আমার নানী, তাসলি, গোলাপি, শাপলারা

Cage 2তামান্না ইসলাম: আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, আমাদের বাসায় একজন বয়স্ক গৃহকর্মি রাখা হলো। তাঁর নাম কেউ জানে না, সবাই ডাকে ‘কমলার মা’।

তাঁকে কোন পরিচিত সূত্র ধরেও পাওয়া যায় নাই। একদিন হঠাৎ করে রাস্তায় তাঁকে দেখেন আমার মা। একজন মোটামুটি সম্ভ্রান্ত বয়স্ক নারী এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মা তার সাথে কথা বলে জানতে পারেন যে সে অসহায়, থাকার জায়গা নাই। যে কোন ধরনের কাজ পেলে করতে রাজি।

তখনও দেশে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ এতো বৃদ্ধি পায়নি, মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে, তাই খুব বেশী কিছু না ভেবে মা তাকে নিয়ে আসলেন। আমরা তাকে ডাকতাম নানী। নিজের নানীর কাছ থেকে যতটুকু আদর পেয়েছি, এই নানীর কাছ থেকে তার সহস্র গুণ বেশী আদর পেয়েছি। এই নানী শিক্ষিত না, মানে কখনো স্কুলে যায়নি। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার তার অভাব ছিল না কোন। মার্জিত, ভদ্র, নম্র, পরিশ্রমী এবং সদা হাস্যজ্জল।

আমাদেরকে গোসল করান, খাওয়ানো, আমাদের জন্য রান্না করা, আমাদেরকে গল্প বলা এমন কি সুরা দোয়া শিখানো পর্যন্ত করতেন।

আমার সেই নানীকে দেখলে বুঝা যেত যে বয়সকালে ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন। এই রূপই হয়েছিল তার কাল। গ্রামের মাতবরের ছেলে খুব অল্প বয়সে জোর করে বিয়ে করে তাকে। প্রথম প্রথম সুখেই দিন কাটছিল। সম্ভ্রান্ত পরিবারের বউ। তার স্বামীও পরে  গ্রামের মাতবর হয়। আদর যত্নেই দিন কাটছিল। তবে স্বামীর বেজায় বদ মেজাজ। রাগ উঠলে মাথার ঠিক থাকে না। একটা পশু হয়ে যায়।  তিনি এগুলো সব সহ্য করেই সংসার করছিলের।

তারপর যখন নানীর একে একে মেয়ে হওয়া শুরু করলো, সেই অত্যাচার আরও বাড়তে লাগলো। প্রথম মেয়ে কমলা মারা গেল অযত্নে, রেখে গেল কমলার মা নামটা। এর পর আস্তে আস্তে আরও মেয়ে হল তিন-চারটা। বেঁচে থাকলো দুই জন রাবেয়া আর ছয়ফুল। ইতি মধ্যে ছেলে না হওয়ার অপরাধে এবং মূলত ছেলে সন্তানের আশায় তার মাতবর স্বামী আরেকটি ছোট মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসে, যেই মেয়েটি তার নিজের মেয়ের চেয়েও বয়সে ছোট।

এই ছোট মেয়ে বয়সে ছোট হলেও মাথায় দারুণ বুদ্ধি। উপরন্ত ছেলে হওয়ায় তার জোরই আলাদা। তার ছেলে যেন সব জমিজমার মালিক হয় সেই দুরভিসন্ধি করতে থাকে সে। তার প্ররোচনায় নানীর উপরে শারীরিক অত্যাচার আরও বাড়তে থাকে। নানীর একটা আঙ্গুল ভেঙ্গে দিয়েছিল, যেটা আর কোনদিন ভাল হয়নি। একটা কানের লতির অর্ধেকটা ছিঁড়ে ফেলেছিল। ততদিনে নানীর মেয়ে দুইটির বিয়ে হয়ে গেছে।

মেয়েরাই মাকে বুদ্ধি দেয় “তুমি বেরিয়ে এসো, নিজের জীবন বাঁচাও।” নানী ঠিকই এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিল, কিন্তু মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে সে উঠবে না কিছুতেই। এই হলো তার আমাদের বাসায় আসার ইতিহাস।

