হাতিয়ারটা আগলে রেখো, কাজে লাগবে

1

SAKAইশরাত জাহান ঊর্মি: ঢাকার আকাশটা একটু বেশিই নীল লাগছিল যেন ২২ নভেম্বর রোববার। হতে পারে কারণটা সায়েন্টিফিক। ঢাকায় নীল আকাশ দেখা যায় না বললেই চলে, ভোরবেলা যখন দুষণমুক্ত থাকে চারদিকটা তখনই যেন মনে করিয়ে দেয়া যে আকাশের রঙ নীলও হয়। রাত পার হয়েছে আধোঘুম আর আধোতন্দ্রায়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল আজকের সকালটা বেশিই তাজা, আজকের সকালটা বেশিই স্নিগ্ধ।  সত্যি বলছি, ঠিক ভালো-খারাপের অনুভূতি নয়, একটু অন্যরকম লাগছিল আমার। অন্যরকম এক ভোর।

সকালবেলা হাঁটতে গিয়ে সুনসান রাস্তায় পথচলতি দু’চারজনের কথা ভেসে আসে। ফাঁসি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে। আমি কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করি। আর বুঝতে পারি, এই যে বলা হয় এই রায়ে খুশী ১৬ কোটি মানুষ, তা আসলে ঠিক নয়। ১৬ কোটির মনের ভাষা, চোখের ভাষা এমনকি মুখের ভাষাও বড় আলাদা।

আলাদা মানেই খারাপ নয়, কিন্তু এই বিষয়ে আলাদা সেই ছোট্টবেলা থেকে আমাকে যেমন বিস্ময়ে রুদ্ধ করতো, এই বুড়ো বয়সে এসেও ঠিক তেমনই রুদ্ধ করে। যেদেশ আমার মা, সেই দেশটাকেই  যারা চায়নি, সেদেশে বসে চালিয়েছিল খুন আর ধর্ষণ, তাদের প্রতি এত দরদ কেমনে হয় সেই দেশেরই মানুষের? সেই দেশেরই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের এত দ্বিধা, এতো সন্দেহ, এত কাতরতা ঐ চিহ্নিতদের প্রতি কেন হয়?

আমি ছোট মানুষ, ছোট মেধার ছোট গণ্ডির, আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি নিরন্তর। কোনদিনও পরিষ্কার কারণটা ধরতে পারিনি।

একটা কারণ কি এই যে, ইতিহাস বিকৃতি? মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের স্বপ্ন আর বেদনা, সেই যুদ্ধের মানুষগুলোর ত্যাগ আর তিতিক্ষা, সেই যুদ্ধের হাজারো অজানা-অনামা দিক অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে এই দেশের জন্মের প্রায় পর থেকেই।

প্রতিকূলতা ছিল, রক্তচক্ষু ছিল কিন্তু এসবকে উপেক্ষা করেও কোন ঋজু টানটান মাথা উঁচু মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে সেভাবে এক্সপ্লোর করেনি এতগুলো বছরে। কাজ তো অবশ্যই হয়েছে, হয়েছে বলেই শাহবাগে ছোট্ট সন্তানের হাত ধরে জিন্স আর টি-শার্ট পড়া মাকে আসতে দেখি, অশীতিপর বৃদ্ধকে দেখি পিঠা বানিয়ে জনতার কাতারে বিলাতে, গণমাধ্যম নামে যে বিভ্রমের মধ্যে আমরা নিয়ত বসত করি, সেই বিভ্রমও যেন ঘুম থেকে জেগে ওঠে কয়েকটা দিন শাহবাগে।

কিন্তু বাংলার আনাচে-কানাচে যেভাবে বিস্মৃত হয়েছে আপামর মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধটা যখন শুধুই দুটো দেশাত্মবোধক গান আর উচ্চস্বর আবৃত্তির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ যখন কেনাবেচার জিনিস, তখন দায়টা কার?

সাকা আর মুজাহিদের ছেলেরা এইদেশেই উচ্চকণ্ঠে বলে, তাদের বাবা নির্দোষ, এই দেশেই তাদের ছেলেরা হুংকার ছাড়ে, এইটা খুন এবং এর বিচার হবে। এই দেশেরই খেয়ে-পরে মোটাতাজা নধর হয় তাদের শরীর আর কণ্ঠ হয় উঁচু, মুজাহিদের ছেলের চশমা পড়া প্রায় ইন্টেলেকচুয়াল চেহারাখানা পত্রিকার পাতায় আর টেলিভিশনের পর্দায় ফুটে থাকে।

এইসব আমরা অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় সহ্য করি।

আমরা ভুলে যাই আদর্শগত যুদ্ধ এটা ছিল না, এটা বাংলার আম-জাম-অশ্বত্থ আর বটের তলায় শুয়ে সৌদি খেজুরের লোভ করা কতগুলো জানোয়ারের ঠাণ্ডা মাথার মানুষ খুন ছিল।

এদেশের মানুষকে সাচ্চা মুসলমান বানানোর জন্য নারী ধর্ষণ- এই নকশাকারীদের উল্লাস ছিল। আর এই খুনিদের আমরা পরিত্যাগ তো দূরের কথা, তাদেরকে মাথার শিরোপা করেছি, রাজনীতিতে তারা এসেছে, বসেছে, জিতেছে, বিষ ছড়িয়েছে বাংলার আকাশে-বাতাসে, সেইখানে আমাদের-সাধারণ মানুষদেরও কি কিছুটা দায় থাকে না? এবং তাদেরকে পেলে-পুষে, খাইয়ে-পরিয়ে যারা এতোদিন দানব গড়লো, তাদের বিচারও তো করা উচিত। বিচার না হোক, অন্তত: জবাবদিহিতার সামনে দাঁড় করানো উচিত।

পৃথিবীতে এমন দেশ কয়টা আছে যে নিজেদেরই স্বাধীনতা নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত হয়? যতদিন এই দ্বিধা থাকবে ততদিন লড়াইও শেষ হবে না। ততদিন সাকা, সাকার পর হুকা, হুকার পর ‘এসট্রেরা’ আসতেই থাকবে।

তাই ভাইয়ো, লড়াই এর হাতিয়ারটা ফেলো না, টানটান রেখো স্নায়ু, আততায়ীর খঞ্জর যেন যেন আঘাত না বসাতে পারে তোমার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে তার জন্য সবসময় সতর্ক তোমাকে-আমাকেই থাকতে হবে। নো মার্সি, নো মার্সি।

এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াইয়ে জিততে হবে………………  ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

আপনার বেশ কয়েকটা লেখা আমি পড়েছি, বরাবরের মতো এটাও খুব অসাধারন। এই কথা গুলো আমার, আপনার, আমাদের সকলের । এমন করেই আমাদের সকলের ভাবা উচিত । আমার বিশ্বাস আমরা জিতবো এবং লড়াই করেই জিতবো। অনেক শুভ কামনা আপনার জন্য। আরো লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম ।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.