পূর্ণিমা এখন যেমন আছে

1

purnima2সুমন্দভাষিণী: ওকে নিয়ে লিখতে চাইনি আমি, ও বার বার আমার কাছে আসে, ওকে নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াই, খাই-দাই, গান করি, সারাদিন ওর উচ্ছলতা দেখি। সহজেই আদর কেড়ে নিতে পারে ও। ওর মুখে ‘তুমি’ ডাকটা অসম্ভব মায়াময় লাগে। আমাকে ও মনি ডাকে, হয়তো ওদের অঞ্চলে এভাবেই ডাকে প্রিয়জনদের। ‘আমার মেয়ে’ বলে পরিচয় করিয়ে দেই সবার সাথে।

বলছি পূর্ণিমা-পূর্ণিমা শীলের কথা। ওর নাম নিতেই একজন বলে উঠলো, ২০০১ তো? হ্যাঁ, ২০০১ সাল আর পূর্ণিমা যেন সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। সেসময়ের কথা কমবেশি সবারই মনে থাকার কথা, কাজেই নতুন করে মনে করিয়ে ওর মনের ক্ষত বাড়াতে চাই না। সেবছর নির্বাচনের আগে-পরে যে নির্যাতন চলেছিল দেশজুড়ে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে হারে হামলা হয়েছে, তাতে একজন পূর্ণিমা না, অনেক পূর্ণিমা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের দোষ, তারা মেয়ে হয়ে জন্মেছে, তাদের দোষ তারা সংখ্যালঘু পরিবারে জন্ম হয়েছে।

পূর্ণিমার কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। আজ ও যতোটা বড় হয়েছে, যেভাবে সে হাসছে-গান গাইছে, সেখানে অবশ্যই অনেক মানুষের অবদান। আজকের খোদ প্রধানমন্ত্রীও সেই তালিকায় আছেন। গতকাল (২৩ নভেম্বর) ও এসেছিল আমার কাছে। সারাদিন থেকেছে, একসাথে রান্না করেছি (কথা দিয়েছে আরেকদিন ও রান্না করে খাওয়াবে), খেয়েছি, গান শুনিয়েছে, আর সারাক্ষণ বকর বকর করে কান ঝালাপালা করেছে। এসব আলাপের কোনো মাথামুণ্ডু নেই, কিন্তু ওর ওই চপলতা, উচ্ছলতা আমার বেশ লাগে। ওকে জড়িয়ে ধরলে আমি নিজে অনেক শক্তি পাই সামনে চলার।

পূর্ণিমা গেয়ে শোনালো তার নতুন গান। সে বাংলাদেশ টেলিভিশনে গান করছে আজকাল। কোনো একজন গুরুর কাছে গান শিখছে। ছোটখাটো একটা কাজ করতো, সেই কাজটি তার চলে গেছে। তাই চাকরি খুঁজছে। তবে একজন তাকে কাজের আশ্বাস দিয়েছে, যাকে আমি চিনি। ভালোই হবে হয়তো। বললাম তাকে।

মাঝে গ্যেটে ইনস্টিটিউট থেকে নিজের পকেটের শেষসম্বল খরচ করে জার্মান ভাষা শিখেছিল, আমি নিজে নিয়ে ওকে ভর্তি করিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু টাকার অভাবে পরীক্ষাটা দেয়া হয়নি। আমি তখন দেশে ছিলাম না বলে জানতেও পারিনি। আর ওর কিছুটা অভিমানও হয়েছিল কিছু মানুষের ওপর। কারণ কেউ কেউ তার দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন, তারা কী মনে করে সরে গেছেন মাঝপথে, জানি না। শুনেছি, পূর্ণিমা নাকি অসংলগ্ন তথ্য দিয়েছে তাদের। তাই তারা আর এগোয়নি।

সত্য-মিথ্যা জানি না। পূর্ণিমা আমাকে অনেক কথা বলে। আমি ওর জীবনটা জানি বলেই সবকথা সিরিয়াসলি নেই না। ও তো আমারও মেয়ে। অত সিরিয়াস হওয়ারই বা কী প্রয়োজন!

