দরজায় আর মেরো না শাবল

Kannaসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: অসুখ মানেই তো সুখহীনতা। তবে অসুখে একটানা এতোটা স্বস্তিহীনতাও যে হতে পারে তা আগে কখনই অনুভব হয়নি। নিঃশ্বাস নিতে না পারার যে কী কষ্ট তা এবারের অসুখে না পড়লে অনুমান করতেও পারতাম না।

জীবনের একটা বড় সময় আমার অনেক জটিল অসুস্থতার মধ্য দিয়ে কেটেছে। শুরুটা হয়েছিল আমার কন্যা সন্তানটি জন্ম দেয়ার সময়ে সৃষ্ট জটিলতায়। ক্রমে সেটা জটিলতর হয়েছে। এই অসুস্থতা আমার জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। বদলে দিয়েছে জীবনের মানচিত্র।

অসুখের জটিলতা বুঝতে না পেরে দুই একবার তো দেশের ডাক্তারও হাল ছেড়ে দিয়েছে। দেশে, দেশে বাইরে কতবার চিকিৎসার জন্য গিয়েছি। একা। দেশের বাইরের হাসপাতালের রিসিপশনে নিজের ব্যাগ, পাসপোর্ট, ডলার, মোবাইল ফোন জমা রেখে ভর্তি হয়েছি। কখনও ডাক্তারকেই বলেছি, আমি সুস্থ হতে পারলে দেশে ফিরে যাব, আর মরে গেলে হাসপাতালের কাজেই আমার শরীরটি ব্যবহার করার ব্যবস্থা করে দেবেন। কেউ আমার মরদেহের দাবিদার হবে না।

ডাক্তার হেসে হেসে বলেছেন, ‘আপনাকে মরতে দিলেই তো মরবেন। ভাববেন না, খুব সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে যাবেন’। আমার বিশ্বাস হতো ডাক্তারের আশ্বাসে। কারণ সে অসুস্থতার যন্ত্রণা বোধ আমার তেমন ছিল না। তলপেটে একটা জ্বালা বোধ করতাম। মাঝে মাঝে চিনচিন করে উঠতো ব্যথাটা। দেশের ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভয়াবহ কোন রোগের আশঙ্কা করে ফেলতেন। তখনও দেশে ক্যান্সার নিয়ে ভালো কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারতো না ডাক্তাররা। আর আমি ডাক্তারের কথা মানতে পারতাম না।

বিশ্বাস হতো না এতো কম যন্ত্রণায় কারো কঠিন মরণ রোগ হতে পারে। থেরাপির মাঝে মাঝে যখন আমি দেশে ফিরতাম, ডাক্তারকে বলে আসতাম, আর হয়তো দেখা হবে না। ডাক্তার বলতেন, আপনার অসুখটা জটিল, ভোগাবে, তবে মারবে না সহজে। মরলে অন্য কোন রোগে মরবেন।

সব শেষে আমি ২০১২ সালে শেষবারের মতো চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছি। আর যাওয়া হয়নি। প্রতি বছর দেশেই একবার করে টেস্ট করিয়ে নিচ্ছি। সেই অসুস্থতা আর বোধ করি না। যদিও এখনও ডাক্তার বলে আপনার শারীরিক জটিলতাটা পুরোপুরি সারেনি। আমি পাত্তা দেই না ডাক্তারের কথায়।   

Laily
সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

তবে সেই ডাক্তারের কথাটা আজ কয়েকদিন খুব মনে পড়ছে। গাইনোকোলজিস্ট ডাক্তার রোহিত রঞ্জন রায়ের হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। তিনি সব সময় গুনগুন করে গান গাইতেন। আমি একা যাই চিকিৎসার জন্য, তাই হয়তো একটু বেশি সময় আমাকে দিতেন। পাশের চেয়ারে বসে এমন কিছু বলার চেষ্টা করতেন যাতে আমি একটু হলেও হেসে উঠি।

একবার কলকাতার পিয়ারলেস হসপিটালের পাশের পুলিশ স্টেশনে আমি আমার পাসপোর্টের ফটোকপিসহ ইনফরম করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। পুলিশের একজন অফিসার মাঝে মাঝে আমাকে হাসপাতালে দেখতে আসতেন, খোঁজখবর নিতেন। সেই পুলিশকে হাসপাতালের অ্যাটেনডেন্স খাতায় সই করতে হতো। আমি যেদিন হাসপাতাল ছেড়েছি সেদিন সেই পুলিশ অজয় আচার্য্য আমাকেসহ হাসপাতালের ডাক্তার নার্সকেও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

পুলিশ অজয় দাদা আমাকে প্রথমে একটি মন্দিরে নিয়ে যান। আমাকে ফটকের বাইরে রেখে তিনি পূজা দেন। তারপর পূজারীকে দিয়ে আমার হাতে একটি রঙিন সুতা বেঁধে দেন। পূজারী বলেন, যতদিন আমি সেদেশে আছি, যেন সেই সুতোটা খুলে না ফেলি। আমি কোন ব্যাখ্যা জানতে চাইনি। বিশ্বাস করেছিলাম। কয়েকদিন পর তিনি নিজেই আমাকে ট্রেনের টিকেট করে ট্রেনে তুলে দিয়েছিলেন। আমি যতক্ষন নেটওয়ার্কের মধ্যে ছিলাম তিনি বার বার আমাকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিয়েছিলেন। দেশে ফেরার পরও দুবার তার সাথে আমার কথা হয়। তারপর আর খোঁজ পাইনি সেই মানুষটির। আমারও আর অসুস্থতার বেদনা আগের মতো চিনচিন করে না তলপেটে, কিন্তু বুকের কোথায় যেন ডাক্তার রোহিত রঞ্জন রায়, পুলিশ অফিসার অজয় আচার্য্য, নার্স শমিষ্ঠা মহলানবিশ এই মানুষগুলোর জন্য বেদনা চিনচিন করে।  

