বিজ্ঞাপনে নারী, মিডিয়ায় নারী  

নির্ঝর রুথ ঘোষ:

বাংলাদেশের বিলবোর্ডগুলোতে মেয়েদের আধিপত্য চেয়ে দেখার মতোনুডুলস, অলংকার, আইসক্রিম, জুস, সয়াবিন তেল, জামাকাপড়ের বিজ্ঞাপন – সবকিছুতেই মেয়েরা মডেল। একমাত্র বুয়েট স্বীকৃত রডের বিজ্ঞাপনে দেখলাম না কোনো মেয়েকে। সেখানে দেখলাম একজন পুরুষ মডেলের ছবিএ থেকে কী বুঝবো? মেয়েদের জগত শুধু ঘরোয়া ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ? আর যখনই সেটা স্থাপত্যশিল্পের মতো বাহ্যিক ব্যাপারে আসে, তখন সেটা শুধু পুরুষের ব্যাপার? এসব জায়গায় মহিলা বিশেষজ্ঞ বা প্রকৌশলী দেখালে পণ্য বিক্রি হবে না? নাকি বাংলাদেশে নারী প্রকৌশলী নেই যে, এসব বিজ্ঞাপনে নারী প্রকৌশলী দেখালে সেটা মিথ্যে ব্যাপার হবে?

টেলিভিশনেও একই অবস্থা। ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে বিশ্ব জয় করা, নারিকেল তেল মেখে দীর্ঘ কালো চুল বানিয়ে হাজবেন্ডের মন জয় করা, শ্যাম্পু মেখে খুশকিমুক্ত চুলের মাধ্যমে প্রেমিকের মন জয় করা, সয়াবিন/সরিষা তেল দিয়ে রান্না করে খাদ্য সুস্বাদু হয়েছে কিনা সেটা জানার জন্য হাজবেন্ডের মুখের দিকে চিন্তিত ভঙ্গীতে তাকিয়ে থাকা – সবকিছুই চাপানো হয় মেয়েদের ঘাড়ে ওয়াশিং পাউডার, হারপিক, ডিশ ওয়াশিং পাউডার কিংবা সাবানের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাপড় ধোওয়া, টয়লেট পরিষ্কার করা, থালাবাসন ধোওয়া এবং রূপ ফুটিয়ে তুলে ছেলেদের মন জয় করা যে শুধু মেয়েদেরই কাজ, এটা প্রতিদিন মেয়েদের মাথায় সেট করে দেয়া হচ্ছে জামাইয়ের সাদা শার্ট আরও সাদা কীভাবে করবে, কোন ব্র্যান্ডের গয়না মা-বাবা মেয়ের বিয়েতে উপহার দেবে – এইসবের বাইরে মেয়েদের জন্য তেমন বিজ্ঞাপন নেই। কিন্তু কেন? মেয়েদের জীবন কি শুধু এসবের মধ্যেই ঘুরপাক খায়?

ইদানীং যোগ হয়েছে কিছু আবর্জনা ধরনের অনলাইন পত্রিকা, যাদের কাজই হলো কোন অঞ্চলের মেয়েরা পাত্রী হিসেবে কেমন, কোন ধরনের মেয়েদের বিয়ে করা উচিৎ, যোগ্য স্ত্রী হওয়ার জন্য কী কী গুণ থাকা আবশ্যক ইত্যাদি বিষয়ে ফিচার লেখা। যতভাবে মেয়েদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, যতভাবে মেয়েদের ছোট করা যায়, সবভাবেই মিডিয়া রসালো পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই যদি হয় আধুনিক যুগের নমুনা, তাহলে বেগম রোকেয়া একশো বছর আগে জন্মে বেঁচে গেছেন।  

ছেলেদের মাথায়ও মেয়েদের সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাপার ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন ছেলেরা মেয়েদের চেনে টাকা, গয়না, গাড়ী, বাড়ী, সামাজিক মর্যাদার প্রতি লোভাতুর প্রাণী হিসেবে। ‘রেস্তোরাঁয় গেলে প্রেমিকারা সবসময় প্রেমিকদের পকেট ফাঁকা করে ফেলে’ ধরণের সস্তা রসিকতা ছেলেদের করতে দেখছি বছরের পর বছর ধরে ‘প্রেমের ক্ষেত্রে মেয়েরা দামী উপহার আশা করে’ ধরনের অপমানজনক ধারণা নিয়েও ছেলেদের মাঝে কম রসিকতা চালু নেই। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? প্রেমিকারা প্রেমিকদের টাকা কম খরচ করার জন্যে তাগাদা দেয়, জমাতে বলে।

যেহেতু গণমাধ্যমে প্রচারিত যেকোনো বিষয় খুব দ্রুত পৌঁছে যায় দেশের আনাচে কানাচে, তাই এই মাধ্যমগুলো হতে পারতো ছেলেমেয়ের মধ্যে বিভেদ ঘুচানোর একটা প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সেদিকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতনতা, বা আগ্রহ নেই। তারা হয়তো চিন্তা করে, প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে সরে এলে মানুষ তাদের পণ্য কিনবে না, তাদের বিজ্ঞাপন জমবে না যেমন, ‘ফ্রেশ মানেই সুন্দর’ ধারণা নিয়ে একটা বিজ্ঞাপন এসেছিলো। কিন্তু সেটা অন্যদের পরিবর্তন করতে পারেনি। এখনও ফর্সা রঙ বা পিম্পলকেই দেখানো হচ্ছে মেয়েদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হিসেবে! তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি মেয়েদের সফলতার কাহিনি জানে না?

