নারী-পুরুষ মানুষ নয়! কারে তবে মানুষ কয়!

Familyহালিমা-তুস-সাদিয়া: প্রিয় (!) বোকা মানুষের দল, তোমরা কেমন আছো তা জিজ্ঞেস করবো না, জানিই তো কেমন আছো! কিন্তু তোমরা জানো না আমি কতটা মজায় আছি! সেটা জানাতেই আজ এই খোলা চিঠি।

–তোমার কি মনে হয়? ইভ-টিজিং এর জন্য কে বেশি দায়ী?

–ভাইয়া, প্রতিটা আলাদা ঘটনার জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তি দায়ী।

–কিন্তু আমারতো মনে হয় নারীরাও দায়ী।

–ভাইয়া, “ব্যক্তি” শব্দটির মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়েই কিন্তু পরে!

–ও! আচ্ছা! তাই তো!

উপরের কথপোকথনটি আমার ভিতরে বাস করা দুই নারী-পুরুষের। আমার খুব আনন্দ হয় যখন দেখি যে অনেকেই মুখে বলে নারীরাও মানুষ কিন্তু অবচেতন মনে প্রকাশ করে ফেলে যে মানুষ মানেই পুরুষ, ব্যক্তি মানেই পুরুষ। আহা! ওরা আমার শেখানো কথা কি ভালোভাবেই না গিলে নিয়েছে! নারী আবার মানুষ নাকি! আপনারা আবার মনে করবেন না যেন যে আমি পুরুষ! পুরুষ হচ্ছে আমার ভিতর বাস করা সবচেয়ে গোবেচারা প্রাণী যাকে আমি মানুষ হওয়ার কঠিন বেড়াজালে আটকে ফেলেছি, যাকে আমি সবার সামনে ভিলেন বানিয়ে দিয়েছি। এখন কেউ আমাকে দোষ দেয় না, সবাই দোষ দেয় পুরুষকে, আমাকে বলে আমি নাকি পিতার শাসনে (পুরুষতান্ত্রিকতায়) এমন হয়েছি। আহা! কী আনন্দ! আমার কোনো দোষই খুঁজে পায় না হাঁদাগুলো!

আর নারী! তার উপর তো আমি বেড়াজাল ফেলিনি বরং তাকেই বেড়াজালের উপর ফেলেছি, তারপর এমনভাবে গেঁথে দিয়েছি বেড়াজালের সাথে যে সে না পারে বেড়া গিলতে না পারে বেড়াকে বমি করে ফেলে দিতে। দোটানার মধ্যে ফেলে তাকে আমি আর মানুষ হয়ে উঠতে দেইনি বরং বানিয়েছি দুনিয়ার বাইরের অন্য জাতের কোনো প্রাণী।

অনেক সময় তারা প্রাণীও থাকে না হয়ে যায় কোনো বস্তু বা কোনো সুস্বাদু কেক যার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা যায়, হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়া যায় আবার কেটে কেটে ভাগও করা যায়। এই ভাগের কোন ভাগ হয় কারো মা, কোনো ভাগ হয় মেয়ে, কোনো ভাগ হয় বোন আবার কোনো ভাগ হয় স্ত্রী। আরো অনেক গুণ দিয়েছি আমি নারীর, নারী হয় সর্বংসহা, সে হয় মিতভাষী, কথা বলে মিষ্টি করে আর কথা শোনে মাথা নিচু করে।

তাকে আমি পুতুলের মত সাজাতে পারি, পড়াশোনা করাতে পারি, তারপর সংসারে অভাব হলে বা নিজের স্ট্যাটাস বাড়াতে তাকে দিয়ে চাকরি করাতে পারি, কিন্তু চাকরি করার পর ঘরে এসে যদি যে রান্না না করে, বাচ্চা না পড়ায়, আমার ইচ্ছা পুরন না করে তাহলে তাকে আমি গালিও দিতে পারি, প্রয়োজনে মারতেও পারি। তাকে আমি ঘরের বাইরে বের করে এনেছি, তার আয়-উপার্জন দিয়ে আমার উন্নতি ঘটাচ্ছি, আবার ঘরেও তাকে দিয়ে খাটাচ্ছি যাতে পুরুষকে দিয়েও আমি ঠান্ডা মাথায় উপার্জন করিয়ে নিতে পারি।

এই হচ্ছে নারী আর পুরুষ, এদেরকে আমি মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি প্রতিযোগী হিসেবে যাতে তাদের ঝগড়ায় আমি আমার সর্বোচ্চ মুনাফাটা বের করে নিয়ে আসতে পারি। এরা সারাজীবন তারা এ তাকে, ও ওকে দোষ দিয়ে যাবে আর আমি দুই-পক্ষ থেকেই মুনাফা লুটবো। ওদেরকে দুপক্ষকেই আমি আমার দাস বানিয়ে রেখেছি কিন্তু এক পক্ষকে বলেছি তুমি মালিক আর আরেক পক্ষকে বলেছি তোমার মালিক তোমাকে দাস বানিয়ে রেখেছে। ব্যাস! দুই-পক্ষই আটকে গেল আমার বেড়াজালে!

