ইয়াবা অর্থনীতি ও আমাদের ঐশীরা

Oishee 1জ্যোতির্ময় বড়ুয়া: ইয়াবা অর্থনীতিটা মূলত কেমন তা বুঝতে হলে আপনাকে কক্সবাজার জেলার উখিয়া এবং টেকনাফ যেতে হবে। আশে পাশের থানা যেমন রামু, কক্সবাজার সদর নাইক্ষ্যং ছড়ি এসব এলাকায়ও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যে লোকটি কিছুদিন আগেও খেতমজুর হিসেবে কাজ করত আজ তার দোতলা দালান বাড়ী।

এরকম নিম্নবিত্তের মানুষ হটাত করে বিত্তবান হয়ে ওঠা চোখে পড়ে তাই বোঝা যায়, কিন্তু তার মানে এই নয় বিত্তবানরা ইয়াবা অর্থনীতির সাথে জড়িত নন। বরং বিত্তবানরা এই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক। বদি ভাইয়ের একার পক্ষে ইয়াবা অর্থনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়- এটা কমনসেন্স। আবার প্রশাসনের সাহায্য ছাড়াও এই বিনাশী ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

অর্থাৎ ইয়াবা অর্থনীতির সুবিধাভোগী শুধুমাত্র উখিয়া টেকনাফ এলাকার লোকজন নন। ঢাকায় বসে এই অর্থনীতি কি কি অবদান রাখছে সেসব আমাদের অজানা থাকলেও অনুমান করা যায়। আমাদের ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অনেক সময় অপরাধ ঘটলেও প্রমাণ করা যায়না। যেমন ধরুন- রাতের বেলায় কোন চিহ্নিত সন্ত্রাসি কাউকে খুন করল কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুললো না।

পুলিশ তদন্ত করতে এলে কেউ তাকে সাক্ষ্য দিল না। তার ধমকেও কাজ হোল না। পুলিশ আন্তরিকভাবেই কাজ করল। কিন্তু যদি কোন সাক্ষী পাওয়া না যায় তবে পুলিশ কি তদন্ত প্রতিবেদন দেবে? এর উল্টো চিত্রও আছে- যেমন দুদক দায়মুক্তি দিলেও কারো কারো বিরুদ্ধে সন্দেহ থেকেই যায়। সোনালি ব্যাংক অর্থ জালিয়াতি নিয়ে একই বক্তব্য দাঁড় করানো যায়। একইভাবে ইয়াবা অর্থনীতি বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণ পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই অর্থনীতি দিনে দিনে ফুলে ফেঁপে উঠছে, এতে বিনিয়োগ বাড়ছে। এর উপর অনেকের রুজি রুটির নির্ভরশীলতা বাড়ছে, তাই একে এখন আর সহজে উপড়ে ফেলা যাবে না। উপড়ে ফেলার আগ্রহও থাকবে না।

সুতরাং এই সমাজ, রাষ্ট্র আরও অনেক ঐশীদের জন্ম দিতেই থাকবে আর আমরা ঐশীদের ফাঁসি দিয়েই ক্ষান্ত হবো। কেউ কেউ ঐশীর বাবার অসাধু জীবনযাপনের দিকে আঙ্গুল তুলছেন- তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- অসাধু জীবনযাপন করলেই কারো ছেলে মেয়ে মাদকে আসক্ত হবে, এমন ধারণার ভিত্তি কি? তাছাড়া মিডিয়ার কল্যাণে আরও অনেক কথা জানছেন যা মূলত পুরুষ সাংবাদিকের নারী বিদ্বেষী ন্যারেটিভ। এতে প্রভাবিত হওয়া আপনাদের সাজে না। তাছাড়া ঘুষ নেওয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ একটি কাজ।

আমাদের অর্থমন্ত্রী, যার সবচেয়ে বেশী এটা নিয়ে মাথা ব্যাথা হওয়ার কথা তিনি পরিস্কার করে বলেছেন- “এটা স্পিড মানি, ঘুষ নয়। এতে দোষের কিছু নেই।” তাই যেখানটায় আঘাত করা দরকার সেখানে করুন, এখানে ঐশী যেমন একটি চক্রের চক্রান্তের শিকার, তেমনি তার বাবাও। আমার মন তিনজনের জন্যেই ব্যথিত।

ঐশী গ্রেপ্তার হওয়ার পর সবাই যখন তামাশা দেখছিল আর পত্রিকার ন্যারেটিভ পড়ে তাকে বেয়াড়া দুশ্চরিত্রা প্রমাণে ব্যস্ত ছিল তখন তাকে মানসিক চিকিৎসার জন্যে পিজি হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্যে বিচারপতি সালমা মাসুদ ও বিচারপতি জাফর আহমেদ এর সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চে রিট মামলা করেছিলাম, সেই মামলার আদেশে সে হাসপাতালে ছিল দীর্ঘদিন। সেসময়ের জনরোষ থেকে কিছুটা সময়ের জন্যে হলেও সে বাঁচতে পেরেছিল। শেষ বাঁচা কি বাঁচতে পারবে ঐশী?

(লেখার অংশবিশেষ)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.