সূর্য শিশু ও তার নায়ক!

71 war 5তানিয়া মোর্শেদ: তাঁর সাথে প্রথম কবে দেখা কিছু মনে নেই। তবে আমার বয়স তখন পাঁচেরও বেশ কম এটুকু বুঝি। দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে। যাঁরা সম্মুখ যুদ্ধ করে স্বাধীনতার লাল পতাকা এনে দিয়েছেন আমাদের, তিনি তাঁদেরই একজন। আমার প্রথম কাছ থেকে দেখা, “জীবনের নায়ক”! নুরুল ইসলাম ভাই। বাবাকে ‘স্যার’ বলতেন। অন্য বিভাগের স্টুডেন্ট ছিলেন। বাবাকে স্যার বলার সুবাদে আমার চাচা ডাকবার কথা। না তিনি আমার, আমাদের সব শিশুর “নুরুল ইসলাম ভাই”। 

দেশ স্বাধীন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছেন, পড়া শেষ হয়নি। ফিরে শিশুদের জন্য “সূর্য শিশু” প্রতিষ্ঠা করলেন। শিশু-কিশোরদের আলোর পথে রাখবার জন্য এই সংগঠন। একটি পার্ক হলো খেলাধূলার জন্য। খুব সাধারণ। শিক্ষকদের বসবাসের জন্য ক্যাম্পাসের একটি মাঠে কয়েকটি দোলনা আর জিমন্যাস্টিক বার। একদিন ডাক পড়লো, পার্কের উদ্বোধন। বাড়ীতে যে পাজামা স্যুট পরেছিলাম, তাই পরেই দৌড়। হাতে প্লেইট, কাঁচি ধরিয়ে দেওয়া হলো। প্রফেসর খান সারোয়ার মুর্শিদ (তখনকার রাঃবিঃ-এর ভিসি) ফিতা কেটে উদ্বোধন করলেন। কে ছবি তুলেছিলেন জানি না। অতীতের স্মৃতি হয়ে ছবিটি আছে। 

আমাকে কবিতা আবৃত্তি শেখানো শুরু করলেন আমার এক খালা, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। “সূর্য শিশু”-র অনুষ্ঠান হবে। প্রায়ই নুরুল ইসলাম ভাই বাসায় আসেন, বাবা-মায়ের সাথে অনেক কথা। হাসি-খুশি মানুষটি বাসায় এলেই মনের মধ্যে আনন্দ বয়ে যায়। আমার চোখে সব মুক্তিযোদ্ধাই নায়ক। তাদেরই একজন আমাদের বাড়ীতে! আর তিনি কীনা প্রিয় নুরুল ইসলাম ভাই!

কেন জানি মনে হচ্ছে, শুনেছিলাম যে তিনি পরিবারের সবাইকে বা অনেককে হারিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। বাবা নিশ্চিত করতে পারতেন! তাঁর কি মনে আছে? তিনি এখন স্মৃতি-বিস্মৃতির মাঝে বসবাস করেন! নুরুল ইসলাম ভাইকে এই কথা এতদিন পর জিজ্ঞাসা করবার প্রশ্নই আসে না।

আমার চিকেন পক্স হলো। বাবা বাদে কেউ কাছে আসেন না। বাবাই পুরো সেবা করেন। ভাই খুব ছোট (স্বাধীনতার পর জন্ম), তাই মা’ও খুব একটা কাছে আসেন না। যদি ভায়ের হয়ে যায়! নুরুল ইসলাম ভাই নিয়মিত দেখে যান। 

১৯৭৩-এ বাবার বাইরে পড়বার জন্য ক্যাম্পাস ছাড়লাম। তাই সূর্য শিশুর অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নেওয়া হলো না! ১৯৭৫-এর গ্রীষ্মে ফিরে আসলাম। তখন সূর্য শিশুর কথা তেমন শুনলাম না।

আর তার কিছুদিন পরই তো সব বদলে গেলো! ইতিহাস বিকৃতি শুরু হলো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদেরই যত অসুবিধা! নুরুল ইসলাম ভাই ১৯৭৩-এ (আমরা ক্যাম্পাস ছাড়বার আগে) না কি ১৯৭৫-এ যখন আসতেন, আমি পুরো না বুঝলেও কিছুটা বুঝতাম যে কারা যেন নুরুল ইসলাম ভায়ের বিরুদ্ধে লেগেছেন! তাঁকে সাবধানে চলতে হতো। আশ্চর্য্য হতাম। এটা কি ভাবে সম্ভব!

আজ বুঝি কেন, কারা ছিল! না আমি জানি না তাদের নাম। তবে তারা যে স্বাধীনতার বিপক্ষের মানুষ আজ তা কেউ না বললেও বুঝি! দেশ কি একদিনে গেছে এই জায়গায়? বৎসরের পর বৎসর ধরে চলেছে স্বাধীনতার বিপক্ষের মানুষদের জোট বাঁধা, প্ল্যান করে চলা। আজ তার পরিণতি দেখছি আমরা!

এখন মনে হয় কেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষরা খেয়াল করলেন না? কেন তারা শুরুতেই প্রতিরোধ করলেন না? কেন আমার বাবা-স্বপক্ষের মানুষদের নিয়ে “সূর্য শিশু”-কে রক্ষা করতে তৎপর হলেন না? যে লোক ১৯৭১-এ বাবাকে-মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের হুমকি দিতেন, সেই কি না ১৯৭৫-এর পরে একদিন ভিসি হয়ে গেলেন! কেন সেদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাই প্রতিবাদে পথে  নামেনি! আজ দেশ জুড়ে রাস্তায় ককটেল, মানুষের শরীরে-গাড়ীতে-ট্রেইনে আগুন এসব কিছু কি দেখতে হতো যদি সঠিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাই একসাথে প্রতিরোধ করতেন?!

মা’কে বলেছিলাম নুরুল ইসলাম ভায়ের খবর নিতে। কিছু বৎসর আগে তাঁর হার্টের সার্জারী হয়েছে। কলেজের শিক্ষকতা শেষে অবসর নিয়েছেন। আমার অনুরোধে মা তাঁর ফোন নাম্বার বেশ কষ্ট করে কিছু বৎসর আগে জোগাড় করেছেন।

আমি আজও সাহস করতে পারিনি ফোন করবার! কি জিজ্ঞাসা করবো? কেমন আছেন? সব কিছু থেকে পালিয়ে থাকা আমার সে সাহস নেই! 

(লেখাটি ২০১৩ সালের। কিন্তু এখনও অনেকখানি সংশ্লিষ্ট বলে এখানে দেয়া হলো)

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.