”আমাদের গর্ভাবস্থার সময়ে …”: মার্ক জাকারবার্গ

mark mark2 ড. সীনা আক্তার: সম্প্রতি ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ এবং তাঁর স্ত্রী প্রিসিলা জাকারবার্গ এক কন্যা সন্তানের গর্বিত মাতা-পিতা হয়েছেন। মেয়ের নাম রেখেছেন ম্যাক্স। ম্যাক্স এর জন্ম উপলক্ষে মার্ক তাঁর ব্যবসার ৯৯% লভ্যাংশ জনসেবামূলক কাজে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কের এই অনন্য ঘোষণায় বিপুল সংখ্যক মানুষ তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

নতুন বাবা-মা হিসাবেও এই দম্পতি অভিনন্দন, শুভেচ্ছা-ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন। মার্ক এর প্রতি উত্তরে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেই স্ট্যাটাসটিতে একটি বিশেষ শব্দের ব্যবহার আবারো প্রমাণ করলো মার্ক একজন অসাধারণ, চমৎকার গুণ সম্পন্ন স্বামী।

তিনি লিখেছেন, – ‘আমরা অত্যন্ত খুশী ম্যাক্সকে এই বিশ্বে স্বাগত জানাতে পেরে। প্রত্যেকেই (মা এবং শিশু) সুখী এবং সুস্থ আছেন। ”আমাদের গর্ভাবস্থার সময়ে” ভালবাসা এবং সহযোগিতার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ …।’ (We’re so happy to welcome our daughter Max into this world. Everyone is happy and healthy. Thank you for all your love and support through our pregnancy. There is so much joy in our little family.)।

”আমাদের গর্ভাবস্থার সময়ে …”  কী দারুণ একাত্মতা প্রকাশ! এতেই বোঝা যায় স্ত্রীর প্রতি মার্কের মমত্ববোধ, সম্মান এবং ভালবাসার গভীরতা।

গর্ভধারণের কয়েকমাস পরেই মার্ক-প্রিসিলা দম্পতি নতুন শিশুর আগমন ঘোষণা দিয়ে বিশ্বকে জানিয়েছেন। নির্দ্দিষ্ট সময়ে আয়োজিত বেবী শাওয়ারে হবু বাবা মার্ককে দেখা গেছে, উচ্ছাস-আনন্দের সাথে অংশগ্রহণ করতে। পরবর্তীতে এই দম্পতি ‘তাঁদের গর্ভাবস্থার’ নিদর্শন সবাইকে দেখিয়ে সুখ ভাগাভাগি করেছেন। সর্বশেষ গর্বিত বাবা মেয়ের আগমন উপলক্ষ্যে বিশ্বের অন্য শিশুদের কল্যাণে এক অনন্য ঘোষণা দিয়েছেন।

এই পুরো সময়ে প্রতিটা পর্বেই মার্ককে দেখা যায় একজন অসাধারণ, সংবেদনশীল, যত্নবান এবং দায়িত্বশীল স্বামী এবং বাবা হিসাবে। কথায় আছে বিপদে প্রকৃত বন্ধুকে চেনা যায়। তেমনি স্বামী কেমন মানুষ তা বোঝা যায় নারীর অন্ত:সত্ত্বা অবস্থায়।

কারণ এই সময়টাতেই একজন নারীর শারীরিক-মানসিক যত্ন, ভালবাসা এবং সহযোগিতা অতি জরুরি, বিশেষ করে স্বামীর কাছ থেকে। এই সময়ে একজন নারী শারীরিক  মানসিকভাবে কতটা অসহায় বোধ করেন তা কেবল যে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় সেই অনুধাবন করতে পারেন।

এ সময় না না রকম শারীরিক-মানসিক উপসর্গ দেখা দেয়, একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। প্রচলিত উপসর্গ হচ্ছে গর্ভকালীন এবং গর্ভ-পরবর্তী বিষন্নতা (antenatal and postnatal depression)। স্বামীর ভালবাসা এবং আন্তরিক সহযোগিতায় গর্ভকালীন কষ্ট ও অসুবিধাগুলো সহজে মোকাবেলা করা যায় এবং সুস্থ মা ও শিশুর জন্য এটা অত্যাবশ্যক। আমাদের দেশে অধিকাংশ নারীই গর্ভাবস্থায় তাদের স্বামীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় মনোযোগ পান না। অনেক পুরুষ তো আবার বউয়ের এই বিশেষ শারীরিক অবস্থার কারণে অন্য নারীর দিকে ঝুঁকে পরেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত নারীর অভিজ্ঞতায় তেমন কোন পার্থক্য নেই।

সাম্প্রতিক একটা উদাহরণ হচ্ছে সাংবাদিক রাকিবুল ইসলাম মুকুল, যে তার স্ত্রীর গর্ভাবস্থায় স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনই শুধু করেননি, শিশুর দায়িত্ব নিতেও অস্বীকার করেছিলেন এবং অন্য নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন।  

আরেকজন নারীকে জানি যিনি বিদেশী সংস্থায় ভাল চাকরী করতেন এবং পুরো সংসার চালাতেন। বাচ্চা নেবার ব্যাপারে তার স্বামীর তেমন আগ্রহ ছিল না। অনেক মন কষাকষি, কথা কাটাকাটি করে সেই নারী শেষপর্যন্ত অন্ত:সত্ত্বা হন, কিন্তু স্বামী তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন, মুখে কিছু বলতেন না তবে আচার আচরণে নিপীড়ন করতেন।

কোন স্বামী যখন নিজ স্ত্রীর গর্ভের শিশুর ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন, সেই স্ত্রীর প্রতি এর চেয়ে অপমানজনক এবং মানসিক অত্যাচার আর কী হতে পারে! এ যন্ত্রণা কেবল ভুক্তভোগী নারীই অনুধাবন করতে পারেন।

যাই হোক, পুরো গর্ভাবস্থার সময়ে সেই স্বামীটি থেকে ন্যুনতম মনোযোগ সে নারী পায়নি, সেবা-যত্ন তো দূরের কথা। এমনকি চূড়ান্ত গর্ভাবস্থায় বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে সে তীব্র কোমর ব্যথায় কান্নকাটি করলেও সেই স্বামী জিজ্ঞেস করতো না কেন সে কাঁদছে। কথায় কথায় মানসিক অত্যাচার তো ছিলই। এমনকি বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হবার পর হাসপাতালেও সেই স্বামীটি তার সাথে দুর্ব্যবহার করতো। কত শত দুর্ভাগা নারীর জীবনে এমন ঘটনা ঘটেছে/ঘটছে যা অজানাই থেকে যায়।

মার্ক জাকারবার্গ এর মতো একজন ভাল স্বামীই প্রকৃত ভাল মানুষ। স্ত্রী-সন্তান-পরিবারের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও দায়িত্বই প্রমাণ করে তিনি সমাজের বৃহত্তর মঙ্গল সাধনেও সমান দায়িত্বশীল। আর ভাল মানুষরাই সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন এবং কল্যাণে অবদান রাখবে, সেটাইতো স্বাভাবিক।

লেখক: সমাজবিদ।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.