আধ-মানুষের জীবন (পর্ব-দুই)

Crocodile tearsশারমিন শামস্: বুয়া বুয়া… আমি প্রাণপণে চ্যাঁচাই। একটু আসো এদিকে।

বুয়া নির্বিকার। সে ঘর মুছছে, কোনদিকে তাকায় না। হঠাৎ আমাকে আসতে দেখে চোখ তুলে চায় একটু। তারপর থতমত খায়। ‌‘কী হইসে?’ জোরে, প্রায় চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে? -উফফ… কখন থেকে ডাকছি তোমাকে- আর পারিনা। বুয়া কানে শোনে না। তাকে যাই বলি গলা ফাটিয়ে বলতে হয় আমার। এই বলতেই এনার্জি শেষ।
-তোমার কানের এই অবস্থা ক্যানো?
-সোয়ামী মারছিলো কানের ওপরে। তারপর থেকে আর হুনি না।
-বাহ! বাহাদুর বটে। তারপর ডাক্তার দেখিয়েছে? -না গো আপা -দারুণ, দারুন, তা সেই ব্যাটা করে কী? পেশা কী তার?
– কিছু করে না আপা। হুইয়া বইসা থাকে। আমি আয় করি।
আমার আর কিছু বলার নাই। আমি সকালের নাস্তা বানাই। ডিম ভাজি। আলমারি গুছাই। আলমারি থেকে দুইটা শাড়ি বের করে বুয়াকে দেই হঠাৎ।
-তোমার শাড়ি কাপড় এতো ময়লা ক্যানো? নাও, কাল থেকে এগুলো পরে আসবা। পছন্দ হয়?
-খুব ভালা পরের দিন সেই দুই শাড়ি হাতে বুয়ার আগমন।
-আপা, এই হালকা রংগের শাড়ি পিন্দতে দিত না।
-কে?
-আমার সোয়ামী। সে বলসে আমি কি মরসি নাকি!
আমি শ্বাস ফেলি। শাড়ির রং ছাই ছাই, পাড়টা হালকা নীল। আরেকটা খুব হালকা সবুজ আর সাদার কম্বিনেশন।
-শাড়ি আমার পছন্দ, কিন্তু ব্যাটায় দিব না।
-আচ্ছা, অন্য শাড়ি দিব তোমাকে।
ম্যাজেন্টা রংয়ের একটা সুতি তাঁত বের করে দেই। পরের দিন সেই কটকটে রঙের শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে আসে পঞ্চাশোর্ধ বুয়া। তিনদিন পর আবার একদিন আসে না। পরের দিন এসে জানায় আগের রাতে স্বামী তাকে পিটিয়ে প্রায় আধমরা করে ফেলেছিল বলে, সকালে একটু ‘রেস্ট’ নিতে হয়েছিল। এখন সে ‘ঠিক আছে’। 
২. ফেমিনিজম নিয়ে আমি কখনও চিন্তা করি না। ফেমিনিজমের তত্ত্ব আলাদা করে খুঁজে বুঝে তাতে বুঁদ হই না। আমি আমার মানবসত্ত্বাকে আমার স্বাধীন ইচ্ছায় চালাতে পারবো, যেমনটা আর দশজন পুরুষ পারে, লিঙ্গগত কারণে আমাকে এসব থেকে দূরে থাকতে হবে না- এটুকুই আমার ভাবনার বিষয়। আমার স্তন, আমর যোনি আমার জরায়ু বারবার আমার মানবসত্ত্বার চেয়েও বড় হয়ে উঠবে, এটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য এবং অগ্রহণীয়। এবং এই বোধটাই আমার ফেমিনিজম।
নারীত্ব একটি দায়, যা সমাজ চাপিয়ে দেয়। যোনি ও স্তন শারীরিক অংগের থেকে বেশিমাত্রায় বিনোদনমূলক, অপরপক্ষে পুরুষের জননেন্দ্রিয় নয়। শরীরের দোহাই দিয়ে আমার সমাজে, গরমে একটি ছোট পোশাক পরে থাকার সুযোগ আমার নাই। কিন্তু অপরপক্ষে আমার ভাই বা স্বামী দিব্যি ঘুরছেন ছোট পোশাকে। তাদের পায়ে ঘন কালো লোম, সৌন্দর্য বলতে কিছু নেই। তবু সেই অসুন্দর পা বের করে ঘুরছেন ফিরছেন দৌড়াচ্ছেন। আমি গরমে ঘামছি, সিদ্ধ হচ্ছি। বিষয়টা আরো কুৎসিত, আমি কী পরবো বা পরতে পারবো না, যখন তা ঠিক করে দিচ্ছেন এই ঘন লোমশ হাতপাওয়ালা প্রায়নগ্ন পুরুষেরাই। 
