রাত পোহাবে শারদপ্রাতে

Lucifer
লুসিফার লায়লা

লুসিফার লায়লা: আমাদের ছেলেবেলায় আমাদের পাড়ায় কোন দুর্গাপূজা হতো না। তাই পুজার লম্বা ছুটি কাটতো সমবয়েসিদের সাথে হেসে খেলে, বাসায় আসা নতুন পূজা সংখ্যা নেড়ে চেড়ে। পূজার কদিন সকালবেলায় দূরের মাইক থেকে বাজতো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়ার রেকর্ড। অনেকটা হেমন্তের গলায় দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় দশরথরণধারীনিকে সত্যি যেন জাগিয়ে দিয়ে গাইতেন, ’জাগো, জাগো দুর্গা…’। অথবা সুপ্রীতি ঘোষাল যখন গেয়ে ওঠেন ‘বাজলো গো, বাজলো তোমার আলোর বেনু’ সমস্ত মহল্লা জুড়ে যেন পূজোর আবেশ ছড়িয়ে যেত। হেমন্ত,মান্না, লতা,আশা, সন্ধ্যা-সবাই মিলে সারাটা পুজোয় গানে মাতিয়ে রাখতো এমাথা ওমাথা।

পূজোর কদিনে পাশের পাড়ায় প্রতিমা দেখতে যেতাম অনাহুতের মত। মোটা বাঁশের ঘেড়ার এপাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম ওপাশের সুবর্ণ কঙ্কন পড়া রমনী আর সুবেশী পুরুষের দল। ধুপধুনো, ফুল,চন্দন,পূজোর থালা, শাঁখের শব্দে কেমন আচ্ছন্ন হয়ে আছে মাতৃরুপেন সংস্থিতা। দূর থেকে দেখা সে পূজোর আনন্দ ছিল বটে, কিন্তু আমোদ ছিলো না। 

Puja 2দূরের থেকে দেখা শোনার ব্যথা কোন এক শরতের বিকেল বেলায় ঘুচে গেল। গলিতে ঢোকার মুখে দেখি বড় নীল রঙের ব্যানার হাওয়ায় দুলে দুলে প্রচার করছে আমাদের পাড়ার প্রথম দুর্গা পূজার সংবাদ। সত্যি আনন্দ হয়েছে, মনে হয়েছে পূজার কটা দিন আমাদেরও আনন্দে আমোদে কাটবে।

মনে আছে সেই প্রথম পূজোর দিনগুলোতে মা-সহ আমরা প্যান্ডেলে বসে পূজো দেখতাম। পাড়ার সব বিবাহিত মেয়েরা বাপের বাড়ির পূজোতে কেমন ঝলমল করতে করতে আসতো। মুসলমান বাড়ির সন্তান ছিলাম বলে কিছু মাত্র আনন্দের ঘাটতি হয়নি আমাদের। ভোগের প্রসাদে আমাদের অধিকার কিছু কম ছিল না। দশমীর দিন পাড়ার বউরা সদর দরজায় দাঁড়ানো আমার মায়ের গালে সিঁদুর ডলে দিলে আমার মায়ের মুখের হাসি মুছে যায়নি, বরং দ্বিগুণ হয়ে ঠিকরে পড়েছে। ওদের সিঁদুর লাগিয়ে দেয়ার অধিকার বোধ আর আমার মায়ের সানন্দে গ্রহণের ছবির ভেতর সার্বজনীন উৎসব শব্দটাকে প্রথমবার চিনতে শিখেছি। সেই প্রথম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শব্দটাকে বই খাতার আগল ভেঙ্গে মূর্ত হতে দেখা।
পাড়ার পূজোয় কতকাল হয় আর থাকা হয় না। এখন কেবল ফোন করলে দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দে বুঝি পূজো চলছে। নতুন ধরনের গান ভেসে আসে ইথারে, সেই নতুন গানের ঝকমারির ভেতর বুঝি আমাদের সময়ের পূজো এখন পুরনো। তবু শরতকালের গায়ে লেগে থাকে ধুপধুনোর গন্ধ। নতুন কাশের গুচ্ছের গায়ে আগমনীর আলো।

এই দূর দেশের আকাশের গায়ে নতুন সাদা মেঘের দলে ভেসে আসে ছুটির আমেজ, পূজোসংখ্যা প্রথমে হাতে পাবার লোভ, শাঁখের ধ্বনি। আর ভেসে আসে রাশি রাশি প্রতিমা ভাঙ্গার খবর। শিরোনাম পরে অবসাদ কুড়াই তারপর চুপচাপ সরে থাকি নেট দুনিয়া থেকে। মনে হয় যাক পুরো দেশটা রসাতলে, ফিরে দেখবো না। কিন্তু কোথাও এখন ভেতরের মনুষ্য প্রবৃত্তি খোঁচাখুঁচি করে। কানের কাছে বাজায় একই রেকর্ড।

প্রতিকার করবার শক্তি নেই তাতে কি? প্রতিবাদ তো করো। বোতাম চিপে চিপে প্রতিবাদ লেখা চলে, কিন্তু তাতে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রর চোখে আলো পড়ে না, কুম্ভকর্ণের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে না। ফলে প্রতিকার শব্দটা প্রহরা পুলিশের দুনলা রাইফেলের ভেতর শিস দিয়ে গান গায়।
আর যারা বীরবেশে প্রতিমা ভেঙ্গে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে তারা জানে না। মহানবীর বিদায় হজ্জের ভাষণ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালনের প্রতিজ্ঞা থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবল এক একজন অসুর হয়ে উঠছে। প্রতিকার নেই যেনে যারা প্রতিবাদ করছে না, তাদের নির্লিপ্তি বলে দিচ্ছে, আসিছে সন্ধ্যা মৌন মন্থরে। চোখের সামনে অমানিশা নেচে নেচে বলছে অসুরের জয়, অপশক্তির জয়। তবু ভূলুন্ঠিত প্রতিমার তৃতীয় নয়ন জেগে থাকে পুজারীর বুকের তলায়। ভক্তের মনের সিংহাসনে। বুকের তলায় মনের উচ্চাসনে যে সহস্র মানস প্রতিমা ভেসে বেড়ায় শহরে বন্দরে তাঁকে আঘাত করে ভাঙ্গে সে শক্তি নেই কোন জল্লাদের। সেখানেই দুর্গা প্রতিমা শক্তিরুপেন সংস্থিতা। শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময়ের উদারতায় মানুষ জাগবে যখন তখন রাত পোহাবে শারদপ্রাতে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.