আমি যখন ‘অসম্পূর্ণা’

Frida_Kahlo_(self_portrait)উম্মে ফারহানা: বিষয়টা হয়তো খুব ছোট, হয়তো আমার এই নিয়ে কথা বলাটাই উচিৎ হচ্ছে না। হয়তো যে কেউ বলবেন আমি ওভার রিঅ্যাক্ট করছি। কিন্তু না বলেও পারলাম না।

ঘটনা হল আমার এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্রটি হারিয়ে গিয়েছিল ২০০৯ এর সেপ্টেম্বর মাসে। ২০১১ তে চাকরি নেবার আগে পর্যন্ত ফটোকপি দিয়ে কাজ চালিয়েছি। উপজেলা অফিসে অনেক চক্কর কাটার পরেও লাভ হয়নি। নির্বাচন কমিশনের জেলা অফিস খুলেছে শুনে সেইখানে গিয়ে জানিয়েছিলাম, সেখান থেকেও বলেছিল আগারগাঁও গিয়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন কাজে ঢাকা গেলেও ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অফিসের পরিচয়পত্র দিয়েই কাজ চলছিল।

ইন্ডিয়ান এম্বেসিতে ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়ে দেখলাম জাতীয় পরিচয়পত্রই লাগবে। সমস্যা হল, আমার জাতীয় পরিচয়পত্র ২০০৭ এ করা ছিল। মাতার নাম এবং স্বামীর নাম লেখা ছিল তাতে। পুরুষদের আইডিতে নাকি পিতা আর মাতার নাম লেখা থাকে। আমার বাবা পরলোকগত বলেই কিনা জানিনা মাতার নাম ছিল স্বামীর নামের পরে। আমার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে ২০০৮ এ। তার পর সকল অফিসিয়াল কাজে পরলোকগত পিতার নাম ব্যবহার করেছি। পুনরায় বিয়ে করেছি ২০১২ তে, ততদিনে আমার আইডি মিসিং। তথ্য উপাত্ত সংশোধন করতে হলে আগের পরিচয়পত্রটি জমা দিতে হয়। আমার কাছে যেটি নেই।

তথ্য সংশোধনের জন্য জমা দিতে পুরনো হারিয়ে যাওয়া আইডির জন্য আবেদন করব। থানায় জিডি করতে হলো। ডিউটি অফিসার স্বামীর নামের জায়গায় আমার প্রাক্তন স্বামীর নাম লিখলেন। আমার স্বামীই আমাকে থানায় নিয়ে গিয়েছিল। যেহেতু বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ আমলা থেকে শুরু করে রিকশা চালকেরা পর্যন্ত কোন নারীর কথার গুরুত্ব দেন না এবং কাজের সময় তালবাহানা করেন, ব্যাংক, থানা, নির্বাচন কমিশন অফিস সকল কাজেই আমার স্বামী সাহায্য করে, সঙ্গে থাকলে। সে না থাকলে যে আমার কাজকর্ম আটকে থাকে তা না, কিন্তু দুজনে একসঙ্গে বেরোলে চায়ের দোকানে চা অর্ডার করলেও দেখি দোকানী আমার কাছ থেকে অর্ডার নেন না। এক বাসায় ভাড়া থাকতাম যেখানের দারোয়ান আর কেয়ারটেকার আমাকে সালাম পর্যন্ত দিতেন না, আমার স্বামীকে দেখলে স্যর স্যর বলে উঠে দাঁড়াতেন।

জিডির কপি হাতে নিয়ে দেখলাম তাতে স্বামীর নামের স্থলে আমার প্রাক্তন স্বামীর নাম লেখা। আমি আমার স্বামীর মুখের দিকে চাইলাম, সে বলল এটা কোন সমস্যা না, হারিয়ে যাওয়া আইডি হাতে পেলে যখন আবেদন করব তখন তাতে ঠিক নাম লিখলেই হবে, জিডিতে যে আইডি হারিয়েছে সেই অনুয়ায়ীই তথ্য দিতে হবে।

FB_IMG_1431803590252
উম্মে ফারহানা

কেউ বলতেই পারেন যে এই বিব্রতকর অবস্থা এড়ানোর জন্য আমার উচিৎ ছিল বিয়ের আগেই বা ঠিক পরপরই এই সকল তথ্য সংশোধন করে নেওয়া। এতদিন পর এসে বিবাহবিচ্ছিন্ন স্বামীর নাম, ভুলে যাওয়া অতীতের কোন ঘটনা এসে আমার বর্তমানকে যে সংকটে ফেলতে পারছে তার দায় আমারই।

আমার প্রশ্ন হলো, কী হতো উল্টোটা ঘটলে? আমার প্রাক্তন স্বামীর আইডি হারানো গেলে বা না গেলেও, তাঁকে তো আবেদন করবার সময় আমার নাম তাড়া করবে না। শুনেছি তিনিও আবার বিয়ে করেছেন। কই, তাকে তো তথ্যউপাত্ত সংশোধনের জন্য পয়সা খরচ করতে হচ্ছে না। তাঁর আইডিতে আমার নাম ছিলই না যে উনি পাল্টাবেন।

আমি খুব সামান্য মানুষ। বলবার মতন খুব বড় পরিচয় আমার হয়ত নেই। কিন্তু লেখাপড়া শিখেছি, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ে একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি আজ প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। আমার ছাত্রেরা, সহকর্মীরা আমাকে আমি হিসেবেই চেনেন, জানেন।

চাকরি নেবার সময় আমি সিঙ্গেল ছিলাম, পরে বিবাহিত হয়েছি তা তাঁরা তথ্য হিসেবে জেনেছেন। কিন্তু তাতে তাদের তেমন কিছু এসে যায় না। কিন্তু যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান একজন নারী সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের অনেক কিছু এসে যায় আমার বৈবাহিকতায়, বৈবাহিক অবস্থায়, বৈবাহিক সঙ্গীর নামে বা পেশায়।

জাতীয় পরিচয়পত্রে স্ত্রীর নামও কী থাকে পিতা বা মাতা মৃত হলে? আমি জানিনা। কিন্তু বিবাহিত নারীর স্বামীর নাম পাল্টাবার ‘দোষে’ তাকে যে অর্থদণ্ড দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রে সংশোধন করতে হচ্ছে তাতে বোঝা যায় নারী, সে নিজে যত যোগ্যই হোক না কেন, সে নিজের পরিচয়ে, বাবামায়ের পরিচয়ে সম্পূর্ণা নয়, সে অসম্পূর্ণা।        

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.