আমার হাসি-খুশী নানী প্রায়ই গীত গাইতেন, কিচ্ছা কাহিনী বলতেন। সেই সব গীতে, কিচ্ছায় মাঝে মাঝে থাকতো নয়ন মাতবরের অত্যাচারের কাহিনী, আর তার প্রতি অভিশাপ, ঘৃণা। গীত বা কিচ্ছার ওই অংশে নানীর চোখে গভীর বেদনার ছায়া পড়তো। এতোই গভীর যে আমাদের মত ছোটদেরও চোখ এড়াতো  না। তখন থেকেই সব নয়ন মাতবরদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষের পাহাড় জন্মেছে আমার কচি মনে।

এই ঘটনার অনেক অনেক বছর পরে আবারো একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আসিয়ার মা নামের এক নারী এক মাসের বাচ্চা নিয়ে ছুটা  কাজ খুঁজছে। স্বামীর আরেক বউ আছে, তাই এই বউয়ের দায়িত্ব সে নিবে না, এমনকি এই এক মাসের সন্তানেরও না।

আমি অবাক হয়ে দেখতাম আসিয়ার মা আমার মাকে বলতেন ভাতের মাড় না ফেলতে, সেটা খেলে তার বুকে দুধ আসবে, সেই দুধ খেয়ে ওই শিশু বেঁচে থাকবে। তুলতুলে বাচ্চাটাকে একটা শতছিন্ন কাঁথায় মুড়ে মাটিতে ফেলে রেখে মা অন্যের বাসার ঘরের মেঝে মুছছে। কী হৃদয়বিদারক।

তার চেয়েও হৃদয়বিদারক হলো, এই কাজটা করতে না পারলে মা, ছেলে দুইজনই না খেয়ে মরবে, আবার এক মাসের বাচ্চা নিয়ে ওই মহিলাকে কেউ কাজও দিতে চাচ্ছে না।

আরও কিছুদিন পরে, আবারো এক নারী বাসার সামনে কাঁদছে, বাচ্চা হয় না বলে স্বামী তাড়িয়ে দিয়েছে। এই নারী আবার একটু বেশী সহজ সরল ধরনের, মাত্র গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছে। সেও এক সময় আশ্রয় পেল আমাদের বাসায়। আমার বাবা-মা হয়ে গেল তার বাবা মায়ের মতো। অনেকদিন আমাদের বাসায় কাটানোর পর সেই নারী একদিন পালিয়ে গেলো এক রিকশাওয়ালার হাত ধরে। মনে আছে যাওয়ার ব্যাপারে সে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সেই যে গেলো, চিরতরে গেল হারিয়ে।

এই গল্পগুলো সবই অনেক দিন আগের। দেশ এখন অনেক দিকেই অনেক এগিয়ে গেছে। নারী স্বাধীনতার জোয়ার এসেছে। মেয়েরা বিভিন্ন দিকে  অনেক ধরনের উন্নতি  করছে। দেশে নারী শিক্ষার  হার বেড়েছে, অনেক বেশী মেয়ে চাকরী করছে। দোকানে, ব্যাঙ্কে, গার্মেন্টসে সব জায়গায়ই মেয়েদের পদচারণা বেড়েছে। কিন্তু সেই উন্নতি কি শুধুমাত্র উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে, নাকি ছড়িয়ে পড়েছে নিম্নবিত্তদের মাঝেও? আজকাল নাকি বাসায় গৃহ পরিচারিকা পাওয়া যায়  না, মেয়েরা সব গার্মেন্টসে কাজ করে, এ নিয়ে গৃহবধূদের আক্ষেপের শেষ নাই।

