ধরে রাখতে পারবে সেই প্রশ্নের উত্তরে গোলাম রাব্বানি বলেন, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশে ফুটবল ফেডারেশনের ভূমিকা এবং পৃষ্ঠপোষকতার ওপর।

ধর্মীয় এবং সামাজিক রক্ষণশীলতার বাস্তবতাও অস্বীকার না করেই মি. রাব্বানি বলেন, “আমি নিজেই দুজন গোলকিপার হারিয়েছি। দু’বছর তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর ১৬ বছরে তাদের বিয়ে হয়ে যায়।” ফুটবলে মেয়েদের ধরে রাখতে চাকরি এবং নিয়মিত অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোরারোপ করেন তিনি।

ট্যাবু ভেঙে বেরিয়ে আসা এই মেয়েরা যেন আর চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ না হয়ে যায়, সেদিকে নজর দেয়া সবার জন্যই প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, তাদের আরও বেশি করে এগিয়ে আসা উচিত এদের উৎসাহ অব্যাহত রাখতে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.