অস্তিত্বের সংকটে আমি

1

Canada Tribalsতানিয়া মোর্শেদ: ২০০৮-এর ডিসেম্বরে দেশে যাচ্ছি, পায়ের সার্জারী, রেডিয়েশন মানে ক্যান্সারযুদ্ধে নাম লিখাবার পর প্রথমবার। ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন যে, এক নাগাড়ে বেশীক্ষণ বসে থাকবে না। প্রতি দেড়/ দু’ঘন্টা পর পর উঠে হাঁটবে। লং ড্রাইভ বা লং ফ্লাইটে সব মানুষেরই ব্লাড ক্লট হবার সম্ভাবনা থাকে, আমার ঝুঁকি স্বাভাবিক-সুস্থ মানুষের থেকে বেশী।

সান-ফ্রান্সিস্কো থেকে ক্যাথে প্যাসিফিকের প্লেন ছাড়বার পরপরই বুঝলাম যে, হংকং থেকে ঢাকার কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে পারবো না। এই প্লেন হংকং-এ নামবার এক-দেড় ঘন্টা আগেই সেই প্লেন ছেড়ে দেবে! কথা হচ্ছে তাহলে ক্যাথে প্যাসিফিক আমাদের আগে জানালো না কেন?

টিকেট কাটা হয় সাধারণত অন্তত পক্ষে দু’ তিন মাস আগে। তখন দুই ফ্লাইটের মধ্যে বিরতি ছিল দু’ঘন্টা। এই দু’ তিন মাসে ক্যাথে প্যাসেফিক প্লেনের সময় বদলেছে। কিন্তু বদলাবার সময় খেয়াল করেনি যে, সান ফ্রান্সিস্কো থেকে আসা প্লেনের যাত্রীরা এই ফ্লাইট ধরতে পারবে না! প্লেনের ক্রুদের এটা বলা শুরু করলাম। তারা বললো যে, তারা হংকং কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে। প্লেন হংকং-এ অবতরণ করবার পর দেখি যে, যারা কানেক্টিং ফ্লাইট মিস করেছেন তাদেরকে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে সব দেশের নাগরিকদের নয়!

সবুজ পাসপোর্টধারীদের যেহেতু এয়ারপোর্টের বাইরে যেতে ভিসা লাগে তাই তাদের এয়ারপোর্টেই চব্বিশ ঘন্টা কাটাতে হবে! বাংলাদেশী যাদের নীল পাসপোর্ট আছে তারাও অন্যদেশীদের সাথে হোটেলে চলে গেলেন। আমি ব্যাগ থেকে পাসপোর্ট বের করে হাতে ধরে রাখলাম, আর যারা নিতে এসেছিল তাদের জিজ্ঞাসা শুরু করলাম যে, এরা চব্বিশ ঘন্টা এভাবে থাকবে শুধুমাত্র তোমাদের ভুলের জন্য!? তিনটি ছোট বাচ্চাসহ দশ জন। আমি বললাম যে তোমদের ভুলের জন্য এই তিনটি ছোট বাচ্চা কষ্ট করবে?

একজন বললো যে, তার ভুল নয়। আমি বললাম যে, আমি তোমাকে বলিনি। তোমাদের কর্তৃপক্ষকে বলছি। আমাকে বললো যে, তোমাদের জন্য তো হোটেল আছে।

আমি বললাম যে, আমরা যাবো না। সে বললো যে, এদের সাথে থাকবে? আমরা তিনজন বললাম যে, হ্যাঁ থাকবো। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম যে, যে কেউ এত ঘন্টা এয়ারপোর্টে থাকলে ডে রুম দেবার কথা। সে বললো যে, হঠাৎ করে ডে রুম পাওয়া অসম্ভব। আমি তখন বললাম যে, তোমরা যা করছো তা মানবাধিকার লংঘনের মধ্যে পরে জানো? সে তার বসকে ফোনে জানালো চাইনীজ ভাষায় কিছু। তখন বললো যে, চল ওয়েটিং এরিয়ায় থাকবে। যেয়ে দেখি ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি সোফা চেয়ার তাও মানুষ দখল করে আছে। আমি তখন বললাম তোমরা কি বলতে চাও ছোট বাচ্চা নিয়ে এভাবে চব্বিশ ঘন্টা থাকবে এরা? বেশ রেগে কথা বলছিল ছেলেটি। আমিও রেগে কথা বলছিলাম, জানতাম শক্তের ভক্ত না হলেও এখানে নরম হলে কিছু হবে না। কথার এক পর্যায়ে বলে বসলাম যে, তোমরা না এত স্মার্ট তাহলে এত ক্র্যাপি জব কি ভাবে করলে? (খারাপ শব্দ ব্যবহারের জন্য দুঃখিত, জীবনে প্রথম কাউকে খারাপ কথা বলা)।  

