‘আমার মেয়েকে তোমরা নিয়ে যাও’

Refugee maউইমেন চ্যাপ্টার: ‘আমাদের যদি না নিতে চায়, তবে আমাদের বাচ্চাদের শুধু নিয়ে যাক। আমার বাচ্চাকে জার্মানিতে পাঠিয়ে দিক, বা অন্য কোনো নিরাপদ জায়গায় ওকে নিয়ে যাক’। একজন শরণার্থী মায়ের আকুতি এর চেয়ে বেশি কীইবা হতে পারে!

এই মায়ের নাম রাশা আলসায়েদ।

তিনি আরও বলছিলেন, জার্মানিতে যেতে দেয়া হলে তিনি বাচ্চাটাকে দিয়ে নিজে সিরিয়া ফিরে যেতে আগ্রহী। তিনি জানান, তিনি তার মেয়েকে ভীষণ ভালবাসেন, কাজেই তিনি শুধু ওর একটা নিরাপদ ভবিষ্যত চান, বিনিময়ে দূরে থাকতে হলেও তিনি তাতে রাজী।

জার্মানিতে ঢোকার অপেক্ষায় হাজার হাজার শরণার্থী এখন বলকান দেশগুলোর সীমান্তে আটকা পড়েছে।  রাশা তাদেরই একজন। হাতের কড়ি ফুরিয়ে এসেছে, খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। এরই মাঝে শীত পড়তে শুরু করেছে ওই অঞ্চলে, এই অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে হাজারও শিশু সাথে নিয়ে মা-বাবারা অপেক্ষা করে আছেন একটু স্বস্তিতে নি:শ্বাস ফেলার।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে কেবলমাত্র প্রাণটা হাতে নিয়ে জীবনের চরমতম ঝুঁকি নিয়ে এই মানুষগুলো এখনও রাস্তায়। হয়তো বোমার ভয় এখানে নেই, কিন্তু আছে রাজনীতির ভয়। বোমায় মানুষ মরে, তাতে সান্ত্বনাও মেলে, কিন্তু যখন মানুষ জিম্মি হয়ে যায় বিশ্ব রাজনীতির, যখন মানুষ অস্ত্র বিক্রির অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়, তখন দিশেহারা লাগে, আতিপাতি করেও বের হওয়ার পথ মেলে না।

রাশা আলসায়েদ দামেস্কে থাকতে স্কুলে ইংরেজি পড়াতেন। রাস্তার ধারে বসে মেয়ের চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে তিনি বলে যাচ্ছিলেন তার আর্তির কথা। সার্বিয়া এবং হাঙ্গেরি সীমান্তে আটকে পড়া হাজারও মানুষের ভিড়ে তার এই আকুতি কতটা পৌঁছাবে বিশ্ববিধাতাদের কানে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।

মানুষের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন, ক্রোয়েশিয়া এরই মধ্যে এই স্রোত ঠেকাতে না পেরে ভিন্নপথ নিয়েছে। জোর করে বাসে তুলে হাঙ্গেরির উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছে। বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না। অন্যদিকে হাঙ্গেরি সীমান্তে অপেক্ষা করে আছে শত শত পুলিশ আর সেনাসদস্যরা। শরণার্থীদের তারা নামিয়ে আবারও অন্য বাসে উঠিয়ে দিচ্ছে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। গতরাত থেকে তাদের ভাগ্যে কী জুটেছে, জানা যায়নি।

সীমান্তে রাতভর কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করেছে হাঙ্গেরিয় পুলিশ। জানিয়েছে, ঝুকিঁপূর্ণ ৪১ কিলোমিটার তারা আটকে দিয়েছে কঠিনতম কাঁটাতার দিয়ে, যে পথ মাড়ানো শুধু অসম্ভবই নয়, আরও অধিক কিছু্। তাহলে এই মানুষগুলো এখন কোথায় যাবে? কতদিন তারা পথে পথে ঘুরবে? রাস্তায় ঘুমাবে?

হাঙ্গেরি জানিয়ে দিয়েছে, যেই এই বেড়া ডিঙোবার চেষ্টা করবে, তাকেই জেলে ঢোকানো হবে, আর যে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবে, তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। এরইমধ্যে অনেকেই জেলে ঢুকেছে, হয়তো আপাত আশ্রয় তাদের এভাবেই মিলেছে।

মিজ আলসায়েদ বলছিলেন, গত ১০ দিন ধরে তারা ছয় বছরের মেয়ে আলমাকে নিয়ে পথে আছেন, পাসপোর্ট না থাকায় তুরস্কে যান, সেখান থেকে গ্রিস হয়ে এখন ইউরোপে। ভাই হাসানও তার সাথে। জনপ্রতি তারা দুই হাজার ইউরো খরচ করে এই পর্যন্ত এসেছেন। এখন আর টাকা নেই।

স্কাই নিউজ এর এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলছিলেন, ‘সীমান্তটা খুলে দিতে বলেন, আমরা এখানে থাকতে চাই না। হাঙ্গেরি পুলিশের আচরণে আমরা ক্ষুব্ধ। শুধুমাত্র নিরাপদে চলে যেতে চাই। এখানে যারা আছেন, তারা শুধুমাত্র তাদের সন্তানের জন্যই এই বিপদে পা বাড়িয়েছেন, আর কিছু না’।

প্রচণ্ড ক্ষোভের সাথে তিনি বলেন, ‘আমার বেঁচে থাকার অধিকার আমি চাই না। আমি চাই আমার সন্তান যেন বাঁচে, ও যেন পড়াশোনাটা করতে পারে একটা নিরাপদ জীবনে’।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.