বিয়ের বয়সের বাধ্যবাধকতা মানা হয় না যেখানে

Haat 2সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: কুড়িগ্রামের ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নে ১২,২৫০ পরিবারে বাল্য বিবাহের শিকার মেয়ের সংখ্যা ১৬০৯ জন। যাদের বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। তাদের কারো কারো বিয়ে হয়েছে ৫ বছর আগে। অনেকের ১/২ জন সন্তানও হয়েছে। সম্প্রতি সময়ে জেলা ইমেজ ফোরামের আলোচনায় এই তথ্য জানা যায়।

বিয়ের বয়স যখন ১৮ বছর বাধ্যতামূলক তখনই এমন চিত্র দেখা যায় ইউনিয়নটিতে। টেরেডেস হোমস নেদারল্যান্ডের অর্থায়নে, রেড অরেন্স মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশনের সহায়তায় টেরেডেস হোমস ফাউন্ডেশন গত এপ্রিল থেকে ইমেজ প্রকল্পের মাধ্যমে এই ইউনিয়নে বাল্য বিয়ের শিকার মেয়েদের সহায়তায় কাজ শুরু করে।

ইউনিয়নের  ১১ বছরের বিবাহিত মেয়ে আঁখি। তার বাবার নাম আবুল হোসেন। ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের হদিরডোবা গ্রামের মোন্নাফের (১৯) সাথে তিন মাস আগে বিয়ে হয় তার। আঁখি ফকিরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণীতে পড়তো। বয়স বিয়ের জন্য বাঁধার কারণ হওয়ায় আঁখির বাবা আঁখিকে ঢাকায় নিয়ে বয়স বাড়িয়ে বিয়ে দেয়।

ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় ৯ নং ওয়ার্ডের মহিদেবপুর গ্রামের জ্যোৎ¯œা (১৭)। তার ১ বছর বয়সি এক ছেলে ও ২ মাস বয়সি একটি কন্যা সন্তান আছে। একই গ্রামের আল্পনা (১৫)। তার আছে তিন মাস বয়সের একটি কন্যা সন্তান।  ইউনিয়ন পরিষদের পাশে কৈয়াপাড়া গ্রামের সাবিত্রি (১৬)। তার কন্যা সন্তানের বয়স ৫ মাস। বালাবাড়ি সবুজপাড়া গ্রামের হাসনা(১৫) এখন ৭ মাসের গর্ভবতি।

এই ইউনিয়নের শপপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাজেরা বেগম জানান, আমার বড় মেয়ে লাইলিকে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছি। ১৫ বছর বয়সে মা হয়েছে সে। তার পর থেকে মা ও তার সন্তান সব সময় অসুস্থ থাকে। আমার ছোট মেয়ে মনিকে ১৮ বছরের আগে বিয়ে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়ালেখা করাচ্ছি। বিয়ের বয়স নিয়ে আইনে যাই হোক, আমরা এখন সচেতন হয়েছি। আর কখনই সন্তানদের কম বয়সে বিয়ে দিয়ে তাদের সর্বনাশ করব না।

ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুল মজিদ জানায় জন্মনিবন্ধনে মেয়ের বিয়ের বয়স ১৮ বছর এর নিচে হলে  বিয়ে দেয়া যাবে না এমন বাধ্য বাধকতা থাকায় অধিকাংশ বিয়ে জেলার বাইরে গিয়ে দেয়া হয়। আবার কেউ কেউ জন্ম নিবন্ধনে নাম পরিবর্তন করেও বয়স বাড়িয়ে নিয়ে বিয়ে দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের বয়স কম থাকার পরও বিয়ে হয়।

ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সদস্য মরিয়ম বেগম জানান, বাল্যবিবাহ অপরাধ জেনেও গ্রামের অধিকাংশ  মা-বাবা সন্তানদের কম বয়সে  গোপনে বিয়ে দেয়।  বিয়ের কিছুদিন পরে আমরা বিয়ের খবর জানতে পারি। তখন আর করার কিছু থাকে না। উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয় বলে গোপন করাও সহজ হয়।  কিন্তু এই প্রোগ্রাম বিবাহিত এই মেয়েদের জন্য কাজ করছে, যা খুবই জরুরী। 

ফোরামের সদস্য জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি নন্দিতা চক্রবর্তী জানান, ভোগডাঙ্গা জেলা সদরের একটি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের চিত্র দেখে প্রত্যন্ত ইউনিয়নগুলোর অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। বিয়ের বয়স যখন ১৮ বাধ্যতামূলক ছিল তখনই এই চিত্র। আবার সরকার বিয়ের বয়স নিয়ে যে আইন করেছে, তাতে বাল্য বিয়ের সংখ্যা আরো বাড়বে। বাড়বে নারী স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও। পিছিয়ে পড়তে পারে নারীর শিক্ষা সহ সকল অধিকার প্রাপ্তির সুযোগ।

ইমেজ ফোরামের সভাপতি পাবিলিক প্রসিকিউটর আব্রাহাম লিঙ্কন জানান, বাল্য বিবাহ হলেও বিয়ে যেহেতু বাতিল হয়না তাই  বাল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে পরিবার গুলোকে অবহিত করার কাজ করছে ফোরাম। পাশাপাশি যাদের বিয়ে হয়ে গেছে তাদের যৌনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও অধিকার বিষয়ে সচেতন করার কাজ করা হচ্ছে।

প্রকল্পের অধীনে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে নিয়ে গঠিত ইমেজ ফোরাম কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নে বাল্য বিবাহের শিকার মেয়েদের স্বাস্থ্য, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অধিকার বিষয়ে সচেতন করতে কাজ করছে। পাশাপাশি বিবাহিত এই অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে সম্পৃক্ত করছে, যাতে পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে সহায়ক হয়।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.