তারপর বললাম যে, আমাকে বাধ্য করছো এখন যে কথাটি আমি বলবো তার জন্য। বললাম যে, অন্য দেশীরা অনেকেই বলে থাকে যে অ্যামেরিকানরা কথায় কথায় “সু” করে। জেনে রাখো বাধ্য হয়েই বলছি যে, আমি ফিরে যেয়ে তোমার কোম্পানীর নামে সু করবো। আর সব বাংলাদেশীদের বলবো ওরা কেউ যেন ক্যাথে প্যাসিফিকে না চড়ে।

ছেলেটি রেগে গেল, কিন্তু বসকে কি বললো। তারপর বললো যে, তিনটি ডে রুম দিতে পারবো। এর বেশী নয়। তারপর তেরজন পালা করে ডে রুমের (রুম বলা মানে “রুম” শব্দটিকে লজ্জা দেওয়া) ছোট্ট বিছানায় কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া, চব্বিশ ঘন্টা পর আমরা পরের দিনের সান ফ্রান্সিস্কো থেকে আসা ফ্লাইটের যাত্রীসহ যাত্রা শুরু করলাম।

দু’ ফ্লাইটের যাত্রীর জন্য আরো বড় প্লেন দিতে হয়েছিল তাদের। প্লেন যখন ঢাকায় অবতরণ করতে কুড়ি মিনিট মাত্র বাকী হঠাৎ ক্যাপ্টেন ঘোষণা করলেন যে, আমরা ঢাকা থেকে কোনো সিগনাল পাচ্ছি না (স্মগের জন্য)।

ব্যাংককে চলে যাচ্ছি! মাথায় হাত! ব্যাংককে আবার সেই নাটক! এ’বার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ৫০+ বাংলাদেশীকে এয়ারপোর্টেই থাকতে হবে। ভিসা ছাড়া বাইরে হোটেলে যেতে পারবে না! আমি কিছু বলবার আগেই দীপ্ত আমাকে বললো, “মা ডু সামথিং।”

প্রচণ্ড ক্লান্ত আমাকে কতটা যে শান্তির প্রলেপ দিয়েছিল কথাটা!

আবারও হাতে পাসপোর্ট নিয়ে দাঁড়ালাম সেই মানুষদের মাঝে। আমাকে দেখে এয়ারলাইন্সের ছেলেটি বললো যে, তোমার জন্য হোটেলে রুম আছে। আমি বললাম যে, জানি। এদের কি হবে? সেই একই কথা! বললাম যে, ডে রুম দাও। সে বললো যে, এতগুলো মানুষের ডে রুম এই মুহূর্তে কি ভাবে সম্ভব?

ওদের অত দোষ নেই, কারণ তখন আমরা ক্যাথে প্যাসেফিকের নয়, ড্রাগন এয়ারলাইন্সের যাত্রী। হংকং থেকে ড্রাগনের যাত্রী হতে হয়, ক্যাথে যায় না ঢাকায়। আগের দিনের ক্যাথের ভুলের জন্য তো আর এরা দায়ী নয়। তবুও বললাম যে আমরা তিনদিন ধরে জার্নী করছি জানো?

ছেলেটি ভাল ছিল, তার অন্য সহকর্মীটির থেকে। আর হংকং-এর ছেলেটির থেকে তো অবশ্যই। হংকং-এ যত সময় লেগেছিল তার থেকে কম সময় লাগলো। প্রথমে বলেছিল যে, পাঁচটি ডে রুম দিতে পারবে। আমি বলেছিলাম যে, ৫০+ মানুষের জন্যই দিতে হবে। না হলে আমি এখানেই থাকছি।

ছেলেটি কিছুক্ষণ পরে এসে বললো যে, ঠিক আছে সবার জন্যই দিচ্ছি! এবার যাও হোটেলে। আমি বললাম যে, আগে ওরা যাবে ডে রুমে তারপর যাবো। সবাইকে ডে রুমে পাঠিয়ে ছেলেটি বললো যে, এবার খুশী? এখন চল তোমাদের হোটেলে যাবার বাস দেখিয়ে দেই! আমি অনেক ধন্যবাদ জানালাম।

হংকং-এ এক বড়ভাই (হাল্কা চিনতাম এক স্টেইটে থাকবার সময়) পরিবারসহ হোটেলে চলে গিয়েছিলেন। এবার চুপ করে বসে আমার কাণ্ড দেখছিলেন। হোটেলে যাবার পথে আমাকে বললেন যে, তুমি আজ যা দেখালে!

