মানবাস্ত্রের বাংলাদেশ

Flag 4রুবিনা চৌধুরী: একাত্তরের নভেম্বরে আমার বয়স হয়েছিল চার। কিছুদিন আগেও দাবী করতাম যুদ্ধের অনেক স্মৃতি আমার শরীরের ২% মস্তিষ্ক ধারন করছে। এখন বুঝি আমার লং টার্ম স্মৃতিতে ওরা নেই, যা আছে তার সবই বাবা-মা-বড় ভাইয়ের বলা গল্পের স্মৃতি।

আমার মন বলে আমি দেখতে পাই বাবার কাঁধে করে অনেক দূর চলা, জেট প্লেনের আওয়াজ শুনলে ভাইয়ার আর আমার কানে তুলো গুজে খাটের নীচে লুকানো, আমাদের বাড়ীর সব লুট হয়ে যাওয়া, স্বাধীনতার পর সামনের বিহারীদের বাড়ীর ছোট মেয়েটার কাছে আমার সব প্রিয় পুতুলগুলো আর জামাগুলো যেন আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। আসলে সব আমার মায়ের কাছ থেকেই শোনা, কারণ ধারণা করা হয় ওরাই আমাদের বাড়ীতে পাকসেনাদের সাথে লুট করেছিল। এমনভাবেই আমার, আমাদের সবার স্মৃতিতে আমাদের একাত্তর।

কিন্তু পঁচাত্তরে আমি আর ভুলে যাওয়ার মতো ছোট ছিলাম না, তখন আমার তৃতীয় শ্রেণী। আমি জন্মেছি আমার দুহাতের মাঝের দুটো আঙ্গুল জোড়া নিয়ে। ভালো ডাক্তারের অভাবে আর যুদ্ধের কারণে আগে অপারেশন করা হয়ে ওঠেনি। যুদ্ধে অঙ্গ হারানো মুক্তিসেনাদের জন্য এলো অনেক অর্থোপেডিক সার্জন আর নার্স সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে, বিভিন্ন দেশ থেকে। বাবা ভাবলেন, আর দেরী করা যায় না।, সাথে আত্মীয়দের উপদেশ তো ছিলই।

মেয়ে বলে কথা, ভবিষ্যত মানেই তো বিয়ে যাদের। লিখতেও বেশ অসুবিধা হতে লাগলো। দুহাত অপারেশন করতে গিয়ে আমি অনেকদিন হাসপাতালে ছিলাম। আমার সেই দেখা যুদ্ধের প্রকৃত হারানোর ছবি। প্রতিদিন আসতো কেউ না কেউ, নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করা আমাদের মুক্তিদাতারা। আমার সাথে আমার মা থাকতেন, তিনিও এদেরকে দেখে ভুললেন, যুদ্ধের সময় হারানো সব গহনা, বিয়ের শাড়ি, শ্বাশুড়ি আর দাদীর শ্বাশুড়ির কাছ থেকে পাওয়া সেই পুরানো দিনের সোনার তারের নকশার বেনারসি, আর স্মৃতি মাখানো আমাদের সব ছবির শোক। শুধুই বলতেন, আমরা সবাই সু্স্থভাবে বেঁচে আছি এটাই বড়, দু একটা দোয়া পড়ে নিতেন, আমিও একহাতে মায়ের সাথে মোনাজাত করতাম, আরেক হাত ঝুলানো থাকতো। ছোটবেলায় তো আর নাস্তিক ছিলাম না!

এদের সকলেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। আমার ছিলেন মামা, চাচা আর দাদু গোছের লোক। আমাকে আমার আত্মীয়রা দেখতে আসতেন অনেক খাবার নিয়ে, আমি ওদেরকে খাওয়াতাম, আর গল্প শুনতাম। অনেকে ছিলেন ছাত্র। আমার সব গল্পের বই থেকে ইংরেজী-বাংলা গল্প পড়ে শোনানো, গান গাওয়া, ছড়া বলা এসব ছিল আমার কাজ। সবাই খুব মজা পেত, ডাক্তার-নার্সরা সময় পেলেই আমার কাছে। প্রতিদিন আমার বেডের কাছে অনুষ্ঠান। প্রাণ হয়ে উঠলাম সবার অল্পদিনে। আমাকে নিয়েই অনেকটা সময় কাটতো ওদের।

একদিন একজন এলেন, দুটো পা নেই। পরে আমি তাকে দাদু ডাকতাম। পরেরদিন আমার আরেক হাতের অপারেশন হবে। আমাকে দেখে বললেন, ‘কি সুন্দর মেয়ে তুমি, এখানে কি করো?’ নার্স বলে দেওয়াতে বললেন, ‘আহারে, পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটার আঙ্গুলগুলো এমন হলো!’ আমি ওখানে তার বেডের পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, যার দুটো পা নেই, আমার দুর্ভাগ্য কি তার চাইতে বেশী না কম!

