এই প্রজন্ম বিগড়ে গেলে কিন্তু খবর আছে

Facebookসুমন্দভাষিণী: প্রিয় তারানা আপাকে বলছি, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন প্রজন্মের আওভান? গত কয়দিন ধরেই ঘুরে-ফিরে নিউজফিডে বিভিন্ন জনের লেখা আমার চোখে পড়ছে, তারা আপনাকে ‘সবিনয়ে’ অনুরোধ জানাচ্ছে ফেসবুকসহ বন্ধ সামাজিক মাধ্যমগুলো খুলে দিতে। তারা আপনাকে বিভিন্ন কায়দায় চিঠিও লিখছে। এর আগে তারা আপনাকে নিয়ে বিভিন্ন রকম পোস্টারও বানিয়েছিল। শুনেছি এবং আপনার লেখাতেও পড়েছি যে, সেগুলোর অনেকগুলোই নাকি কদর্য পোস্টার ছিল। যদিও এগুলোর একটিও আমার দেখার দুর্ভাগ্য হয়নি। বরং আমি যেগুলো দেখেছি, সেগুলো ভীষণভাবেই শ্লীল ছিল, অভিমানের ছিল, আপনাকে একসময়ে অভিনেত্রী হিসেবে ভাললাগার আকুতিও ছিল। আমি সেগুলো পড়েছি আর হেসেছি ছেলেপিলেগুলোর রসজ্ঞান দেখে। কিন্তু বিষয়টা এখন আর এতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না।

বিশেষ করে আপনার লেখাটা পড়ার পর থেকে সেই লেখার চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেছে। সেখানে ব্যবহৃত একটি ভুল উদাহরণ থেকে আপনার জ্ঞানের পরিধি নিয়েও ওরা কথা বলছে, যা আমার গায়েও এসে লাগছে। কলেজ জীবনে আপনি আমার এক ইয়ার সিনিয়র ছিলেন, আপনার পরীক্ষার ফলাফল ছিল মারাত্মক রকমের ভাল। অভিনয় জীবনে, আইনজীবী হিসেবেও আপনি ভাল সাক্ষর রেখেছেন। আপনাকে যখন সংসদে মনোনয়ন দেয়া হয়, আপনার স্পষ্ট বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, ‘এইতো, আমাদের ভবিষ্যত নেতা পেয়ে গেছি’। অযোগ্যদের ভিড়ে আপনারা মাত্র কজনাই এখন পর্যন্ত আমাদের হিসাবের মধ্যে আছেন। বাকিরা বাদের খাতায় চলে গেছে সেই কবে।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং চিত্রগ্রাহক ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর আপনি যেভাবে সরব হয়েছিলেন সংসদে, তখন আপনাকেই আমরা কজনা সামনে রেখে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই’ ব্যানারে আন্দোলনটা চালাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি তখন নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। আসেননি। হয়তো আমরা যোগাযোগ মন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়ায় আপনার দলীয় সমস্যার কারণেই আসেননি। হয়তো। কিন্তু আমরা সেইসময় খুব চেয়েছিলাম আপনার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। আপনি সেই ট্রেনটা মিস করেছেন। সেসময় একটা সুযোগ ছিল জনতার সমর্থন পাওয়ার। পুরো দেশের জনমত তখন আমাদের গুটিকয়ের আন্দোলনের সাথে একাত্ম ছিল। যাকগে সেকথা।

আপনাকে যখন নতুন এই দায়িত্ব দেয়া হয়, এবারও আমরা খুশি হয়েছিলাম। এক, আপনাকে যোগ্য মনে করেছি। দুই, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে নারী। একজন নারী হিসেবে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এর বিকল্প আর হতে পারে না।

এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব যখন সাহারা খাতুনকে দেয়া হয়েছিল, আমরা তখনও খুশি হয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপে, এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্বে দীপুমনি আপাকে পেয়েও। কিন্তু তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন নিজেদের স্বকীয়তা স্থাপনে। ঊনারা আজ্ঞাবাহকই থেকে গেছেন কেবল। ফলে আমাদের নারীদের বিভিন্ন সময়েই নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাদের ক্ষমতাহীনতা আর কিছু করতে না পারার অজ্ঞতার কারণে।

এরপর স্পিকার হিসেবে পেয়েছি শিরীন শারমীন চৌধুরীকে। সে আমার ক্লাসমেট। এসএসসিতে প্রথম এবং এইচএসসিতে দ্বিতীয় আর অনার্স-মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া শিরীনকে স্পিকার হিসেবে পেয়ে আমরা আবারও উল্লসিত হয়েছি। পরবর্তীতে আপনাকে পেলাম। সেও আমাদের প্রজন্মের জন্য খুবই সৌভাগ্যের বিষয়।

কিছুদিন আগে একটা বিষয় নিয়ে আপনার সাথে জটিলতা তৈরি হলেও আমাদের দুজনের পারস্পরিক সমঝোতায় তার আপাত সমাধান হয়েছে বলেই মনে করছি। সেখানে অনেকের অনুরোধ ছিল। তাই ফেলতে পারিনি। বিশেষ করে আপনার মর্যাদা তাতে ক্ষুণ্ন হোক, আমি চাইনি।

এবার দুজন হেভিওয়েট যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি উপলক্ষে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্তকে আমরা প্রথমদিকে স্বাগতই জানিয়েছি। দেশের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে আমরা তা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তা কতদিন? এখন তো সব শেষ। এখনও বন্ধ রেখেছেন কাদের পরামর্শে? যারা আপনাকে মন্ত্রণালয়ে পরামর্শ দিচ্ছে তাদের কথায়? তারা কারা? যাদের নিয়ে প্রশ্ন বা বিতর্ক আছে, তারা নয়তো? যদি তা না হয়, তবে আপনি প্লিজ একটু প্রজন্মের আওভানটুকু শুনুন। ওরা এখন বিনয় করছে। ভয় হয়, এই বিনয় ঔদ্ধত্যে পরিণত হতে সময় লাগবে না। তখন আপনি বা আপনার মন্ত্রণালয়ের ওইসব ছেলেরা তা সামাল দিতে পারবেন না। এটা আমার অনুরোধ আপনার কাছে। বরং আপনি এদের কাজে লাগান। দেখবেন ওরা বুক পেতে দেবে আপনার জন্য। আমি ওদের চিনি ও জানি।

আপনি তো বন্ধ হওয়া মাধ্যমের কোনটাই ব্যবহার করেন না মনে হয়। ফেসবুকেও নেই আপনি। আপনি তাহলে কী করে জানবেন এর জনপ্রিয়তার কথা, এর মাধ্যমে যে বিশাল অসাধ্য আমরা সাধন করে চলেছি, সেইকথা।  আপনি যে ‘টেক-ফ্রেন্ডলি’ নন, তা আমরা বুঝে গেছি। আমরা যারা আন্দোলন করি, আমাদের কথা ফেলবেন না আপা। আমাদের অনেক কাজ সামনে। সেই কাজে অসুবিধা হচ্ছে এসব বন্ধ থাকায়। 

এই প্রজন্ম অনেক কিছু জানে, অনেক কিছু পারে। এরা কিন্তু কোনরকম আপোসে যাবে না। একবার যদি বিগড়ায় তখন সামাল দিতে পারবেন কিনা ভেবে দেখুন। বরং আপনি তাদের কাতারে নেমে আসুন। হাত মেলান, দেখবেন আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশের সাথে এদের স্বপ্নের কোনোই ফারাক নেই। শুধু মানুষের কাতারে শামিল হোন আপা। প্লিজ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.