আরো কিছু বলতে চাইছিলেন, আমি অন্য গল্প জুড়ে দিলাম!

চব্বিশ ঘন্টা পর ঢাকা এয়ারপোর্টে যে অভিজ্ঞতা হলো! কম্পিউটার ব্যবহার করতে না জানা এক ও, সি, ডি (অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজ অর্ডার) আছে এমন লোকের হাতে পাসপোর্ট পড়লো! যাক সে দুঃখের কথা।

ব্যাংককে হোটেলের রুমে এক সময় আমার চোখে পানি এসেছিল এই ভেবে যে, সাতদিন আগেই ব্যাংককের এয়ারপোর্ট অচল করে রেখেছিল এয়ারলাইন্সের, এয়ারপোর্টের কর্মীরা। আর সেখানে আমি তর্ক করলাম মানুষের অধিকার নিয়ে, সেই আমাকেই মুখ বন্ধ রাখতে হবে ঢাকায় নামবার সাথে সাথেই!

তখনো জানতাম না যে, ভাগ্য আমায় সত্যিই দেখিয়ে দেবে যে কথাটা কত সত্যি! (না আমি বাংলাদেশীদের বলিনি ক্যাথেতে না চড়তে। ক্ষতিপূরণের কাগজটি আজো কোনো শেলফে পরে আছে, হয়ত। আমার যা পাবার তা তো পেয়েছিই)।

কোরানের আয়াত বলতে পারলে না কি মুক্তি দিয়েছে মুসলমান সন্ত্রাসীরা, মালির ঘটনার কথা বলছি।

কিছুদিন আগে কেনিয়ার মলে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল, সেখানে সন্ত্রাসীরা বলেছিল যে, “মুসলমানরা বের হয়ে যাও।” তারপর থেকেই ভাবছি যে, আমি যদি সেখানে থাকতাম কি করতাম?! আমি কি বাঁচবার জন্য বের হয়ে যেতাম? তাহলে তো আমার মৃত্যুই হতো, নিজের কাছে, বিবেকের কাছে। সঙ্গে যদি দীপ্ত আর মিজান থাকতো তাহলে কি ওদের বের হয়ে যেতে বলতাম? মৃত্যু জেনেও ওদেরও থাকতে বলতাম? প্রতিটা মা-বাবাই যেকোনো মূল্যে সন্তানকে বাঁচাতে চায়, কিন্তু আমি এখনো ভাবছি যে, আমি কি সত্যি দীপ্তকে বলতে পারতাম যে, এখন তোমার মানুষ পরিচয়ের আগে মুসলমান পরিচয়?

মাথার মধ্যে ঘুরছে, ইহুদিদের কীভাবে আলাদা লাইন করানো হতো বিশ্বযুদ্ধের সময়! ১৯৭১-এ কীভাবে হিন্দুদের আলাদা লাইন করানো হতো! যে নীল পাসপোর্টের জোরে আমি হংকং, ব্যাংককে মানবাধিকারের কথা বলেছি, আদায় করেছি সেই নীল পাসপোর্টের জন্যই হয়ত অনেক দেশেই উল্টো অভিজ্ঞতা হতে পারে! তখন কি আমি পাসপোর্ট না দেখিয়ে লুকোবো?

এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ একটি কথা ভেবে হাসি আসলো, মুসলমানদের লাইনে যদি যেতামও (দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারছি না) ওরা আমাকেই আগে মারতো! আমি কী ওদের চোখে মুসলমান হতে পারি? বোরখার কথা বাদ দিলাম। হিযাবহীন নারী কি আবার মুসলমান হয় এদের চোখে? আমি তো আরো বড়  শত্রু!   

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

যে কাজটি করেছেন, হংকং ও ব্যাংকতে তার জন্য সাধুবাদ জানাই, যেভাবে মালির ঘটনার সাথে মেলবন্ধন ঘটালেন তার তুলনা নেই। মালির ঘটনা আমাকে ৭১ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়। লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.