গৃহবন্দি সময় কাটাচ্ছি কয়েকদিন। সূর্যের আলোও দেখছি না। কেউ আমাকে আটকিয়ে রাখেনি। ইচ্ছে করেও আমি গৃহনির্বাসন নেইনি। শরীরটাকে বিছানা থেকে টেনে কোন রকমে দাঁড় করানো যায়, এগোনো যায় না। মাথা ঝিমঝিম করে। দম আটকিয়ে আসে। হাঁপিয়ে উঠি। ঘেমে যাই। আবার এসে বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ি। কাত হতেও পারি না। তাতে শ্বাসকষ্ট বাড়ে। মুখ খুলে নিশ্বাস নিতে হয়। নাকের ফাংশান টোটালি বন্ধ হয়ে আছে।

কোন খিদেবোধ নেই, তবে দুর্বল লাগে। মুটোভর্তি ওষুধ নিতে হচ্ছে। এন্টিবায়োটিকের পরপর তিনটি ডোজ চলছে। ডাক্তার বলেছেন, খালি পেটে থাকা যাবে না। যতটা পারি যেন খাবার নেই। তাই মাঝে মাঝে উঠে রান্না ঘরে যাই। রাইস কুকারে দু’মুঠো চাল সেদ্ধ দিয়ে বিছানায় আসি। ভাতের সাথে কখনও করলা, কখনও বেগুন, তো কখনও আলু সেদ্ধ দিয়ে ভর্তা বানিয়ে নেই। সে খাবার জোর করে মুখে তুলে দিয়ে ওষুধ গিলি। ঘুমের ওষুধও বাড়াবাড়ি রকমের দেয়া হয়েছে। তাই তন্দ্রাচ্ছন্নভাব থাকছে সবসময়। তবে ঘুমাতে পারছি না মোটেও। দিনে রাতে ছটপট করছি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে, গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়তে।

এবার ভয়াবহ নিঃসঙ্গ ও ভয়ঙ্কর কয়েকটি দিন কাটছে আমার। যেন মরে মরে বেঁচে থাকা। এইতো সেই অসুখ যাতে মানুষ মরে যেতে পারে যে কোন সময়। কতবার যে মনে হচ্ছে এই বুঝি থেমে গেল সবকিছু। কিছুক্ষণ থেমেও থাকে। তারপর ঘাম দিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে ধিক ধিক করে। বার বার ফোন আসে। নিউজের তাগিদ দিতে, খবরের খোঁজ দিতে। ফোন ধরতে ভালো লাগে না। কথা বলতে ভালো লাগে না।

শুরুটা হয়েছিল ১৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী যেদিন কুড়িগ্রামে এসেছিলেন। তার আগের কয়েকদিনের ধকল, ছেলের চিকেন পক্সে আক্রান্ত হওয়া, দিনরাত খাটাখাটুনি শেষে সেই রাতেই শরীরে ব্যথা ও জ্বর বোধ হতে থাকে। পরদিন আবার জেলার বাইরে একটা ট্রেনিংযের কাজে যেতে হচ্ছে। নানা কারণে দেহ-মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে নিরুপায়। সেখানে পরদিনই আরো জোরে জ্বরের আগমন, সাথে প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও পক্স।

অচ্ছ্যুত হওয়ার ভয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে দ্রুত বাসায় ফিরে আসা। সামর্থের সবটুকু দিয়ে চিকিৎসা চলছে দিনরাত। কিন্তু সংকট মোড় ঘুরিয়ে নিল নিউমোনিয়ায়। এই অসহ্য রোগটি আমার কখনও হয়নি। মাঝে মাঝে একটু আধটু ঠাণ্ডা লাগলে খুব সামান্য কাশি হতো। ২/৪ দিনেই পুরোপুরি সেরে যেত।

এবারই প্রথম বুঝলাম এর ভয়াবহতা। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এই বুঝি দম থেমে গেলো। শরীর ঘেমে উঠছে। বুকের মাঝে খিল চেপে বসছে। হাতদুটো অবশ হয়ে আসে। একগ্লাস পানি এগিয়ে দেয়ার মতো, জরুরী ঔষধটা এগিয়ে দেয়ার মতো কেউ নাই পাশে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যখন দরজাটা আটকাই, মনে হয় পরদিন হয়তো খুলতে শাবল চালাতে হবে।

আমি আধো ঘুমে আধো জাগরণেও শুনতে পাই শাবলের আঘাত। আমার দরজার ওপারে। আমি আরো ঘুমাতে চাই। আমাকে ঘুমাতে দেয়না। সেই শাবলটা রোজ আমার বুকে চালায় অন্য কেউ।

লেখক সাংবাদিক

 

শেয়ার করুন:

এই লেখাটা পড়ার পর কিছু লেখার ভাষা থাকেনা বা লিখতে হয়না । এতো সাহসী আর লড়ে যাওয়া মানুষকে শুধু এই টুকু বলা যায়, হাজার বার স্যালুট। অমন মনের আলোর কাছে গোটা দুনিয়া অন্ধকার। ভালো থাকবেন, সুস্থ্য থাকবেন। আবার ও লিখবেন , হাজারবার লিখবেন। অনেক অনেক শুভ কামনা আপনার জন্য।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.