জনপ্রিয় ওয়েডিং ফটোগ্রাফার ইশরাত আমিন, কার্টুনিস্ট শিখা, ডিজে সোনিকা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের কাজ সম্পর্কে কে না জানে? কিছুদিন আগে আইসিসির র‌্যাঙ্কিংয়ে মেয়েদের টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার এবং বোলার হিসেবে শীর্ষে ছিলেন বাংলাদেশের সালমা খাতুন। এসব নিয়ে বিজ্ঞাপন করা যায় না?

সময়ের পরিক্রমায় আমরা ভুলতে বসেছি ম্যাগসাইসাই পুরষ্কারপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তা এঞ্জেলা গমেজের কথা, তাঁর “বাঁচতে শেখা” প্রতিষ্ঠানটির কথা। অথচ তাঁদের মতো মানুষদেকে নিয়ে কতো উন্নতমানের বিজ্ঞাপন তৈরি করা যায়! সুপরিচিত লেখক সেলিনা হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, কিংবা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক তসলিমা নাসরিন কী দোষ করলেন? যে দেশে বেগম রোকেয়ার মতো অগ্রদূত জন্মেছেন, সে দেশে এই যুগে এসেও মেয়েদের শুধুমাত্র বৈষয়িক দিক দিয়ে উপস্থাপন করাটা কতখানি লজ্জার! রবি ঠাকুর ভালোই বলেছিলেন, “রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি”।

কোন কিশোরী মডেল তার খোলা পিঠ দেখিয়ে গয়নার বিজ্ঞাপন করেছে, সেটা নিয়ে ফেসবুকে তোলপাড় হয়ে যায়। কিন্তু ২০১৩ সালে যে মারজান আহমেদ ফ্রিল্যান্সার ডটকমে আউটসোর্সিংয়ের কাজে ৭৩ লাখ ফ্রিল্যান্সারের মধ্যে ১৩তম, বাংলাদেশে দ্বিতীয় এবং নারীদের মধ্যে বিশ্বে ১ম হয়েছিলেন, সে বিষয়ে ফেসবুকে ঝড় তোলার মানসিকতা নেই কারও।

জানতে চান দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গবেষণা খাতে নারীদের ভূমিকার কথা?

  •         ICDDR, B: ডাঃ তাসনীম আজিম হলেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট এবং সেন্টার ফর এইচআইভি এন্ড এইডসের পরিচালক। সেন্টার ফর ভ্যাক্সিন সায়েন্সের পরিচালক ডঃ ফিরদাউসি কাদরী, সেন্টার ফর পপুলেশন, আর্বানাইজেশন এন্ড ক্লাইমেট চেন্জের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডাঃ কামরুন নাহার
  •         বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ঃ নার্সিং অনুষদের ডীন প্রফেসর শাহানা আখতার রহমান, গ্র্যাজুয়েট নার্সিং বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর মেবেল ডি’রোজারিও, অবস এন্ড গাইনি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর সালেহা বেগম চৌধুরী, ফিজিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর সেলিনা বেগম, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর জলি বিশ্বাস, ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহিনা তাবাসসুম।
  •         BIRDEM: বারডেমের ডিরেক্টর জেনারেল প্রফেসর নাজমুন নাহার, পথ্য এবং পুষ্টি বিভাগের প্রধান আখতারুন নাহার আলো
  •         বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডঃ সেলিনা পারভিন বানু।

পর্বতারোহণের মতো বিপজ্জনক কাজে ভাবছেন পুরুষের একচেটিয়া আধিপত্য?

শুনুন নিশাত মজুমদারের কথা, যিনি প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করেছিলেন। চিনুন ওয়াসফিয়া নাজরীনকে, যিনি শুধু এভারেস্টই জয় করেননি, প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেছেন, সেখানে উড়িয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা।  আর এই জয় তিনি উৎসর্গ করেছেন দেশকে, দেশের নারীর ক্ষমতায়নে। ওয়াসফিয়া তাঁর এভারেস্ট জয়কে বাংলাদেশী নারীদের উৎসর্গ করে বলেছিলেন, “দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে ৪১ বছর আগে। কিন্তু দেশের নারীদের এখনো স্বাধীনতা পাওয়া বাকি

জানতে চান সমাজসেবামূলক কাজে নারীদের অংশগ্রহণের কথা?

