অণুস্মৃতি

Nodiফারহানা রহমান: বহুবছর আগে যখন আমি শিশু ছিলাম অথবা আরও কিছু পরে কিশোরী বেলায়, জীবন ছিলো অন্যরকম । আনন্দ আর সুখের ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে যেতো অজস্র ঝর্ণার বহতায়। আমি কখনোই আমার শৈশব ছেড়ে আসতে পারিনি। যদিও বা জানি মূলহীনতার মাঝেই জমে থাকে কল্পনার শক্তি ; তবু আমি ক্রমশ অতীতের গহ্বরে নিমজ্জিত হই। 

পথে পথে আপন মনে হেঁটে হেঁটে আমি শিউলিফুল কুড়াতাম, ঝাঁকে ঝাঁকে নারকেল গাছের ঝাঁকড়া মাথা আর কৃষ্ণচূড়ার বাহার। মাঠে মাঠে জমে থাকা বৃষ্টিতে আর দুকূল ছাপিয়ে যাওয়া লেকের পানিতে মলা ড্যালা, কুচি চিংড়ি !
হীরে কিংবা প্লাটিনাম অথবা তার চেয়েও বোধহয় দামী!

ঝোঁপে ঝাড়ে লাল নীল সব বর্ণীল প্রজাপতি, হেলিকপ্টারের মত সেইসব ফড়িঙের লেজে সুতো বেঁধে স্বপ্নের আকাশে উড়িয়ে দিয়ে জোনাকির মত জ্বলজ্বল চোখে অবিরাম তাকিয়ে থাকা । আর এখন –
মুক্তবাজারের নিয়ন বাতিতে ঝলসে গেছে মানুষের শৈশব –কিশোরবেলা।
সারি সারি বস্তির পাশে রাজকীয় বিলাসভবন আর পাঁচতারা- সাততারা বহুজাতিক হোটেল। যতদূর দৃষ্টি যায় ছড়ানো ছিটানো অপরিকল্পিত বহুতল ভবন। ডোবার কবরের উপর রেস্তোরা আর শপিং মল।

এখনো আমি পথ চলতে চলতে খুঁজে বেড়াই লজ্জাবতী গাছের পাতার শিহরণ, ঝরা পাতা, ব্যাঙের ছাতা, মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে যাওয়া রহস্যময় সন্ধ্যাগুলো। তার বদলে দেখি, দিকে দিকে – বিচিত্র কত ডাইন-বাঁয়ে বক্তৃতার মতো বর্ধিষ্ণু সারি-সারি উন্নতির হাস্যময় ব্যাঙের ছাতার মতো শপিং মল, ওয়ান স্টপ মল। অনেক অনেক দোকান।

দেখি আর ভীষণ মন খারাপ করা অস্থির সময়কে বাগে আনতে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াই। অপ্রয়োজনীয় জামা, ব্যাগ আর নতুন নতুন ফ্যাশনাবল জুতোয় উপচে পড়ে জুতোর র‍্যাক। নতুন নতুন অপ্রাপ্তি আর অতৃপ্তিতে ভরে উঠে মন। শান্তি মেলে না কিছুতেই। মরা মাছের চোখের মত বিষাদ নিয়ে তাকিয়ে থাকি ভবিষ্যতের দিকে একটু শান্তির আশায়। দূরে কোথাও,-

আজন্ম লালিত কিছু না পাওয়া সুখের স্বপ্ন নিয়ে বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকি অতি দূরের কোন পথের বাঁকে, ঝাপসা দিগন্তের নীলিমায় যেখানে একদা হারিয়েছি আমি আমাকেই।

– সেখানেই, আমি আর আমার সব সুখের স্বপ্ন একটি বিন্দুর মধ্যে বিলীয়মান এখন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.