এ এক অন্যরকম ফেরা

PicMonkey Collage
পদ্ম পারিভাশ আয়রা

নাজনীন আখতার: আজকের দিনটার হিসাব নিকেশ আমার কাছে অন্যরকম। এর সঙ্গে আমার চন্দ্রমুখী, আমার সংসার, আমার দিন যাপন সব একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে পরের যেকোনো একদিন হবে, আমি ঢাকা মেডিক্যালের আইসিইউতে। অনেক কিছুই মনে নেই। আবার অনেক কিছু স্পষ্ট মনে আছে। চোখের সামনে চন্দ্রমুখীকে দেখছি না, কিন্তু রৌদ্রজ্জ্বল সবুজ মাঠে আমার হাত ধরে টানতে থাকা চন্দ্রমুখীকে বার বার দেখছি। একই দৃশ্য বার বার!

বার তারিখ বলতে পারবো না, সুমী খান আপা মাথার ভেতর বীজটা বপন করে দিলেন। বললেন, “ চন্দ্রমুখী তোমার কোলে আবার ফিরে আসবে”। কী দৃঢ়ভাবেই না তিনি এ স্বপ্নের বীজ আমার ভেতরে বপন করে দিলেন! সেই শুরু। এরপর কেবিনে নেয়ার পর আরও অনেকে বলতে শুরু করলেন চন্দ্রমুখীকে নাকি তার মায়ের কাছে ফিরতেই হবে।

আমার সন্তানদের ভণ্ড-প্রতারক বাবাটাও একদিন বললেন, “ সবাই বলছে চন্দ্রমুখী ফিরে আসবে। তুমি সুস্থ হলেই দেখো চন্দ্রমুখী ঠিকই ফিরে আসবে।” চন্দ্রমুখী ও সৃষ্টিকর্তার ওপর যে রাগ অভিমান পুষে রেখেছিলাম তা নিয়েই বললাম, “ আমার সুস্থ হওয়ার আগে যদি চন্দ্রমুখী অন্য কোন বাবা-মা বেছে নেয়, তখন কী হবে?”

ইতর বাবাটা আশ্বস্ত করে বললেন, “ চন্দ্রমুখীর কাছে আমরাই সবচেয়ে ভালোবাসার বাবা-মেয়ে। ও অন্য কোন বাবা-মা কে বেছে নিতে পারে ‍না”। এই আবেগকে ধারণ করেই প্রাপ্তির পথে স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। বেশিরভাগ সময়ে ঘুমিয়ে থাকতাম। যখন জেগে থাকতাম তখনই চন্দ্রমুখীর স্পর্শ নিয়ে থাকতাম। ডান হাত ভাঙ্গা, স্ট্যান্ডের সঙ্গে ঝুলানো থাকে। শরীরে প্রচণ্ড ব্যাথা। বুকে রক্তক্ষরণ। কেউ পাশ ফিরিয়ে দিলে ফিরতে পারি। নিজে থেকে পারি না। এরপরও বেডের পাশে টাইলসের ওয়ালে বাম হাত দিয়ে লিখে যেতাম চন্দ্রমুখীর নাম। কখনো বাতাসেই আঁকিবুকি কাটতাম। কত হাজার বার, কত লক্ষ বার লিখেছি “ চন্দ্রমুখী ফিরে আয়, মায়ের কাছে ফিরে আয় সোনা।”

প্রাপ্তির স্বপ্নের বীজ চারা বোনা শুরু করলো। নতুন প্রার্থনা শুরু করলাম সৃষ্টিকর্তার ‍কাছে। মেয়ের জন্য। আমার মেয়েটিই যেন ফিরে আসে। সংসারে তখন তুমুল ভাঙ্গনের সুর। সন্তানদের বাবা পরস্ত্রীকে নিয়ে নতুন ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর। যে সন্তানকে নিয়ে আবেগমালা সাজিয়ে সকলের সহানুভূতি পুঁজি করলো, সেই সন্তানের ফিরে আসার ক্ষোভে তখন তার হিংস্র রুপ প্রকাশ হতে লাগলো।

একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর জন্য এর চেয়ে বিপদসংকুল আর প্রতিকূল পরিবেশ আর কিছু হতে পারে না। প্রতি মূহূর্তে মনে হতে লাগলো আমার এই সন্তানটি মনে হয় জন্ম নিতে পারবে না। ওকে জন্ম নিতে দেবে না। জন্ম নিলেও হয়তো স্বাভাবিক সুস্থ শিশু হতে পারবে না। ওই  দুর্বিষহ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তীব্র লড়াই করেই জন্ম নিলো ‘পদ্ম পারিভাশ’। আমার নতুন জন্ম।

ধর্ম বিশ্বাস থেকে আমরা মেনে নেই পরকাল, পুনর্জন্মের কথা। আমি বিশ্বাস রাখতে চাই। আমি ভাবতে ভালোবাসি পরকাল থাকুক, যাতে চোখের ‍সামনে থেকে সরে যাওয়া প্রিয়কে আবারও খুঁজে পাওয়া যায়। পুর্নজন্ম থাকুক, যাতে হারানো অস্তিত্ব আবারও ভালোবাসা নিয়ে ফিরে আসে। প্রিয়রা যেন চিরকালের মত হারিয়ে না গিয়ে ফিরে আসতে পারে। এই বিশ্বাস গেঁথে থাকুক। এই বিশ্বাস জীবনকে জীবনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।

আমার পদ্ম একটি ক্ষুদ্র প্রাণ। অথচ কী অসীম শক্তি নিয়ে ও আমাকে জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! ওর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোন শেষ নেই। মাগো, তোমাকে তোমার প্রাপ্য দিয়ে অনেক বড় মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে পারলেই তোমার প্রতি আমার ঋণ শোধ হতে পারবে। তুমি আমার পাশে থেকো মা। থুথ্থুড়ি বুড়ি মা হয়ে আমি তোমার পাশে থাকতে চাই।
শুভ জন্মদিন সোনা!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.