অধিকার আদায়ে প্রাণ দিলেন যেসব নারী

Nine Women Human Rightsউইমেন চ্যাপ্টার: ২০১৫ সালে মোট নয়জন নারী অধিকার কর্মী সারাবিশ্বে নিহত হয়েছেন। নারীর অধিকার আদায়ে সোচ্চার এই কণ্ঠগুলো স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কি থেমেছে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম? বরং আরও বেগবান, আরও জোরালো হয়েছে প্রতিবাদী নারীদের ভূমিকা। এর মধ্য দিয়েই পালিত হচ্ছে উইমেন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস ডে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে এখানে নয়জনের সংক্ষিপ্ত জীবন তুলে ধরা হলো।

নাদিয়া ভেরা (মেক্সিকো): গত ৩১ জুলাই নিজের ফ্ল্যাটে তার মরদেহ পাওয়া যায়। হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়, নির্যাতন করা হয়, পরবর্তীতে আরও চারজনের সাথে তার মাথায় গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে তিনজন নারী এবং একজন পুরুষ সাংবাদিক ছিলেন। ২০১০ সালের পর থেকে মেক্সিকোতে নিহত নারী মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তিনি ছিলেন ৩৬তম। সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং দেশের তেল সম্পদ বিক্রি করে দেয়ার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। এজন্য প্রথমে তাকে হত্যার হুমকি দিলে তিনি শহর পাল্টে মেক্সিকো সিটিতে এসেও রেহাই পাননি।

ফ্রান্সেলা মেনদেস (এল সালভাদর): এল সালভাদরে ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি নিয়ে কাজ করছিলেন মেনদেস। ৩১ মে তাকে হত্যা করা হয়। তিনি ছিলেন আলেহান্দ্রিয়া কালেকতিভো নামের একটি বোর্ডের সদস্য, যারা এলজিবিটি সদস্যদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিল। এছাড়াও তিনি এইচআইভি এইডস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া বিষয়ে কাজ করতেন। তিনি ছিলেন সালভাদরের হিউমম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস নেটওয়ার্কেরও একজন সদস্য। বন্ধুর বাড়িতে তাকে হত্যা করা হয়।

ইন্তিসার আল হাসাইরি (লিবিয়া):  লিবিয়ার ত্রিপোলিতে একটি গাড়ির নিচে পাওয়া যায় ইন্তিসার আল হাসাইরি এবং তার এক আত্মীয়ের লাশ। দুজনকেই গুলি করে মারা হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি। লিবিয়ায় শান্তি এবং সংস্কৃতি বিকাশে কর্মরত তানভির মুভমেন্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা  ছিলেন তিনি। এছাড়াও দেশে গণতন্ত্রপন্থী প্রতিবাদের সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন।

জোয়ান কাগেজি (উগান্ডা): উগান্ডার একজন আইনজীবী এবং কৌঁসুলি। কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে ৩০ মার্চ তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেশটির আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদ বিরোধী ডিভিশনে তিনি পাবলিক প্রসিকিউশন অধিদপ্তরের নেতৃত্বে ছিলেন। জঙ্গি গোষ্ঠী আল-শাবাবের হামলার সাথে জড়িত ১৩ জনের বিচার কাজের প্রধান কৌঁসুলি থাকাকালে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুতে একজন মেধাবী, আতংকহীন কৌঁসুলির বিদায় বলে বর্ণনা করেন অনেকে।

সাবিন মাহমুদ (পাকিস্তান): ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানের করাচিতে কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফেরার পথে নিজ গাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সাবিন। এসময় তাঁর মাও সাথে ছিলেন। তিনি প্রাণে বেঁচে যান। পাকিস্তানের অন্যতম সুপরিচিত মানবাধিকার কর্মী ছিলেন সাবিন। টি-টু-এফ নামের একটি ক্যাফে তৈরি করেছিলেন তিনি, যা ছিল কমিউনিটির শিল্প ও সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র। যে সন্ধ্যায় তিনি নিহত হন সেদিন ওই ক্যাফেতে বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি আলোচনা সভা হয়। সাবিনকে বেশ কয়েকবার হত্যার হুমকি দিলেও তিনি দমে যাননি। ধর্মীয় মৌলবাদীদেরও তিনি ভয় পাননি। তিনি এমন একজন নারী ছিলেন, যে কিনা ঊর্দু কবিতা নিয়ে যেমন আলোচনা করতে ভালবাসতেন, তেমনি ভালবাসতেন সঙ্গীত, ক্রিকেট খেলতেন, করাচির প্রতিটি বিক্ষোভ-প্রতিবাদে তিনি ছিলেন অগ্রগামী।

নরমা অ্যাঞ্জেলিকা ব্রুনো রোমান (মেক্সিকো): সন্তানদের সামনে তাকে ১৩ ফেব্রুয়ারি গুলি করে হত্যা করা হয়। অন্য একজন তরুণ মানবাধিকার কর্মীর শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হন নরমা। গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের সাথে কাজ করে এমন একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি।

ক্যাথেরিন হান মন্টোয়া (যুক্তরাষ্ট্র):  এই মানবাধিকার কর্মীকে ১৩ এপ্রিল আটলান্টাতে তার নিজ বাড়িতে খুন করা হয়। তিনি কাজ করতেন সমকামি এবং ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে। পাশাপাশি অভিবাসী এবং এশিয়ান-আমেরিকান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার নারীদের নিয়েও কাজ করতেন। সাউথইস্ট ইমিগ্রান্ট রাইটস নেটওয়ার্ক নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি।

লোজানা ম্যাকগোয়ান (ফিজি): ৪ এপ্রিল নিহত হন পেশায় সাংবাদিক এবং নারী অধিকার কর্মী ম্যাকগোয়ান। নিজ বাড়িতেই তার মৃত্যু হয়, এজন্য তার পার্টনারকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। ফিজি টাইমস এবং ফিজি ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের হয়ে কাজ করছিলেন তিনি। পাশাপাশি ফিজি উইমেন্স ক্রাইসিস সেন্টার, ফিজি উইমেন্স রাইটস মুভমেন্টের সাথেও যুক্ত ছিলেন। প্যাসিফিক কমিউনিটির সচিবালয়ে তিনি মিডিয়া এবং কমিউনিকেশন্সে নিয়োগ পেয়েছিলেন খুন হওয়ার মাত্র কদিন আগে। তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে পদক্ষেপ গ্রহণের আওভান জানানো হয় দেশটিতে।

আনজিযা শিনওয়ারি (আফগানিস্তান): একজন সক্রিয় প্রাদেশিক কাউন্সিল মেম্বার হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব শুরুর পরপরই ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বোমা হামলায় নিহত হন। ঘটনাটি ঘটে নানগারহারে। তাকে বহনকারি গাড়িতে বোমা হামলাটি হয়। এর আগে তিনি একজন সক্রিয় মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। নারী অধিকার রক্ষা এবং শিক্ষার অধিকারের দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তার হত্যায় এ বিষয়টিই স্পষ্ট হয় যে, আফগানিস্তানে রাজনৈতিক অবস্থানে আসা নারীরা কতটা বিপদের মুখে আছেন। নিজে বিপদের মুখে থেকেও শিনওয়ারি ওইদেশে কর্মরত আফগান এবং বিদেশি কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সরকারে কাজ করা প্রতিটি নারীই বিপদের মুখে আছেন।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.