আইসিস কি তাহলে ঢুকেই গেল বাংলাদেশে?

ISISসুমন্দভাষিণী: বাংলাদেশের মাটিতে এতোদিন শুধু ইসলামিক স্টেট সংগঠনটির নামই শোনা যাচ্ছিল। কাল তারা সদর্পে তাদের প্রথম সফল অভিযানের কথা বেশ জোরালোভাবেই জানান দিল। দেশটিতে ‘নিরাপত্তা’ যখন প্রশ্নবোধক হয়ে উঠেছে, ঠিক সেইসময়ে এমন ‘ঘোষণা’ দিয়ে একটা মিশন সফল করা আলোচনার দাবি রাখে।

এর আগে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা এটিবিও এমন ঘোষণা দিয়েছে একেকটা হত্যাকাণ্ডের পর। সরকার তাদের কী বিচার করেছে বা কতটুকু বিচার করেছে, তা আমরা দেখেছি। সরকারের এই নির্লিপ্ততার মাশুল আমাদের সবাইকেই দিতে হবে আজ অথবা কাল।

বিবিসি বাংলার অনলাইন সংস্করণে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আজ সন্ধ্যায় একজন ইতালীয় নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নগরীর গুলশানে এই ঘটনা ঘটে, তবে এর কারণ সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। পুলিশ জানিয়েছে, গুলশানের একটি সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মোটর সাইকেল আরোহী ঘাতকরা তাভেলা সিসারোকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এরপর কাছের একটি হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মি. সিসারো নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিসে কাজ করতেন’।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তিনি ঢাকায় আমেরিকান স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।

প্রশ্ন উঠে, আইসিস কেন একজন বিদেশিকেই কেন বেছে নিল তাদের মিশন সফল করার জন্য? আর এমন একটা সময়ে যখন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তাদের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছে। ক্রিকেট বিশ্বে এ নিয়ে কম-বেশি আলোচনাও হচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে, তাদের ‘ভুল’ ভাঙিয়ে দেশে নিয়ে আসতে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একজন অস্ট্রেলিয় কর্মকর্তাও ঘুরে গেছেন, কথা বলে গেছেন দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সাথে। সাম্প্রতিক সময়ে তিন-তিনটা বিশ্ব ক্রিকেট টিম খেলে গেছে বাংলাদেশে, কোথাও কিছু হয়নি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম আসতে চাইলো না। তার মানে কি তাদের কাছে কোনো খবর আছে? এটা কিন্তু ভাবনার বিষয়।

আমাদের দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর আস্থা হারাই না, তারপরও যখন কোনো ঘটনারই কোনো সুরাহা হয় না, তখন অসহায় বোধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার মাঝে-সাঝেই কথা হয়। ঊনি আমাকে আশ্বস্ত করেন, দেশে কিছু ঘটবে না আর, আর কোনো ব্লগার বা মুক্তচিন্তার মানুষ নিহত হবে না। কিন্তু ঊনি আশ্বস্ত করার কয়েকদিনের মধ্যে সর্বশেষ নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে দিনে-দুপুরে বাড়িতে গিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো। ব্লগার বা মুক্তচিন্তকরা একের পর এক দেশ ছাড়ছে। কেন? হুমকি নেই তাহলে? কেন বিশ্বাস হারাচ্ছি আমরা নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের ওপর থেকে? সরকারের ওপর থেকে?

জনগণের জানমালের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু যে দেশে জনগণের ভোটে কেনা সরকারের নিরাপত্তাই কেবল নিশ্চিত হয়, সেখানে জনগণ কার আশায় থাকবে? আজ একজন বিদেশি নাগরিককে মেরে ফেলা হলো। হতে পারে, এটা ছিনতাইকারীদের কাজ, অথবা সত্যি সত্যিই আইসিসের কাজ। তার মানে আইসিস বেশ অনেকদিন ধরেই তাদের ঘুঁটি সাজাচ্ছে এখানে। গোয়েন্দারা কি সেই খবর রাখে না?

এক পরিসংখ্যান মতে, দেশে এই মূহূর্তে ১৩০টির মতো জঙ্গি সংগঠন তৎপর। এরা কাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত? কারা এসব সংগঠনের সদস্য? এদের মদদদাতা কারা? আমাদের মতোন সাধারণ মানুষ আর কত সতর্ক হয়ে চলবে? সন্ধ্যার পর চলাফেরা নিষিদ্ধ স্বজনদের অনুরোধের কারণেই। কিন্তু দিনের বেলায়? দিনের বেলায়ও তো খুন হচ্ছে মানুষ। খুন করা এখন এক মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এইদেশে। কোনো বিচার নেই। খুনিরা তাই নির্ভয়ে চলে যেতে পারে অঘটন ঘটিয়ে।

গতকালের এই হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? এমনিতেই ব্লগার হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘ভাবমূর্তি’ বলতে অবশিষ্ট নেই কিছুই। বিবিসি বাংলার আরেক খবরেই জানা গেল, যে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা তাদের অধিবাসীদের বাংলাদেশে চলাচলের ওপর বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। করবেই তো? তারা তো আমাদের মতোন ‘পরগাছা’ হয়ে জন্মায়নি। তাদের জন্মের দাম আছে।

‘অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের পর কানাডাও তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়া ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস তার নাগরিকদের বাংলাদেশে অবস্থানকালে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

ঢাকায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল আজ বন্ধ রাখা হচ্ছে। কানাডা সরকারের ভ্রমণ সতর্কতা বিষয়ক ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের হুমকি এবং ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে কানাডার নাগরিকদের উচ্চমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এর আগে গতকালই যুক্তরাজ্য নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশে ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে এবং এর তিনদিন আগে শুক্রবার অস্ট্রেলিয়াও একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছিল। দুই দেশই উল্লেখ করে যে সেপ্টেম্বরের শেষভাগে বাংলাদেশে পশ্চিমা লক্ষ্যবস্তুর ওপর জঙ্গি হামলা হতে পারে’।

এরপরও কি আমরা আশা করবো যে, অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম এখানে খেলতে আসবে? নিরাপত্তাহীনতার দেশে কবে যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, আর কবে সব স্বাভাবিক হবে, জানি না। শুধু এইটুকু জানি এবং বুঝি যে, সামনে কঠিন পথ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশিদের জন্য। দিনের পর দিন ন্যুনতম সহনশীলতাও যে দেশের মানুষের মন থেকে উবে যাচ্ছে, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি চলছে, সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, সেখানে ‘অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ’ এর কনসেপ্টটা কেবল হাসিরই উদ্রেক করে। এর চেয়ে ভয়াবহ হাস্যরস আর কী হতে পারে?

এই দেশে আইসিস এর সদস্য সংখ্যা ঠিক কত জানি না, তবে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারির পর থেকে অনেক মানুষের মনেই যে আইসিস এর আদর্শ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা হলফ করে বলতে পারি। কাজেই এদের কাছ থেকে আমি-আপনি বা আমরাই বা কতটা নিরাপদ? সেখানে বিদেশিদের আতংকিত হবার যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি!

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.