তারানা হালিমের কাছে খোলা চিঠি

Tarana Halimকাজী মামুন: মাননীয় প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, শীতের সকালের নরম রোদের শুভেচ্ছা। আপনার চিঠি পেলাম। আপনি এতটা সময় নিয়ে যত্ন করে লিখেছেন, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন সবকিছু, এজন্য অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু মজার ব্যাপারটা দেখুন – ফেসবুক না থাকলে আপনার এত কষ্ট করে লেখা চিঠিটা হয়তো কোনদিনই আমার কাছে পৌঁছাতো না।

আমার এক বন্ধু এক অনলাইন পত্রিকায় ছাপা হওয়া চিঠিটা ফেসবুকে শেয়ার দিল বলেই চিঠিটা আমার হাতে পৌছালো। ১০১টা অনলাইন পত্রিকা প্রতিদিন হাজার হাজার চিঠি-খবর-বিশ্লেষণ প্রকাশ করে কয়টার খবর পড়বো? ফেসবুক এক্ষেত্রে দারুণ এক ফিল্টারের কাজ করে আমাদের জন্য- এখানে গুজব ছড়ানোর জন্য বাঁশের কেল্লা, রেডিও মুন্না যেমন আছে তেমনি তাদের অপপ্রচার ঠেকানোর জন্য আছে লক্ষ কোটি নিবেদিতপ্রাণ ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানো শব্দসৈনিকেরা।

শেয়ার বাটন এ ক্লিক করার সাথে সাথেই আমার লিস্ট এর কয়েক শ বন্ধুর হোম পেইজ এ পৌঁছে গেল এই পোস্ট, ওদের মধ্যে থেকে কেউ আবার লাইক-কমেন্ট-শেয়ার করলে আরো কয়েক শ। এখানে কতজনের কাছে আমি মিথ্যা-অপপ্রচার করে টিকে থাকতে পারবো বলেন? আর পাশের ট্যাবেই হয়তো কারো গুগল খোলা আছে, এখানে আমি কোন ভুল তথ্য দিলে নিমিষেই সে যাচাই করে নিয়ে প্রতিবাদ করতে পারছে।

ওহ আপনার দেয়া একটা ভুল তথ্য সম্পর্কে বলে নেই আগে, সাঈদীকে চান্দে দেখা যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে নাশকতা কিন্তু ফেসবুক থেকে হয়নি। গ্রামের মসজিদে মাইকিং করে, মোবাইলে মেসেজিং করে ছড়ানো হয়েছিল। ফেসবুককে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, নানা রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে প্যারোডি করে আমরা বরং সেই অপপ্রচারকে খুব দ্রুত বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। অথচ নাশকতার আশংকায় আপনি কিন্তু মোবাইল বন্ধ করেননি, মসজিদের মাইক বন্ধ করেননি, বন্ধ করেছেন ফেসবুক।

ইন্টারনেট এর কল্যাণে সামান্যতম তথ্য-বিকৃতিও খুব সহজেই ধরে ফেলা যায়। ঐ যে কোন এক বাঁশের কেল্লা বা রেডিও মুন্নায় আপনি পুলিৎজার সাংবাদিক এবং তাঁর তোলা শকুন ও শিশুর ছবিটার কথা পড়েছেন না, ওরা এই পোষ্টগুলো ইচ্ছে করেই রসিয়ে কিছুটা বাড়িয়ে লিখে। আপনি চাইলে ওদের পরিবেশিত পোস্টে কোন তথ্য বিকৃতি আছে কীনা এটাও পোস্টের নিচের মন্তব্য থেকেই পেতে পারতেন। তো এই গল্পে তথ্য বিকৃতিগুলো কেমন?

ওদের পোস্ট পড়ে আপনি বললেন- “কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শিশুটি মারা গেল”। শিশুটা আদৌ মারা গেল নাকি বেঁচে গিয়েছিল তা কিন্তু কখনোই জানা যায়নি। আর সত্যি ঘটনাটা হলো– এই বাচ্চাটার বাবা-মা বাচ্চাটাকে এখানে রেখে কাছেই একটা রিলিফের ফুড ট্রাক থেকে খাবার সংগ্রহ করেছিল। এই ফাঁকে শকুনটা নেমে এসেছিল। ফটো জার্নালিস্ট কেভিন কার্টার বসেছিল কাছাকাছিই শকুনটা নেমে আসার পর কয়েকটা ছবি তোলার পর সে শকুনটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।

এরপরও প্রশ্ন উঠেছে কেন সে বাচ্চাটাকে ধরেনি? কারণ হলো ছোঁয়াচে রোগের কারণে ঐ সময়ে সাংবাদিকদের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো কোন বাচ্চাকে হাত দিয়ে ধরার। কেভিন এই ছবির জন্য পুরষ্কার পেয়েছিল এটা সত্যি হলেও এই ছবির ঘটনার জন্য সুইসাইড করেছে এটা মিথ্যা। হুম, আফ্রিকার কাজ করার সময়ে পুরো ব্যাপারটা নিয়েই তার মধ্যে ডিপ্রেশন তৈরি হয়েছিল- এর সাথে সরাসরি এই বাচ্চাকে বাঁচানো কিম্বা না বাঁচানোর কোন সম্পর্ক নেই- তাঁর সুইসাইড নোট দেখুন-

“I am depressed … without phone … money for rent … money for child support … money for debts … money!!! … I am haunted by the vivid memories of killings and corpses and anger and pain … of starving or wounded children, of trigger-happy madmen, often police, of killer executioners … I have gone to join Ken [recently deceased colleague Ken Oosterbroek] if I am that lucky.”

