ঐশীর মৃত্যুদণ্ড ও সমাজের মাদকাসক্তি

Oishi
নিহত পুলিশ দম্পতি

উইমেন চ্যাপ্টার: চাঞ্চল্যকর পুলিশ দম্পতি হত্যা মামলায় তাদের ‘ও’ লেভেল পড়ুয়া মেয়ে ঐশীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। চারদিকে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে যখন আমাদের নাভিশ্বাস অবস্থা, তখন একটা হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে স্বাভাবিকভাবেই মনে স্বস্তি আনে। কিন্তু এই ঘটনাটি কিছুতেই স্বস্তি দিচ্ছে না। বরং মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে এমন একটি ছোট মেয়ের জীবনের শুরুতেই শেষ হয়ে যাওয়ার খবরে।

এইদেশে যুদ্ধাপরাধের প্রধান মাস্টারমাইন্ড গোলাম আজমকেও লাখ লাখ মানুষ হত্যার দায়ে কেবলমাত্র বয়স বিবেচনায় যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়া হয়। আর ত্রুটিপূর্ণ সমাজব্যবস্থার বলী হয়ে ঐশীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, এই খুনের পিছনে ঐশীর প্রধান দুই সহযোগীর একজনকে বেকসুর খালাস এবং অপর একজনকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। যা হাস্যকর বৈ তো নয়। এই দুজনের সহযোগিতা ছাড়া একা ঐশীর পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না এমন হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা। অথচ তারা রেহাই পেয়ে গেল।

সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ একটি মেয়ে মাদকাসক্ত ছিল। একপর্যায়ে কোন কারণে সে তার বাবা-মাকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা করলো, তা আমাদের জানা হয়নি। এই আসক্তি তো আর একদিনে হয়নি। দিনের পর দিন অল্প অল্প করে মাদকের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে ঐশী। তখন বাবা-মা কোথায় ছিলেন? তারা কি মেয়ের পরিবর্তন দেখেননি? খুনের পর যে ঐশীর ছবি ছাপা হয়েছে গণমাধ্যমে সেখানে স্পষ্টই দেখা গেছে, তার চোখের নিচের গভীর কালি। মুখেই একধরনের বিতৃষ্ণার ছাপ, সেটা জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণাও হতে পারে।

সামাজিক সিস্টেমগুলো যখন অকার্যকর হয়, মূল্যবোধগুলো যখন অচল হয়ে যায়, রাজনীতি যখন আর জনকল্যাণমুখী থাকে না, তখন মাদকের চলাচল অবাধ হয়। ঐশী এখানে গ্রাহক, আর সমাজ বা সিস্টেম যোগানদাতা।

রিমান্ডে নিয়ে ঐশীকে নানারকম প্রশ্ন করা হয়েছে, সেই প্রশ্নের অনেককিছুই আবার গণমাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে। একটা কিশোরী মেয়েকে তার বয়ফ্রেন্ডসহ গ্রেপ্তার করা হলে যেসব প্রশ্ন হতে পারে, তার কোনটাই বাদ যায়নি সেখানে। তার ওপর সে যদি হয় মাদকাসক্ত, তাহলে তো কথাই নেই। ঐশী যেন গণিমতের মাল হয়ে গিয়েছিল। তাকে নানারকম হেনস্থা করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জায়গা হয়েছে টঙ্গির কিশোর সংশোধনাগারে। সেখানকার অবস্থা সম্পর্কেও আমাদের ধারণা আছে। বলবো না, ঐশীকে প্রথম ডিভিশন কারাগার দেয়া যেতে পারতো, কিন্তু যে মেয়েটা মানসিকভাবে অসুস্থ, তার প্রতি কি কোনরকম সহানুভূতি দেখিয়েছে কেউ?

আজ অনেকদিন পর ঐশী আবার খবরের শিরোনাম। যখন খুনটা হয়েছিল সেই ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট, তখনও এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এর কোনটাই ঐশীর বিপক্ষে যায়নি কিন্তু। সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, দায় পুরোটাই ঐশীর ছিল না। একদিনে সে খুনী হয়ে ওঠেনি। বা তাকে খুন করতে প্রলুব্ধ করেনি। সে যখন দিনে দিনে অন্ধকার জগতে চলে যাচ্ছিল, তখন তার বাবা-মা ছাড়াও স্কুল কর্তৃপক্ষ, পরিবারের অন্যান্য লোকজন, সমাজ কোথায় ছিল? কেন কেউ তাকে ফেরানোর চেষ্টা করেনি?