৩. বিষের বাকসো উল্টে ফেলেছি। কারণ আমি কথা বলেছি, আমি বুঝে নিতে চেয়েছি আমার পাওনা। সবার আগে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সেইসব নারী, যারা আজীবন বিষের বাক্স বগলের তলায় নিয়ে আঁচলে ঢেকে তাতে বাতাস করেছে। কিংবা সেই তারা, যারা দেনা পাওনা, অধিকার, বঞ্চনা এসববের অর্থ খুঁজে না পেয়ে অর্থহীন অন্য কিছুর পিছনে জীবনপাত করেছে। আমি জানি, সংগ্রাম ছাড়া গতি নেই। জেগে ওঠা ছাড়া বিকল্প নেই। অর্থনীতিতে সমান অংশগ্রহণ ছাড়া সবকিছু যুঝে বুঝে নেয়া অসম্ভব। ঘরে যখন চাল কিনে আনবো, তখন আরো দশটা সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা হবে আমার।
যে ঘরে চালের চিন্তা নেই, সেই ঘরে হাত পেতে টাকা নেওয়া থেকেই শুরু- দামী উপহার আর বিলাসের ধারাবাহিকতায় দাসত্বের ইতিহাস রচনা হয়। ভালোবাসা আর প্রেমের নামে কত কত ইচ্ছে অনিচ্ছে স্বপ্ন উচ্চাশা ভুস করে হারিয়ে কোথায় মিলিয়ে যায়! আর প্রভু পুরুষটি তখন ‘পুরো সংসারের দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে দিয়েছি, আমার নিজেকেও’- এ জাতীয় স্থূল প্রশংসা বাণী কপচিয়ে কপচিয়ে মধ্যবয়সে পৌঁছায়। অন্য পারে পিএইডি স্থগিত, ক্যারিয়ার থমকিত, পদোন্নতি স্তম্ভিত।
মেয়ে শুধু রাঁধে আর খায়, খায় আর খাওয়ায়, আর বাচ্চা জন্মানোর স্বপ্ন দেখে। কারণ এরই মধ্যে তার বোরিং লাগতে শুরু করেছে। তার কিছু নেই, এই বোধও জেগেছে। তাই সে শিশু চায়। শিশু হলে তাকে নাওয়ায় খাওয়ায়, হাগু করায়। দিকে দিকে বলে বেড়ায় এর চেয়ে বড় আর কিছু নেই, ক্যারিয়ার কিছু নয়। যদিও এই কথা বছর আট দশেক আগে বুয়েট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় তার মাথায় ছিল না। বিসিএসে বসার সময় সে বিস্মৃত ছিল। তাই তো বটে। তখন সে ছিল একটা আস্ত মানুষ, একটা স্বপ্নময় হাতপা হৃদয়সমেত মানুষ। এই মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। সে আর ফেরে না কখনও।
একটা আস্ত জীবন বোধহীন, নিজের প্রতি ভালোবাসা আর স্বপ্নহীন- নিজেকে বঞ্চনা করা লাখ লাখ মুহূর্ত পার করে জীবনপ্রান্তে এসে পৌঁছায় সে। সেখানে প্রতিষ্ঠিত অবসরপ্রাপ্ত তৃপ্ত স্বামী আর নিজের জগতে আনন্দিত সন্তানের পাশে নিজেকে অচ্ছুত আর একটা আপাদমস্তক হেয়ালি মনে হয় কোন কোন দিন, কোন কোন রাত। 
(চলবে)
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.