তুলসী রানীর মাতৃত্ব আর আমাদের বন্ধ্যাত্ব

Tulshi Raniসুমন্দভাষিণী: ফেনীর তুলসী রানী আর কখনই মা হতে পারবেন না। সংখ্যাগুরুদের লাথির আঘাতে তার পেটের সন্তানই কেবল মরেনি, তাকে চিরজীবনের মতোন মা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত করেছে। সংখ্যালঘুর আবার ভালোমন্দ, সুখ-দু:খ আছে নাকি?

ভালোই হয়েছে, ভবিষ্যতে তুলসী রানীর সামনে তার ছেলেকে হত্যা করা হবে না, বা মেয়েকে ধর্ষণ করা হবে না। তুলসী তাই আনন্দে আজ লাফাতেই পারে। আপনারা যারা সংখ্যাগুরু আছেন, তারা দয়া করে এইদেশে টিকে থাকা গুটিকয় সংখ্যালঘু তুলসীদের পেটে লাথি মেরে আসুন, যেন তারা জন্ম থেকেই বন্ধ্যা হয়ে বেড়ে উঠে।

আর আপনারা একের পর এক জন্ম দিয়ে যেতে থাকুন লাগামহীনভাবে। একটি দিনও যেন কামাই না যায় সন্তান উৎপাদনের কাজে, প্রয়োজনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন। কর্ম সারা হলে সন্তানটিকে পাঠিয়ে দিন সন্ত্রাসী বানানোর প্রতিষ্ঠানে, আল্লাহর নামে সঁপে দিন তাকে, যেন সে ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে বেড়ে উঠে। তারপর তার হাতে তুলে দিন চাপাতি, যা কোপা সবাইকে। ওরা তখন জিহাদ এনে দেবে আপনাকে, আপনাদের। বাহ, বেশ সুন্দর একটা বাংলাদেশকে মূহূর্তেই রচনা করে ফেললাম। এখন আর হাত কাঁপে না লিখতে, মনও কাঁপে না ভাবতে। আপনারা আসলেই বলিহারি।

কিন্তু যারা চুপ মেরে আছেন বাংলাদেশের এই দুরবস্থায়, যারা ক্ষমতার কাছাকাছি আছেন, সুযোগ পাচ্ছেন, সুযোগ নিচ্ছেন, নিজের শরীরে চর্বি বাড়াচ্ছেন, দেখেছেন তো, চাপাতি কেবল সংখ্যালঘুতেই সীমাবদ্ধ নয়। চাপাতি সবার ঘাড়ে পড়ছে, এবং পড়বেও। কেন জানেন? কারণ আপনারা সবাই ভাবছেন, আপনারা নিরাপদ দূরত্বে আছেন, কেউ আপনাদের টিকিটি ছুঁতে পারবে না।

কিন্তু দেখেছেন তো, কিভাবে তারা ছুঁয়ে যাচ্ছে! কাউকে রেহাই দেবে না। একটু অন্যরকম ভেবেছেন তো, শেষ হয়ে যাবেন। নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, মুক্তচিন্তার মানুষ ভাববেন তো শেষ। কাজেই উটপাখি হয়ে জীবন কাটাবেন, নাকি প্রতিবাদী হবেন, সেটা আপনার পছন্দ। আজকের তুলসী রানী ফেনির এক অজ:পাড়াগায়ের, সংখ্যালঘু, দরিদ্র পরিবারের হলেও, অযূত-সহস্র তুলসী রানীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে অচিরেই, এ আমি চর্মচোখেই দেখতে পাচ্ছি, আপনি পাচ্ছেন না?

আরেকটা কথা, শুধু প্রতিবাদ, মিছিল-মানববন্ধনেই কাজ হবে না। ওই যে নিহত দীপনের বাবা যেমন বলেছেন, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংস্কার প্রয়োজন, ঠিক তেমন সংস্কারেই হাত লাগাতে হবে সবাইকে, এবং এখনই। একজন শোকগ্রস্ত পিতার মুখটা আমি যতবার দেখি, ততবারই ভিতরটা ব্যথায় মুচড়ে যায়। যখন তিনি তার ছেলের লাশ উদ্ধার করলেন, ওই যে মোবাইল ফোনে তিনি বাড়িতে জানাচ্ছেন সেই কথাটা, দেখেছেন তার চেহারা?

আমি বার বার দেখেছি, আর একজন বাবাকে সেখানে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। এরপরও তিনি কতটা শান্তভাবে সেই অবস্থা সামলেছেন, এখনও সামলাচ্ছেন একমাত্র ছেলেকে হারানোর কষ্ট, যেমন সয়ে যাচ্ছেন অজয় রায় নিজের ছেলেকে হারিয়ে, এভাবে এরকম মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ার আগেই তৎপর হোন সবাই।

আজকের তুলসী রানীর অনাগত সন্তানের মৃত্যু বা মুক্তচিন্তক হত্যা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যে সমাজ আজ নষ্টদের দখলে, যে দেশ আজ নষ্ট রাজনীতির কবলে, সেখানে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠাই অস্বাভাবিক।

সুতরাং আর দেরি নয়, এখনও সময় আছে, জেগে উঠুন সবাই। আবারও একটা একাত্তরকে মোকাবিলা করুন, এবার হোক সাংস্কৃতিক জাগরণের লড়াই।  

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.