আমি কি ওর জুতা পায়ে হেঁটে দেখেছি কখনও? ও যে জীবন পাড়ি দিয়েছে ২০০১ সাল থেকে, তা কি আমার বা আপনাদের মতোন অনেকের চিন্তায় কুলোয়? ওর শারীরিক-মানসিক ক্ষতে প্রলেপ কি আমরা দিতে পেরেছি? ওর সেসময় যে ভালবাসার প্রয়োজন ছিল, সেই পরিমাণ ভালবাসা কি দিয়েছি ওকে? ওর যে মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল, সেটা কি হয়েছে? হয়নি। ও ওর মতো করে একটা জীবন ধরে নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতেই পারে। আজ ও আমার পেটের মেয়ে হলে কী করতাম? ফেলে দিতাম? কিন্তু মানুষজন ঠিকই ফেলে দিয়েছে ওকে।

আজ এ বাড়ি, কাল ও বাড়ি করে ওর সময় কেটেছে।

পূর্ণিমা মাঝে মাঝেই সেইসব দিনের গল্প করে। ওর ভাগ্য এমনই ভালো যে, সব রথি-মহারথিদের বাড়িতে তার থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। শাহরিয়ার কবীর তো তাকে মেয়ে হিসেবেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী সে শাহরিয়ার কবীরকে ‘আব্বু’ বলেই ডাকে। থেকেছে ওয়াহিদুল হকের বাড়িতে, আজকের প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতেও তার থাকা হয়েছে দেড় বছর। থেকেছে সুলতানা কামালের বাসায়। এমন আরও অনেকের বাসায় থেকেছে পূর্ণিমা। সব বাসার অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি তাকে বই লিখতে বলেছি। মজার বই হবে তাহলে। বড় বড় মানুষের কতরকম আচরণ যে তাকে দেখতে হয়েছে।

গতকাল ওর মনটা খারাপ ছিল। বললো, ওয়াহিদুল হকের বড় মেয়ের বাসায় যখন সে থাকতো তখন একদিন একজন বেড়াতে এসে তার গায়ে গরম চা ছুঁড়ে মেরেছিল। অপরাধ ছিল, সে ওই বাসার মেয়ের মতোন জামা-কাপড় পরতো। ওই মহিলার তা সহ্য হয়নি। একজন গণধর্ষণের শিকার মেয়ে কি করে জাতের মেয়েদের মতোন জামা-কাপড় পরবে? তাইতো! সেই মহিলার নাম জানে না পূর্ণিমা। তবে কোনদিন সামনে পেলে সেও চা ছুঁড়ে মারবে, জানালো আমাকে।

আমি ওর সব কথা শুনি। কে তার নামে কত টাকা এনেছে বিদেশ থেকে, সে কত পেয়েছে। ধুমধাম করে তাকে নিয়ে ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করে দেয়া হয়। এতো এতো টাকার মামলা সেখানে, কারও মাথায় আসেনি। সেখান থেকে তখন তাকে উদ্ধার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। অথচ তার নামে আসা বরাদ্দকৃত টাকার খবরও পাওয়া যায়নি।

পূর্ণিমা বলছিল, অনেকেই অনেক ব্যবসা তাকে দেখিয়ে করে গেছে। লাখ লাখ টাকার সেই ব্যবসা। তবে এখন আর সে এই সুযোগ কাউকে দিতে চায় না। অনেক হয়েছে।

ওর মা চায়, মেয়েটা বিয়েথা করুক, সংসার হোক ওর। কিন্তু পূর্ণিমা জানে, এই বিয়ে তার মধুর হবে না কখনও। এইদেশ, এইদেশের মানুষ, এইদেশের সমাজব্যবস্থা কি পূর্ণিমাকে স্বচ্ছন্দে জীবনটা যাপন করতে দিতে প্রস্তুত? আমারও মনে হয় না। বার বার বলি, তুই চলে যা এদেশ ছেড়ে। নতুন জীবন পাবি। বলি আমি, কারণ বলাটা সহজ। কিন্তু কিভাবে যাবে সে? কে নেবে? এতো এতো মানুষ বিদেশে চলে যাচ্ছে। পূর্ণিমাকে পার করে দেয়ার মানুষ কোথায়? একমাত্র বাইরে নিতে পারলেই ওকে নতুন একটা জীবন দেয়া যেতো। সেই মানুষটি কি আছে কোথাও?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,১০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.