নারীরা তাদের অধিকার নিয়ে সভা-সমাবেশ করে আর বলে বেড়ায় আমরাও মানুষ। আর পুরুষরা বলে, গেল! গেল! নারী রসাতলে গেল! আমরা পুরুষরা মানুষ, তোমরা আমাদের পায়ের জুতা। আর আমি বলি, আহা! তোমরা যদি জানতে!তোমরা সবাই জন্মেছিলে মানুষ হয়ে, কিন্তু আমি তোমাদের মানুষ হয়ে বেড়ে উঠতে দেইনি। আমি তোমাদের একসাথে কাজ করতে দেইনি। আমি তা কেড়ে নিয়েছি, কেড়ে নিয়ে নিজে মানুষ হয়েছি, যদিও আফসোস! সবাই আমাকে সমাজ বলে ডাকে! অবশ্য সেটা ব্যপার না, আমি তো জানি যে আমি মানুষ! তবে আমার মাঝে মাঝে ভয় হয়, এই নারী-পুরুষ যদি ওদের ঝগড়া বন্ধ করে, ইগো ভুলে গিয়ে একসাথে কাজ করা শুরু করে তাহলে আমার কি হবে! ওদের মিলিত শক্তির কাছে তো আমি পারবো না! তখন তো আমি আর মানুষ থাকবো না! ওরা মানুষ হয়ে যাবে। হায়! হায়!

থাক আর ভেতরের কথা ফাঁস না করি! মাথা খারাপ তোমাদের, কবে কি করে বসো! আজ বরং যাই।

ইতি-

তোমাদের নাম দেয়া “সমাজ”

আমি নারী-পুরুষ-জেন্ডার নিয়ে বেশ পড়াশোনা করি, যদিও তত্ত্বকথা আমার মনে থাকে না। তারপরও আমার মনে হয় যদি সমাজের চিঠি লেখার ক্ষমতা থাকতো তাহলে বোধহয় এমন কোনো চিঠিই লিখতো! এবং তার এই লেখাটাও একদম উপযুক্ত হত।

নারী খিলখিল করে হাসে, অল্পতেই কেঁদে ফেলে, সুন্দর করে সাজতে পছন্দ করে, তার শারীরিক নমনীয়তা আছে, সে আবেগ দিয়ে সব চিন্তা করে কিন্তু তাই বলে কেন ধরে নিচ্ছি যে সে দুর্বল! কেন ভাবি না যে এগুলোই তার শক্তি! সে হাসতে পারে, কাঁদতে পারে, সাজতে পারে-এজন্যই জীবনের অনেক দুর্যোগ সে সহজেই মোকাবিলা করতে পারে, তার শারীরিক নমনীয়তা আছে তার মানে এই না যে সে শারীরিকভাবে দুর্বল! প্রতিদিন ইট ভাঙ্গে যে নারী, পাহাড়ে জুম চাষ করে যে নারী বা আপনি পুরুষকে অসহ্য কষ্টের ভেতর জন্ম দেন যে নারী তার শারীরিক শক্তি নিয়ে সন্দেহ আছে আপনার? যদি থাকে তাহলে আপনার মধ্যে যুক্তির অভাব আছে। আর নারী আবেগপ্রবণ বলেই তার যুক্তি কম, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না কে বলেছে আপনাকে? যদি নারী যুক্তিহীন হয় তাহলে আমার লেখার কোন জায়গায় যুক্তির অভাব পাচ্ছেন আপনি বলুন? এতকিছু পারার পরও তবে কেন নারী শক্তিহীন-অবলা! কারণ সমাজ বলে দিচ্ছে যে নারী অবলা, তাই আমরা তার শক্তির দিকগুলো খেয়ালই করছি না!