এতো সব কিছুর পরেও আমি আবারো সেই একই ঘটনা দেখলাম। আমার বিয়ের সময় শ্বশুর বাড়িতে এক কিশোরী মেয়ে ছিল, নাম তাসলি, ওর  বাবা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিল ওকে। কয়েক বছরের মধ্যেই জামাইয়ের কিশোরী বউয়ের শখ শেষ, আরেক কিশোরী বউয়ের প্রয়োজন হলো। ফলাফল তাসলি দুই সন্তানসহ ঘরছাড়া ষোল-সতের বছর বয়সেই। উন্নতি বলতে এতটুকুই, তাসলি এখন গার্মেন্টসে কাজ করে, মানুষের বাসায় না। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে ছেলে দুটোকে মানুষ করছে।

মাত্র কিছুদিন আগে আমার এক আত্মীয়ের বাসায়ও  একই ঘটনা ঘটলো। গোলাপি আর শাপলা দুই বোন, উত্তর বঙ্গের মেয়ে। বাবা মা সাদা সিধা, অত্যন্ত দরিদ্র। প্রথমে গোলাপি ছিল আমার আত্মীয়ের বাসায়, ওদের ছোট ছেলেটিকে দেখাশোনা করতো। গোলাপি কৈশোরে পা দিতেই তাকে বিয়ে দিয়ে দিল তার বাবা, বিরাট অঙ্কের যৌতুকের বিনিময়ে। কালো গোলাপির ভাগ্য ভালো, যৌতুকের পাল্লা ভারী হওয়ায় সুখেই ঘর করছে। বলা বাহুল্য  দরিদ্র পিতা  নয়, যৌতুক দিয়েছে আমার সেই পরিচিত পরিবার, যারা গোলাপিকে মেয়ের মতোই আদর করতো।

এর পরে তাদের বাড়িতে আসলো ছোট বোন শাপলা। দারুণ সুন্দরী ফুটফুটে শাপলার দিক থেকে নজর সরানো যায় না। মেয়েটি কাজে কর্মে যেমন ভালো, তেমনি মায়া কাড়া ব্যবহার। এই দম্পতির কোন মেয়ে নাই, শাপলা আসলেই হয়ে গেল তাদের মেয়ে, সে তাদেরকে ডাকতো “মা” আর “বাবা”।

ধীরে ধীরে শাপলা বড় হচ্ছে, তাকে অল্প-স্বল্প শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে। তার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। কিশোরী শাপলা প্রেমে পড়লো এক বিবাহিত ড্রাইভারের। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সে যখন জানতে পারলো ড্রাইভার বিবাহিত, তার চেয়ে বয়সে বড় ছেলে আছে, সে দারুণ লজ্জিত হলো। কিন্তু কিছুদিন পরে সব ভুলে আবার সেই বাবার বয়সী ড্রাইভারের তিন নম্বর বউ হওয়ার জন্য অনিশ্চিত পথে পা বাড়ালো শাপলা। ড্রাইভারের দ্বিতীয় এবং বর্তমান স্ত্রী মামলার ভয় দেখিয়ে শাপলাকে  ঠিকই ঘর ছাড়া, বর (?)  ছাড়া, আশ্রয় ছাড়া করলো। তার ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে ঠেকলো তখন?  

নারী উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ হওয়া দরকার এই সব কিশোরী মেয়েদের এবং তাদের পিতা মাতাদের সচেতনতা বাড়ানো। হিন্দি সিনেমা দেখে এই সব মেয়ের মন যতই রঙ্গিন স্বপ্ন দেখুক না কেন, তাদেরকে বুঝাতে হবে স্বপ্ন আর বাস্তব এক না। আবেগের বশে করা ছোট্ট একটি ভুল, একটি দুর্ঘটনার মাশুল সারা জীবন দিতে হতে পারে।

 

শেয়ার করুন:

নারী উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ হওয়া দরকার এই সব কিশোরী মেয়েদের এবং তাদের পিতা মাতাদের সচেতনতা বাড়ানো। হিন্দি সিনেমা দেখে এই সব মেয়ের মন যতই রঙ্গিন স্বপ্ন দেখুক না কেন, তাদেরকে বুঝাতে হবে স্বপ্ন আর বাস্তব এক না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.