আপনি বহুদেশের নিরাপত্তার কারণে ইন্টারনেট বন্ধ করার কথা বললেন, কোন কোন দেশের কথা বলছেন উল্লেখ করলে বিশ্লেষণ করা সহজ হতো। কিউবা কিম্বা নর্থ কোরিয়া? নর্থ কোরিয়ার নিজস্ব ইন্টারনেট আছে তবে আমাদের দেশের ৯৯ ভাগ মানুষ কিউবা বা নর্থ কোরিয়া হতে চায় না, এটা আমি নিশ্চিত বলতে পারি। চীন এর ফেসবুক বন্ধের কথা বলবেন? চীনের কারণটা নিরাপত্তা না, কারণটা বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক। ফেসবুক বন্ধ থাকলে কী হবে, ওদের দেশের নিজস্ব যে সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো সেই ২০০৮/৯ এ দেখেছি, ফেসবুক এখন পর্যন্ত এতটা উন্নত হয়নি।

আপনি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে নিরাপত্তার অজুহাত দেখাচ্ছেন বারবার, আমাদের এমন কোনো তথ্য- অধিকার আইন কী আছে যার মাধ্যমে আমরা আপনাদের কাছে জানতে চাইতে পারি ঠিক ফেসবুক বন্ধ রেখে ঠিক কোন প্রকৃয়ায় আপনারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন? শিয়া মসজিদে তো গতকালও গুলি করে হত্যা করা হলো মুয়াজ্জিনকে – বিদেশীদের গুলি করার মতো ঠিক একি কায়দায় তিন যুবক- মোটর সাইকেলে। ও্ইদিকে আবার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, ফরিদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক, সাহসী মানুষ অলক সেনকে মঙ্গলবার বিকেলে ফরিদপুর শহরের রামকৃষ্ণ মিশন সংলগ্ন রামকৃষ্ণ পল্লীর নিজের বাসার সামনে নৃশংস ভাবে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বাঁশের কেল্লা, রেডিও মুন্না তো ঠিকই চালু আছে। নাকি আমাদেরকে চোখ বন্ধ রেখে আপনি আমাদেরকে নিরাপদ, নিরাপদ ভাব নিয়ে থাকার কথা বলছেন?

আপনি যদি সত্যিই টেলিযোগাযোগকে নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবহার করতে চান, আপনি জানেন কি বাংলাদেশের ছেলেরা এখন গুগল-নাসা-মাইক্রোসফট এর নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে? রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে এসে তাদের ২/১ জনকে সাময়িকভাবে কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিন না, আমি নিশ্চিত দেশের ডাকে তারা যাবেই। তারা অবশ্যই পারবে আপনার চাহিদামাফিক নিরাপদ ইন্টারনেট গড়ে দিতে।

মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, আপনি আমার প্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর খুবই খুশি হয়েছিলাম। আপনি যে কাজগুলোর কথা বললেন সেগুলো অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। আরেকটা কাজ করুন না দয়া করে! এই যে আমাদের অর্ধেকের বেশি ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ক্যাপাসিটি অব্যবহৃত পড়ে আছে, জানেন তো এটা ঠিক তেল এর খনির মতো না যে ব্যবহার করলে শেষ হয়ে যাবে। সুতরাং দয়া করে ইন্টারনেট এর স্পিডটাকে সবার জন্য অন্তত দ্বিগুণ করে দিতে পারবেন? আইএসপিগুলো এই শর্ত দিয়ে দিন যে তোমাকে আমি দ্বিগুণ ব্যান্ডউইডথ দিচ্ছি তুমি গ্রাহকের কাছে দ্বিগুণ ব্যান্ডউইডথ পৌঁছে দিবে- এরজন্য আমি তোমার কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিবো না, তুমিও গ্রাহকের কাছ থেকে নিতে পারবে না।

আপনি চাইলেই পারবেন এই প্রত্যাশা এখনো রাখি।

শুভ কামনা!

বিনীত

কাজী মামুন, পিএইচডি গবেষক – সফটওয়ার প্রকৌশল (কানাডা থেকে)

বিঃ দ্রঃ ফেসবুকে আমাদের সমালোচনার জবাবে আপনি চিঠি লিখেছেন, চিঠিটা পেয়েছিও ফেসবুকের মাধ্যমে, উত্তরটাও তাই ফেসবুকের মাধ্যমেই আপনার কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি।

(লেখাটি অনলাইন পত্রিকা নতুন দেশ থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ধন্যবাদ কেভিন কার্টার এর ঐ ছবি সম্পর্কে সত্যটা জানানোর জন্য। মাননীয় মন্ত্রী যে গল্প বিশ্বাস করেছেন, প্রথম যখন শুনি (মানে পড়ি আর কি) তখন আমিও তেমন বিশ্বাস করেছিলাম। পরে নিজেই গুগলে সার্চ করে আর একটু প’ড়ে আসল সত্য জেনেছিলাম। আমি গল্পটি রেফার করিনি কোথাও ; তবুও ঐ হোমওয়ার্ক করার কষ্টটুকু স্বীকার করে নিয়েছিলাম।

মাননীয় মন্ত্রীও গল্পটা রেফার করার আগে সত্যটা জেনে নিতে পারতেন। সেটা কঠিন ছিলো না তাঁর জন্যে।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.