আজ মনে হচ্ছে এই ঐশী কেবলই একজন কিশোরী ঐশী নয়, এ যেন এই মাদকাসক্ত সমাজেরই প্রতিবিম্ব। আমাদের প্রায় প্রতি ঘরে এমন একজন করে ঐশী আছে, সে ছেলেই হোক, আর মেয়েই হোক। ওদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা আমাদের সবার কর্তব্য। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের দায়িত্ব নেয় না, তখন আর বসে থেকে হা-পিত্যেশ করার সময় নেই। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের উচিত নিজেদের সন্তানের ব্যাপারে খেয়াল রাখা, কোনকিছু গোপন না করে তা আলোচনা করা। তাহলেই না সমাধান বেরিয়ে আসবে।

২০১৩ সালের ১৪ই অগাস্ট রাতে ঢাকার চামেলীবাগের নিজ বাসায় খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা (পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ) মাহফুজুর রহমান এবং তাঁর স্ত্রী স্বপ্না রহমান। হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পর তাদের মেয়ে ঐশী রহমান পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

২০১৩ সালে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করে গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী রহমান তার বাবা-মাকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তবে ঐশী পরে সেই জবানবন্দী প্রত্যাহার করে জানান, ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেয়া হয়েছিল।

এই রায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। সিলেট থেকে পাপলু বাঙালী লিখেছেন, “ঐশী নামের মেয়েটার ফাঁসির আদেশ দিয়া রাষ্ট্র বড় বেশি বাহাদুরী দেখিয়ে ফেললো। মেয়েটি যদি ব্লগার হত্যা করতো তাও সমাজ-রাষ্ট্র তাকে বাঁচিয়ে দিতো। সে যদি এমপি’র ছেলে হয়ে মাতাল অবস্থায় ফুটপাতে মানুষ গুলি করে মারতো তাও কিচ্ছু হতো না। মন পিড়া দিচ্ছে, ঐশীর দায়টা কাঁধে তুলে নিলাম। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই শিশু অপরাধীদের সংশোধনাগারে রাখা হয়। ঐশী যখন খুনের সঙ্গে জড়িত তখন শিশু ছিল। এখনো তাই। তাকে মানুষ হওয়ার,বিরাট আকাশের নিচে ভুল শুধরে হাঁটার সুযোগ দেয়া উচিৎ হতো”।

ফারহানা মিলি লিখেছেন, ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পরও ঐশী একবার বলেছিল, তাকে দিয়ে এটা ‘‘আদায় করা হয়েছে’’ .. ওর চাচা বারবার বলেছেন, ঐশী হত্যা করেছে বলে উনি মনে করছেন না … ঐশীর বয়স নিয়ে নানা ঘটনা দেখেছি … শিশু কাজের মেয়েটিরও বিচার হচ্ছে শিশু আদালতে …. এই একটি মামলা এত ‘‘ইউনিক’’ ছিল কেন?

সব কিছু বাদ দিয়ে, উচ্চতর আদালতে গেলে, ঐশীর জন্য এ আদেশ রহিত হবে আশা করি কয়েকটি কারণে… প্রথমত, তার বয়সের কারণে … দ্বিতীয়ত, মুত্যুদণ্ড খুব বড় দাগী আসামি, নৃশংস হত্যাকারী বা যুদ্ধাপরাধী ছাড়া আর কারও বেলায় এ দেশে প্রয়োগ হবার সংস্কৃতিটা উঠে যাক…

আমি ঐশীকে দাঁড় করাই আমার মেয়ের জায়গায় .. যদি কোনো অন্যায় হয়ে থাকে, তবে এমনটা যে কোনো দিন আমাদের কারও সন্তানের বেলায় ঘটবে না কে জানে … সমাজে ক্ষমতা আর অর্থের দাপট থাকলে ভয় সবারই থাকবে ..

ঐশী এ সমাজের ঘৃণা পেয়েছে ‘‘‘বখে যাওয়া মেয়েমানুষ’’ বলে .. আমরা কেউ ওকে একটুও ছাড় দিতে রাজি নই .. কিন্তু মেয়েটি সত্যিই ‘‘বখে’’ গিয়ে থাকলে সেখানে এ সমাজের দায়ই তো বেশি, নয় কী’?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.