ওয়াসফিয়ার সেভেন সামিট জয়

Wasfia 2উইমেন চ্যাপ্টার: পৃথিবীর কোনো উচ্চতাই আর উঁচু নয় আমাদের মেয়েদের কাছে, ওয়াসফিয়া নাজরীন তাই প্রমাণ করেছেন সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ সাতটি শৃঙ্গ জয়ের মধ্য দিয়ে। এর নাম রাখা হয়েছিল ‘সেভেন সামিট’। গতকাল ২৫ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার কার্সটেসন পিরামিড পর্বত শৃঙ্গ জয়ের মধ্য দিয়ে কেবল সেভেন সামিটই শেষ করেননি ওয়াসফিয়া, রক্ষা করেছেন দেশকে দেয়া তাঁর অঙ্গীকার।

দেশের নাম সমুন্নত করার পাশাপাশি নিজের এবং সমগ্র বাংলাদেশি নারীর মাথাও উঁচু করে তুলে ধরেছেন তিনি। এমন একদিন তাঁর এই সামিট শেষ করলেন ওয়াসফিয়া, যেদিনটি আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে বিশ্বে পালিত হলো।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ওয়াসফিয়া তাঁর ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,  হিমালয়ের চেয়েও জটিল এবং কঠিন এই কার্সটেসন পিরামিড পর্বত শৃঙ্গ জয় করা। সেখান থেকে যে তিনি ফিরে আসতে পারবেন যে কল্পনাও করতে পারেননি। ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত মাউন্ট কার্সটেনস নামের পর্বতের শৃঙ্গটি পুঞ্জাক জায়া নামেও পরিচিত, যার উচ্চতা ৪৮৮৪ মিটার।

তিনি বলেন, পুরো পাহাড়টি গ্রানাইট পাথরের। একটি চূড়া থেকে অন্য চূড়ায় যেতে হয় দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে। ওয়াসফিয়া বলেন , “ বিশ্বাস করেন, আর নাই করেন- কার্সটেসন পিরামিড আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন ও দূর্গম পাহাড়। এভারেস্টের চেয়েও।”

এই পর্বতের চূড়ায় উঠতে গিয়ে পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন ওয়াসফিয়া। পাহাড়ের বেসক্যাম্পে পৌঁছাতে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠির সাথে দেখা হয়।  যাদের মধ্যে নানা ধরনের কুসংস্কার এবং হিংস্রতা রয়েছে। বিপদ সেখানে পায়ে পায়ে হাঁটলেও পিছু হটেননি ওয়াসফিয়া।

তাঁর বর্ণনায় বলছিলেন, পর্বত আরোহণ শেষ করে ওয়াসফিয়া যখন ফিরছিলেন তখন একটি গ্রামে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি মারা যায়। সেজন্য দায়ী করা হয় ওয়াসফিয়া ও তার সহযোগিদের! কারণ সেই গ্রামের লোকজন বিশ্বাস করে বিদেশীদের আগমনের কারণেই সেই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে! এমন কুসংস্কার প্রচলিত আছে পর্বতের পাদদেশের গ্রামগুলোতে। শুধু তাই নয়, ওয়াসফিয়াদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে সালিশ বৈঠকের পর চার হাজার ডলার মুক্তিপণ দিয়ে জীবন হাতে নিয়ে ফিরে আসেন। 

তিন বছর ধরে সেই পর্বতে ওঠার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশের এই পর্বতারোহী। কিন্তু অনেক দূর্গম পাহাড় হবার কারণে এর আগে তার কয়েকটি চেষ্টা বিফল হয়। তিনি বলেন, গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে এবং ২২০ কি.মি. পথ হেটে কার্সটেসন পিরামিড পর্বতের বেসক্যাম্পে যেতে হয়।

পর্বতের একদিকে সোনার খনি থাকায় সেখানে আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ান মাফিয়াদের আনাগোনা। ওয়াসফিয়ার ভাষায়, মাফিয়াদের অস্ত্র এবং অন্যদিকে স্থানীয় বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠির মধ্যে তীর ধনুকের মারামারি, এই দুয়ের মধ্য দিয়েই তিনি পাড়ি দিয়েছেন সংকুল সেই পথ।

তাঁর ভাষায়, হিমালয়ের চেয়েও কঠিন কার্সটেসন পিরামিড পর্বত শৃঙ্গ জয়। “হিমালয়ে ওঠার সময় শেরপারা রাস্তা বানিয়ে দেয়। আপনি দড়ি ধরে ধরে উঠবেন। এখানে ওরকম কিছু নেই। সবকিছু নিজের করতে হয়।” তিনি বলেন, “ নিরাপদে পৌঁছাতে পারবো কিনা সেটা নিয়ে সংশয় ছিল। সামিটের দিন আমি বাচ্চাদের মতো কাঁদছিলাম।”

কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানোর পর এবং সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানোর পর পুরো অনুভূতিই তাঁর পাল্টে যায়। একটাই মনে হচ্ছিল যে, তিনি কথা রাখতে পেরেছেন। স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তিতে তিনি দেশের কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, ‘সেভেন সামিট’ করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন, নারীর ক্ষমতায়নের, নারী স্বাধীনতার পথে আরেকটি ধাপের সূচনা করবেন, সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রেখেছেন। চার বছর আগে শুরু হয় তাঁর এই কর্মসূচি। 

২০১২ সালে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা ওয়াসফিয়া এর আগে আফ্রিকার মাউন্ট কিলিমানজারো, এশিয়ার মাউন্ট এভারেস্ট, অ্যান্টার্কটিকার মাউন্ট ভিনসন, ইউরোপের এলব্রুস, উত্তর আমেরিকার মাউন্ট ডেনালি, দক্ষিণ আমেরিকার অ্যাকোংকাগুয়া পর্বতশৃঙ্গ জয় করেছেন।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেভেন সামিট বিজয়ী বাংলাদেশের এই পর্বতারোহীকে অভিনন্দন উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.