প্রতিদিন ওদের বেডের পাশে টুলের উপর বসে যুদ্ধের কাহিনী শুনতে থাকলাম, আমি উঠতে না পারলে হুইল চেয়ারে করে আমার পাশে বসে ওদের গল্প বলা, যেন আমাকে গল্প বলতে না পারলে ওদের ঘুম আসবে না। অনেকে খুব অবাক হতো আমি এসব গল্প শুনতে একটুও ভয় পেতাম না। আমার ‘তারপর’ বলতে থাকাতে ওরা বুঝতো আমার আগ্রহের মাত্রার দৈর্ঘ্য! ওদের বলা সেসব গল্পের অনেকটাই এখনো মনে আছে। বেশীটাই মৃত্যু দেখা গল্প। নিজের বাড়ীতে সবার মৃতদেহ দেখা, পালাতে গিয়ে ধরা পড়া, অঙ্গ হারিয়ে ঐ অবস্থায় হিসাবহীন দিনের পর দিন জঙ্গলে পরে থাকা, নিজেকে হাসপাতালে দেখে বেঁচে আছে কিনা বিশ্বাস না করতে পারা, এ অবস্থায় না বাঁচার ইচ্ছা, মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং, ওদের সেসব আকুতি আজো মনে আছে। আর আছে আমাকে ওদের প্রাণভরে আশীর্বাদ করার স্মৃতি।

এমনি করেই পাওয়া বাঙালির নিজের মানচিত্র বাংলাদেশ। ত্রিশ লাখ মানবাস্ত্র, তার সাথে অঙ্গদাতাদের দানে আমাদের মুক্ত নিঃশ্বাস, স্বাধীনতা, বিজয়। সেই শুরু, আজো থামেনি। নূর হোসেন আজো তাই পিঠে লিখে বুক পেতে দেয়। সুজলা সুফলা বাংলার কোলে জন্মানো বাঙালি নিজেকে অস্ত্র বানিয়ে শেষ হয়ে যায়। প্রাকৃতিক-রাজনৈতিক দুর্যোগ, যাই হোক না কেন একই পথ আমাদের জানা। সামান্য হরতালের দিনও যেন অপেক্ষা, কজন যাবে ওপারে। বাংলাদেশে যাই হোক না কেন, প্রথমেই মনে হয় কজন মারা গেল। এই যেন ভাগ্যলিখন বাঙালির।

একদিন মানববোমা নিয়ে কথা বলার সময় এক ফিলিস্তিনী বলেছিল, ‘আর কি করবো, আমরাতো অন্য দেশের মতো নাশকতার জন্য করি না, বাঁচার জন্য করি’। আমরাও কি ওদের মতো বাঁচার জন্য মরি? যে যায়, সে তো যায়, স্বজন ছাড়া আর কি কেউ মনে রাখে? ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’। ভুলিনি? ভুলেছি তো আমাদের ত্রিশ লক্ষ প্রাণদান।শুধু নীরব মাটির স্মৃতিতে ঘুম।

দরিদ্র মানুষের যেমন স্বাধীনতা থাকে না, তেমন দরিদ্র দেশেরও স্বাধীনতা থাকে না। দেশে কাঁটাতারের বেড়া, প্রতিদিন মরে বর্ডারে বাঙালি। নিজের দেশে ঘাতকদের বিচার করবো, ফিরে আসে শ্রমিক, জমা হয় সেনা কর্মকর্তাদের লাশ, মানবাস্ত্র। প্রতিবছর এত সন্তানের শোকে মা খাবার দিতে ভুলেছে, সুজলা বাংলা তার রুপ হারাচ্ছে, মানবাস্ত্ররা বিভিন্ন দেশে কাজ করে, আর পোষাক বানায় আন্তর্জাতিক করপোরেট কম্পানিগুলোর জন্য। আবারো মানবাস্ত্র হয় নিজের দেশের হানাবাহিনীদের কাছে। কি যন্ত্রনা নিজের ভাইয়ের হাতের মৃত্যু! এ যে গৃহযুদ্ধের চাইতেও ভয়াবহ। গৃহযুদ্ধে তো ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকে। আমরা তো নীরব মানবাস্ত্র।

আমাদের বাংলা মা কি এত সন্তানের লাশে পুষ্ট হতে পারে না আবার? জন্ম দিতে পারে না এক সবল সন্তান, একজন পথপ্রদর্শক? আর কতকাল আমাদের মতো দুর্বল অন্নগ্রাহী  জন্ম দেবে?

ফিদেল ক্যাস্ত্রোর দেওয়া পরামর্শ মানতে পারেননি আমাদের জনক, ‘যুদ্ধের সময়কার ঘাতক এবং যোদ্ধা, দুইই ভয়াবহ, নেতাকে কঠোর হতে হয়’। পারেননি হতে কঠোর জাতির জনক, প্রতিদিনের আহাজারিতে মরে আমাদের মা, বাংলা মা, বাংলাদেশ।

তবুও কাল এসে জলে একটা ঢিল ছোড়ে, মৃদুমন্দ ঢেউ তোলে, আসে মায়ের বিজয় তিলক। মায়ের স্মৃতিতে তার জন্য প্রাণ হারানো সন্তানদের সে রক্তগর্ভা বাংলা।

তবুও আজ আমরা ষোলো কোটি সন্তান দাঁড়িয়ে মা, তোমার অমর সন্তানদের রক্তে রাঙানো লাল মাটিতে পূর্বে দিগন্তের উদ্ভাসিত টিপ দিয়ে দাও, আর যেন নজর না লাগে তোমার সন্তানদের, ও আমাদের বিজয়িনী বাংলাদেশ!!!!!!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.