নিশান ছেলেটি আমার সাথেই পড়তো

Flag 5তামান্না ইসলাম: ছেলেটি আমার সাথে বেবি ক্লাস  থেকেই পড়তো। আমাদের সময় ক্লাস ওয়ানের আগে একটাই ক্লাস ছিল, বেবি ক্লাস। অসম্ভব দুষ্টু। আর ভীষণ মিষ্টি, চাইনিজ কাট চুল। হ্যাঁ, আমাদের সময় ছোট ছেলেদের চাইনিজ কাট চুলই ফ্যাশন ছিল। মিষ্টি চেহারা তখন অত বুঝতাম না, যে কারণে ক্লাসের সবাই ওকে চিনত, সেটা হলো ওর দুষ্টুমি।

এই দুষ্টের সেরা ছেলেটির মা প্রতিদিন স্কুল শেষে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন গেটের পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। একটাই শাড়ি পরতেন, কালচে সবুজ ধরনের, অনেকটা আমাদের পতাকার রঙের চেয়ে একটু কালচে। প্রতিমার মত মুখ, এক তরুণী। কিন্তু কী ভয়াবহ বিষণ্ণতায় ঘেরা। অন্য আন্টিরা গোল  হয়ে গল্প করতেন। ঊনি করতেন না। চুপচাপ ছেলের অপেক্ষায় থাকতেন। মাঝে মাঝে আমাদের সাথে কথা হতো পড়ালেখা, হোম ওয়ার্ক এইসব নিয়ে। তাও আমাদের কয়েকজনের সাথেই।

ক্লাস ওয়ানের ক্লাস টিচার ওর দুষ্টুমি সহ্য করতে না পেরে আমাদের দুই মেয়ের মাঝে ওকে বসিয়ে দিয়েছিল, বলাবাহুল্য শান্তশিষ্ট দুই মেয়ে। বেচারা ছটফট করতো। তারপরেও দুষ্টুমির বুদ্ধি খুঁজে বের করলো। আমার একটা পানির ফ্লাস্ক ছিল, একটা শিশুর আকৃতির। ওটাকে কোলে নিয়ে অভিনয় করতো বাচ্চাকে ঘুম পারাচ্ছে আর মুখে ওয়া ওয়া শব্দ করতো, আমরা দুই বান্ধবী ভয়ে সিটিয়ে থাকতাম, শেষে ওর জন্য না আমরাও বিপদে পড়ি।

ওর মাকেই দেখতাম সব সময়, কোনদিন ওর বাবাকে না। কিভাবে দেখবো? ওর যে বাবা নেই। ও ওর বাবাকে দেখেনি কোনদিন। ওকে ওর মায়ের পেটে রেখে ওর ডাক্তার বাবা যুদ্ধে গেছেন, আর ফেরেনি। জানি না দুষ্টু ছেলেটা যখন আমাদের গেটে দাঁড়ানো কোন বাবাকে দেখতো আমাদেরকে নিয়ে আহ্লাদ করতে, ও কখনো থমকে দাঁড়াতো কীনা!

আজ কেন জানি মনে হয় দুষ্টুমিটা ছিল ওর একটা অভিনয়, ছোটবেলা থেকে বাবাকে না দেখার কষ্টকে আড়াল করে রাখার জন্য। ওর জন্ম বাংলাদেশের জন্মের পরপরই। ওর নাম নিশান, নিশান মানে পতাকা, লাল সবুজে মিশানো বাংলাদেশের পতাকা। আবার নিশান মানে চিহ্নও, ওর মায়ের কাছে রেখে যাওয়া ওর বাবার ভালবাসার চিহ্ন।  

আন্টি এখন কোথায় আছেন জানি না, ঊনার নামও আজ মনে নেই, খুব সম্ভবত আমার মায়ের নামেই নাম ছিল। যেখানেই থাকুক, ভাল থাকুক তিনি। ঊনার মতো মায়েদের, স্ত্রীদের অপরিসীম ত্যাগের বিনিময় ঊনারা আমাদেরকে দিয়েছেন এক অমূল্য উপহার, প্রিয় স্বাধীনতা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.