উত্তর দিতে হবে বিসিবিকে

WOMEN+TEAM
ছবিটা সংগৃহীত

শারমিন শামস্: এদেশের রাস্তাঘাটে ঘরের ভিতরে বাইরে গলির অন্ধকারে আলোকিত রাজপথে যত্রতত্র অহরহ মরছে কিংবা নির্যাতিত হচ্ছে যে প্রাণীটি, তার নাম নারী। ‘মেয়েমানুষ’, সে যত গুণের হোক, যত মেধাবী বুদ্ধিধারী গুণবতী হোক না কেনো, তার জীবনের  কানাকড়ি দামও নেই। ফলে রাষ্ট্র যখন বিশেষ স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তখন বলির কাঠে মেয়েমানুষ ঝুলানোর সুযোগ থাকলে হাতছাড়া করে কোন সে আহাম্মক! সালমাদের বেলায়ও হয়েছে তাই।

পাকিস্তানের সাথে তথাকথিত ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ রক্ষায় বাংলাদেশের আয়োজনটা পরিপূর্ণ হতে পারে যদি হাতে থাকে সালমা, পান্না, খাদিজা কিংবা লতা মণ্ডলরা। সাবাশ! পুরষশাসিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি’র চিন্তার ধারা, গতি এমন হবে, এতে অবাক হবার কী আছে! তবে সরকার প্রধানের চেয়ারে বসে আছেন স্বয়ং নারী, তিনি কী করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেন, সেটাই আশ্চর্যের বিষয়! তিনি না ক্রিকেটপ্রেমী? এই তিনিই তো সাকিব-মুশফিকদের বুকে জড়িয়ে ধরেন পরম মমতায়। তাহলে সালমাদের বেলায় সেই মমতা কোথায়?

পাকিস্তানে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দলের হোটেলের সামনে বোমা হামলা, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের বাস লক্ষ্য করে গুলি, জিম্বাবুয়ে-পাকিস্তানের একদিনের খেলা চলাকালীন স্টেডিয়ামের বাইরে বোমা বিস্ফোরণ- এইসব একের পর এক ঘটনার পরও, পাকিস্তানে আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট বন্ধ হবার পরও, পাকিস্তানের মতো একটি সন্ত্রাসবাদী দেশে নারী ক্রিকেটারদের খেলতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। বাহ্, সাবাশ, এই শব্দগুলো বলা ছাড়া আমাদের আর কীইবা করার আছে!

অহরহ জঙ্গী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে যে দেশ চলেছে মৃতবৎ, সেদেশে সাকিব-তামিমদের না পাঠানোর সিদ্ধান্ত ক্রিকেট বোর্ডের। প্রশ্ন জাগছে, বিসিবি’র নিরাপত্তা টিমের পর্যবেক্ষণে কি তবে ধরা পড়েছে, পাকিস্তান নারীদের জন্য নিরাপদ? বিশেষ করে নারী ক্রিকেটারদের জন্য? যেখানে নারী শব্দটিই ‘ভালনারেবল’, নারীর চলাফেরা, পোশাক-আশাক যেখানে সীমিত, সেখানে নারী ক্রিকেটাররা কতটা স্বস্তিতে থাকবেন, বলা বাহুল্য। মানছি যে, পাকিস্তানের নারী ক্রিকেট দল ভাল খেলছে, সেখানে লোকজনের চোখ সওয়া হয়ে গেছে নারী খেলোয়াড়রা, কিন্তু ওরা্ও যে কতটা বিপরীত স্রোতের সাথে চলেন, তা বোঝাই যায়। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন নিজেদের দেশটাকেই কলুষিত করতে আগ্রহী তালেবান জঙ্গিরা, সেখানে এমন বিপদের মুখে মেয়েদের ঠেলে দেয়া কেন?

সেই বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসিতে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে গৃহীত হয়েছে শোক প্রস্তাব? আর পাক জামায়াতে ইসলামীর ঘোষণা এসেছে, তারা যে করেই হোক এর প্রতিশোধ নেবে। সেই পাকিস্তান, যে পাকিস্তানের তুমুল জনপ্রিয় খ্যাতিমান ‘পুরুষ’ ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামের গাড়ি লক্ষ্য করেও হয়েছে হামলা। সেই পাকিস্তানে এই বাংলাদেশের তারকা পুরুষ ক্রিকেটাররা নিরাপদ নন, এই বোধ বিসিবি’র হয়েছে।

কিন্তু ঐ যে কূটনীতি, ঐ যে বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্কের গোলকধাঁধা, মায়াবী হাতছানি, এসবের সমাধান করবে কে? বেশ, আনো তবে গোটা দুই মেয়ে ধরে। ছেড়ে দাও পাকিস্তানের মাঠে। দেখা যাক, মরে কী না! মরলে লস বেশি নেই। মেয়েমানুষের প্রাণ। ও গেলেই কী, আর থাকলেই কী? হোক না সে প্রতিভাবান ক্রিকেটার!

পুরুষ ক্রিকেটারদের অনেক কম সুযোগ সুবিধা পেয়েও যে মেয়েরা মাঠ কাঁপাচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, পাকিস্তানকে খুশী করতে আজ তাদের যদি ব্যবহার করা হয়েই থাকে, ক্ষতি নেই, কারণ একটাই, ঐ যে মেয়েমানুষের প্রাণ! একটা-দুটো বলি না দিলে দেশ এগোবে কীভাবে! যুগে যুগে নারী বলির কাঠে উঠেছে, এ তো একবিংশ শতাব্দীর চ্যালাকাঠ। এ চোখে দেখা যায় না। কিন্তু বলি হয় ঠিকই।

এদেশে মেয়েমানুষ মারলে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। সালমাদের পরিচয় আসলে এখনো মেয়েমানুষ ছাপিয়ে ক্রিকেটার হয়ে উঠতে পারেনি। শুধু জানতে চাই বিসিবি’র কাছে, কোন যুক্তিতে তারা পাকিস্তানে ক্রিকেটার পাঠানোর ক্ষেত্রে সাকিব ও সালমাদের ব্যাপারে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নিলেন? জাতির সামনে গ্রহণযোগ্য কোনো যুক্তি কি তুলে ধরতে পারবেন তারা? আছে সেই সৎসাহস বিসিবি’র যে মুখোমুখি হবেন আমাদের? উত্তর দেবেন এই প্রশ্নের?

আমরা জানতে চাই, কেন আমাদের সোনার টুকরা মেয়েরা যাবেন সেই দেশে, যে দেশ আমাদের মায়েদের ধর্ষণ করে আজ পর্যন্ত ন্যুনতম লজ্জিত নয়! বিশেষ করে তালেবান জঙ্গিদের অন্যতম মূল লক্ষ্য যখন নারী, তখন সেখানে সালমাদের দিয়ে কেন ‘পরীক্ষা’ চালানো হবে? বিসিবির কাছে আছে কি সেই উত্তর?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.