২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক সাহসী নারীর পুরস্কার পেয়েছেন সাংবাদিক নাদিয়া শারমীন২০১৩ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকার মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে হেফাজত কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হন নাদিয়া। সেসময় কর্মস্থল একুশে টিভি থেকে তাকে চাকরীচ্যুত করা হলেও হাল ছাড়েননি তিনি। বর্তমানে আছেন একাত্তর টেলিভিশনে।

২০১৩ সালে “আস্ত্রাইয়া ফিমেল লিডার অফ দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড” পেয়েছিলেন বাংলাদেশের নাজমা আক্তার৷ তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা নাজমা ২০০৩ সালে নিজের সেলাই প্রতিষ্ঠান “আওয়াজ” স্থাপন করেন। 

২০১৩ সালেই ডয়চে ভেলে আয়োজিত ‘গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম অ্যাওয়ার্ড’ পান মাহফুজা আক্তার। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা মাহফুজা তথ্যকল্যাণী হিসেবে কাজ করছেন ২০১০ সাল থেকে৷ একইভাবে ২০১৪ সালে এই অ্যাওয়ার্ডটি পায় নারী বিষয়ক অনলাইন পোর্টাল ‘উইমেন চ্যাপ্টার’। যাত্রা শুরুর মাত্র একবছরের মাথায় পোর্টালটি এই অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে নিজেদের দক্ষতায়।

নুসরাত ইশতিয়াক জাহানের মস্তিষ্ক প্রসূত “Adaptable portable modular housing” প্রকল্পটি জিতে নিয়েছে Holcim 2014 International Sustainable Design প্রতিযোগিতায় “Next Generation” বিভাগের দ্বিতীয় পুরষ্কার। বাংলাদেশের সুবিধা বঞ্চিত মানুষকে কম খরচে মাথা গোঁজার ঠাই দেওয়ার জন্য নুসরাত এই প্রকল্পটি তৈরি করেন। এটি সহজে নির্মাণযোগ্য, এবং পরিবহনযোগ্য!

মুসলিমা আখতার কাজ করছেন অস্ট্রেলিয়ার লাইসেন্সধারী স্কুবা ডাইভার হিসেবে। ২০০৩ সালে কাপাসিয়ার মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করে নানা মোড় পেরিয়ে এখন তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে আছেন “Professional Association of Diving Instructors” নামক আন্তর্জাতিক স্কুবা ডাইভিং ট্রেনিং সেন্টারে।

বিমান বাহিনীতে মেয়েদের সাফল্যের কথা শুনতে চান?

২০১৪ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম মহিলা পাইলট হিসেবে নাম লিখিয়েছেন তামান্না-ই-লুতফি ২০১৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্যারাট্রুপার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস।

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সম্পর্কে জানতে চান?

জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী হলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা স্পীকার। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে যোগ দেন নাজমুন আরা সুলতানা৷ তিনি সর্বোচ্চ আদালতে নিয়োগ পাওয়া প্রথম নারী বিচারপতি৷ গণজাগরণ মঞ্চের অগ্নিকন্যা লাকি আক্তারের কথা মনে আছে? তাঁর স্লোগান যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো, তেমন আর কারো ক্ষেত্রে ঘটেনি।

শেষ করতে চাই এই বলে, আমরা এমনই এক জাতি, যারা মেয়েদের সফলতা নিয়ে তেমন প্রচার করি না। জানিও না অনেক বাংলাদেশী নারীর সাফল্য গাঁথা, তাদের সংগ্রামের কথা। অথচ এসব বিষয় নিয়ে লিখে উঠতি পত্রিকাগুলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতো তা না করে তাদের প্রবন্ধ হচ্ছে “কোন অভিনেত্রী এখনো মা হতে পারেননি?”, “কীভাবে বোঝা যাবে স্ত্রী পরকীয়ায় জড়িত?” ধরণের চূড়ান্ত ফাজলেমি   

কয়েক বছর আগে একটি মোবাইল ফোন কোম্পানি একজন মহিলার সাইকেলে চড়ার দৃশ্য দিয়ে বিলবোর্ড বানিয়েছিলোসে বিজ্ঞাপন তোপের মুখে পড়েছিলো। এটা নাকি টিপিক্যাল বাঙালি নারীকে উপস্থাপন করে না! অর্থাৎ মেয়েদের চিরদিন রান্নাঘর, স্নানঘর, টয়লেট, গয়না, জামাকাপড় ইত্যাদির মাঝেই আটকে রাখতে হবে। তবেই হবে চিরন্তন বাঙালি নারীর বহিঃপ্রকাশ।

হায় রে বাঙালি সমাজ!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.