আর পুরুষ লৌহ-কঠিন। সে হাসতে জানে না, কাঁদতে জানে না, তার সাজগোজের বালাই নেই, সে “রাফ এন্ড টাফ”, তার শারীরিক শক্তি অসীম, সে মহা যুক্তিবান। তাই সে শ্রেষ্ঠ! কে বলেছে এসব? ছোট বেলায় কোনো ছেলে শিশু কে দেখেছেন? সে কিন্তু মেয়ে শিশুর সমানই কাঁদে আর হাসে। তার মানে তার হাসি-কান্না স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক, তাহলে বড় হয়ে কেন তার আবেগ কমে যাচ্ছে? কারণ সমাজ তার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে, তুমি পুরুষ! তোমাকে আবেগী হলে চলবে না, বয়স ২৫ এর পরই তোমার সংসারের দায়িত্ব নিতে হবে সুতরাং আবেগের প্রকাশ দুর্বলতার লক্ষণ তোমার জন্য। এতে কি ছেলেটা শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠে?

উহু! সে নিদারুণ মানসিক চাপে বেড়ে ওঠে, অধিক প্রত্যাশার চাপ এটা। এই প্রত্যাশার চাপে কেউ নিজেকে ইনফিরিওর মনে করে, অনেকে সুপিরিওর মনে করে। তখনই শুরু হয় ক্ষমতার প্রকাশ-আমি সব সামলাচ্ছি আমার কথা মত সব হবে না কেন! শুরু হয় হিংস্রতা। আর যারা হিংস্র হতে চায় না তারা তো পৌরুষহীন হসেবে চিহ্নিত হয়! এভাবে কিন্তু আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগার কথা সবারই। এটা তবে কোন ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব! এটা এক ধরনের বশ্যতা, সমাজের প্রতি বশ্যতা। নারীর বশ্যতা চোখে দেখা যায়, কিন্তু পুরুষের বশ্যতা লুকিয়ে থাকে, কারণ এটাকে আমরা শ্রেষ্ঠত্বের নাম দেই। এটা আরো ভয়াবহ, আরো বেশি নাজুক পরিস্থিতি এটা।

যাকে ছোট করে রাখা হয় সে নিজেকে বড় প্রমাণের চেষ্টা করে। যে শ্রেষ্ঠ সে কখনো তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে যায় না, তার দিতে হয় না। তার শ্রেষ্ঠত্ব এমনিতেই প্রকাশ পায়, শ্রেষ্ঠত্ব লুকানো থাকে তার কাজে। যদি আমরা নারী-পুরুষ আলাদা আলাদাভাবে শ্রেষ্ঠ হতাম তাহলে দুই পক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এত বাকযুদ্ধ হত না। আমরা নারী-পুরুষ একে অপরের সহযোগী না হয়ে প্রতিযোগী হতে গিয়েই আজ আর সামনে যেতে পারছি না, ঘুরছি একই গোলক ধাঁধায়, একই চক্রের ভেতর; কিন্তু কেউই বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছি না। কারণ একা পথ খুঁজে পাওয়া যাবেও না।

শুধু পরস্পর বিরোধী চিন্তার কারণেই আমরা আজ নারী-পুরুষ একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছি। নারী দোষ দিচ্ছে পুরুষকে আর পুরুষ দোষ দিচ্ছে নারী কে। আমরা কেউ কাউকে সম্মান করছি না, কেউ কারো কাজকে গুরুত্বই দিচ্ছি না। আমি পুরুষ হয়ে ভুলে যাচ্ছি যে ছোটবেলায় যদি আমার মা মুখে তুলে খাবার খাইয়ে না দিত তাহলে বাবার আনা কাগজের টাকা খেয়ে আমি বাঁচতাম না। আর আমি নারী হয়ে ভুলে যাচ্ছি যে আমার মা যে খাবারটা আমাকে খাইয়েছে সেটা আমার বাবার টাকায়ই কেনা। এবং মা-বাবাও কিন্তু নারী-পুরুষই! তাহলে কার গুরুত্বটা এখানে বেশি? কে বেশি গুরুত্বপুর্ণ! কে শ্রেষ্ঠ? আমি বলি কেউই আলাদাভাবে শ্রেষ্ঠ নয়। একা একা কেউ শ্রেষ্ঠ হতে পারে না, একা একা কেউ স্বয়ংসম্পূর্ণও হয় না।

একা একা হাঁটার চেয়ে হাত ধরে হাঁটতে বেশি ভালোবোধ করে মানুষ। আগে-পিছে লাইনে হাঁটার চেয়ে পাশাপাশি লাইনে হাঁটায় দ্রুত এগিয়ে যাওয়া যায় আনন্দের সাথে

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.